ভাঙাচোরা সড়কের পাশে একচালা একটি ঘর। ঠিক ঘর বললে ভুল হবে। কোথাও বাঁশের তৈরি বেড়া আছে, আবার কোথাও তাও নেই। দুয়েক জায়গায় মাথার ওপরের টিনও উধাও। ছোট ছোট শিশু ঝাড়ু হাতে মেঝে পরিষ্কার করছে। দূর থেকে দেখে যে-কেউ গোয়ালঘর ভাবতে পারেন। কিন্তু এটি একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার প্রত্যন্ত সৈয়দপুর ইউনিয়নের এই স্কুলটির নাম মধ্যেরধারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ২০২০ সালের শুরুর দিকে স্কুলটির নতুন ভবনের কাজ শুরু হয়। এরপর থেকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ভাগ্যে বেজে ওঠে দুর্ভোগের ঘণ্টা। নতুন ভবনে হেসে-খেলে শিক্ষাজীবন পার করবেন শিক্ষার্থীরা, এমন প্রত্যাশা থাকলেও তিন বছরেও তা পূরণ হয়নি। অস্থায়ী ঝুপড়ি ঘরেই ক্লাস করতে হচ্ছে তিনশতাধিক শিক্ষার্থীকে। স্কুলের পরিবেশ ভালো নয়, তাই কোনো শিক্ষকও সেখানে বদলি হয়ে আসতে চান না। এ জন্য শিক্ষকসংকট আর ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা ছাড়াই টেনেটুনে চলছে পাঠদান কার্যক্রম।
শুধু মধ্যেরধারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ই নয়, এ উপজেলার আরও পাঁচটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চিত্র ঠিক একই রকম। বর্ষা এলেই বন্ধ থাকে ক্লাস-পরীক্ষা। নেই শৌচাগার, টিউবওয়েল, ফ্যান, বাতিসহ শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত পরিবেশ। এতে ঋতুভেদে সীমাহীন ভোগান্তিতে শিক্ষাজীবন পার করতে হচ্ছে কোমলমতি শিশুদের।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জুন মাসে এই ছয় স্কুলের ভবন নির্মাণ কার্যক্রম শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ৩০ শতাংশ কাজও এখনো শেষ হয়নি। দুটি স্কুলের কাজ এখনো শুরুই হয়নি। এতে কবে নাগাদ শিক্ষার্থীরা নতুন ভবনে ফিরতে পারবে তা নিয়ে শিক্ষক ও অভিভাবকদের দুশ্চিন্তার শেষ নেই।
উপজেলা এলজিআরডি সূত্রে জানা গেছে, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ২০১৫ সালে উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে আশ্রয়ণ প্রকল্প কাম স্কুল নির্মাণের কাজ শুরু হয়।
বহুমুখী দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্র প্রকল্পের (এমডিএসপি) এ কাজটি সম্পন্ন করছে এলজিআরডি মন্ত্রণালয়। এ প্রকল্পের আওতায় সীতাকুণ্ড উপজেলার উপকূলীয় এলাকায় মোট ছয়টি বহুমুখী আশ্রয়ণকেন্দ্র কাম প্রাথমিক বিদ্যালয় নির্মাণের টেন্ডার হয়। এসব ভবনের নিচতলায় থাকবে ফাঁকা মেঝে, দ্বিতীয় তলায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় গবাদিপশু রাখার ব্যবস্থা, তৃতীয় তলায় দুর্যোগকবলিত মানুষের আশ্রয়কেন্দ্র আর চতুর্থ তলায় সুপেয় পানি ও খাবারের ব্যবস্থা। ছাদে থাকবে সোলার সিস্টেম। অন্যান্য ফার্নিচারের সুবিধাও রাখা হবে এসব ভবনে।
ভবনগুলোর নির্মাণের দায়িত্ব পেয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ওয়াহেদ গ্রুপ। ২০২০ সালের শুরুর দিকে মধ্যেরধারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কাম আশ্রয়ণ কেন্দ্রসহ ছয়টি ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়। প্রকল্পের আওতায় অন্য ভবনগুলো হলো- উপজেলার পশ্চিম বহরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পূর্ব লালানগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, এস এম পাইলট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দক্ষিণ বাঁশবাড়িয়া রহমতের পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কেশবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
কিন্তু এরই মধ্যে চারটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাজ শুরু হলেও দক্ষিণ বাঁশবাড়িয়া রহমতের পাড়া ও কেশবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাজ আজও শুরু হয়নি। অন্য চারটি ভবনের কেবল ফাউন্ডেশন স্তরের কাজ শেষ হয়েছে। বাকি কাজও চলছে অনেকটা কচ্ছপ গতিতে।
এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী, শিক্ষা কর্মকর্তা, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটিসহ স্থানীয় এলাকাবাসী। তাদের অভিযোগ- ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের গাফিলতির কারণে দীর্ঘ সময়ও ভবনগুলোর কাজ শেষ হয়নি। এতে ব্যাহত হচ্ছে কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন। মানসম্মত পরিবেশ না পাওয়ায় শিক্ষার্থীরা স্কুলের প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে।
মধ্যেরধারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. আলাউদ্দিন বলেন, ‘স্কুলের তিন শিক্ষকের মধ্যে একজন চাকরি ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। সাড়ে ৩০০ শিক্ষার্থীকে দুজন শিক্ষক কীভাবে সামাল দেবেন তা নিয়ে চিন্তায় আছি। আজ তিন বছর পার হলেও নতুন ভবনে যেতে পারলাম না।’
জানতে চাইলে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ নুরুচ্ছাফা খবরের কাগজকে বলেন, ‘কাজের গতি একেবারে মন্থর। আমরা এ বিষয়ে এলজিইডিকে বলেছি, আপনারা না পারলে লিখে দিন। আমরা ব্যবস্থা নেব। কাজের অগ্রগতি মোটেও সন্তোষজনক নয়। কোথাও একবার কাজ শুরু হলে আবার বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি কোথাও কোথাও রডে মরিচা ধরে গেছে। অন্য মালামালও নষ্ট হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘মূল ঠিকাদার কাজ না করে উপ-ঠিকাদার দিয়ে কাজ করিয়ে নিচ্ছেন। সবেমাত্র বেইসের কাজ শেষ হয়েছে। কখন যে চারতলা ভবন হবে তার কোনো ঠিক নেই। ছয়টি স্কুলের পাঠদান চলছে অস্থায়ী ভবনে। ওই ভবন যেখানে নির্মাণ করা সেসব ভূমির মালিকের সঙ্গে চুক্তিও শেষ হয়ে গেছে। এখন জটিলতা বাড়ছে।’
জানতে চাইলে অভিযোগ স্বীকার করে দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ওয়াহেদ গ্রুপের জি এম মিনহাজ হোসাইন বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানের কিছু অসাধু কর্মকর্তার কারণে কয়েকটি প্রকল্পের কাজ বন্ধ ছিল। এখন সবকিছু ঠিক করা হয়েছে। ফের কাজ শুরু করেছি। আশা করি, আগামী বছরের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করতে পারব।’
এ বিষয়ে সীতাকুণ্ড উপজেলা প্রকৌশলী মো. মনির হায়দার খবরের কাগজকে বলেন, ‘কাজের অগ্রগতি বাড়াতে ঠিকাদারকে তাগাদা দেওয়া হয়েছে। এখন কাজ চলছে। নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ায় দীর্ঘদিন কাজ খুব ধীরে হয়েছিল। মাঝখানে বন্ধও ছিল। কখনো শ্রমিকসংকট ছিল।’
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম এলজিআরডি কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ হাসান আলী খবরের কাগজকে বলেন, ‘কাজ দ্রুত শেষ করার জন্য বলা হয়েছে। এ বিষয়ে আমরা তৎপর রয়েছি।’