চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ২০ জন গ্রাহকের প্রায় ২৭ লাখ টাকা নিয়ে উধাও হয়ে গেছেন এবি ব্যাংকের একটি এজেন্ট ব্যাংকিং শাখার প্রধান কর্মকর্তা। এ ঘটনায় ব্যাংকটির চেয়ারম্যান, প্রেসিডেন্ট ও পাঁচ পরিচালকসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে আদালতে পৃথক দুটি মামলা হয়েছে। ঘটনাটি দুদক ও সিআইডি তদন্ত করছে।
সোমবার (১ জানুয়ারি) বিষয়টি খবরের কাগজকে নিশ্চিত করেছেন গ্রাহকদের আইনজীবী রবি শঙ্কর চৌধুরী।
উধাও হওয়া ওই কর্মকর্তার নাম মো. আরিফুল ইসলাম (৩০)। তিনি সীতাকুণ্ডের কুমিরা ইউনিয়নের হিঙ্গুরী পাড়ার বাসিন্দা। আরিফুল ২০১৯ সালের আগস্টে এবি ব্যাংকের নেমসন ডিপো এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে যোগদান করেন। সমালোচিত ওই এজেন্ট শাখাটি বর্তমানে বন্ধ করে দিয়েছে এবি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
আইনজীবী রবি শঙ্কর চৌধুরী জানান, গত ২৭ ডিসেম্বর মো. নাজিম উদ্দিন (৪৫) ও মো. জসিম উদ্দিন (৫০) নামে সীতাকুণ্ড উপজেলার দুই ভুক্তভোগী গ্রাহক বাদী হয়ে চট্টগ্রাম চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রিট আদালতে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে একটি মামলা করেন। এ মামলায় এবি ব্যাংকের চেয়ারম্যান খায়রুল আলম চৌধুরীকে (৫৫) এক নম্বর আসামি করা হয়েছে।
অন্য আসামিরা হলেন, এবি ব্যাংকের পরিচালক ফিরোজ আহমেদ (৫৪), সাজির আহমেদ (৫৩), শফিকুল আলম (৫৭), মো. মাকসুদুল খান (৫৯), মো. ইসকান্দর মিয়া (৫৮), প্রেসিডেন্ট ও এমডি তারিক আফজল (৫৯), এজেন্ট শাহ নেওয়াজ মো. আলী চৌধুরী মিনহাজ (৫০) ও এজেন্টের নিয়োগ করা প্রধান কর্মকর্তা মো. আরিফুল ইসলাম (৫৯)। চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত চট্টগ্রামের বিচারক শরীফুল ইসলাম মামলাটি সিআইডিকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।
এর আগে গত ৩ আগস্ট একই আদালতে এবি ব্যাংকের এজেন্ট মিনহাজ বাদী হয়ে আরেকটি মামলা দায়ের করেন। এ মামলায় তার নিয়োগ করা কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম ও সীতাকুণ্ড উপজেলার বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের আহম্মদ হোসেনকে (৪৫) আসামি করা হয়। বাদী মিনহাজ একই উপজেলার ভাটিয়ারী ইউনিয়নের ইমাম নগর এলাকার শাহ আলম চৌধুরীর ছেলে। তিনি শাহী শিপিং ও ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী।
সূত্র জানায়, ২০১৯ সালের ৩০ জানুয়ারি সীতাকুণ্ডের কুমিরা ইউনিয়নের নেমসন কন্টেইনার ডিপোতে ব্যবসায়ী মিনহাজ এবি ব্যাংকের অনুমতি নিয়ে একটি এজেন্ট ব্যাংকিং শাখা খোলেন। সেখানে মো. আরিফুল ইসলামকে প্রধান কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেন তিনি।
দুই গ্রাহকের করা মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, গ্রাহক নাজিম উদ্দিন ২০২২ সালের ১ নভেম্বর মো. আরিফুল ইসলামের মাধ্যমে ওই এজেন্ট শাখায় একটি হিসাব খোলেন এবং একই দিন ২ লাখ টাকা এফডিআর করেন। আর মো. জসিম উদ্দিন মোট ৩ লাখ ৪১ হাজার টাকা এফডিআর জমা করেন। গত ১২ জুলাই এই দুই গ্রাহক নেমসন ডিপোর এজেন্ট ব্যাংকিং শাখায় যোগাযোগ করতে গেলে শাখাটি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ দেখতে পান। পরে ব্যাংক সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। একপর্যায়ে তারা বুঝতে পারেন তাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। এসব বিষয়ে ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো বিষয়টি এড়িয়ে যান। টাকা ফেরত পেতে তারা গত ২২ নভেম্বর সংশ্লিষ্টদের কাছে লিগ্যাল নোটিশ পাঠান। কিন্তু প্রায় ২০ দিন পর মাত্র দুজন লিগ্যাল নোটিশের জবাব দেন এবং জবাবে গ্রাহকদের লেনদেন, হিসাব-নিকাশ, অ্যাকাউন্ট সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। মিনহাজ লিগ্যাল নোটিশের জবাবে বলেছেন, গ্রাহক জসিম উদ্দিন তার এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে কোনো হিসাবই খুলেননি। জসিম উদ্দিনের হিসাবটি ভুয়া। আর নাজিম উদ্দীন অর্থ আত্মসাৎ করে পালিয়ে যাওয়া এজেন্ট কর্মকর্তা আরিফুলের সহযোগী। তিনি আরিফুলের যোগসাজশে অর্থ আত্মসাতে লিপ্ত।
অপরদিকে নিজের নিয়োগ করা কর্মকর্তা আরিফুলের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের মামলা করেছেন এজেন্ট মিনহাজ। মামলায় তিনি উল্লেখ করেছেন, ২০২৩ সালের ১২ জুলাই বেলা ১১টায় আরিফুল ইসলাম কর্মচারীদের বেতন ও অন্যান্য হিসাব মিলিয়ে মোট ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা সীতাকুণ্ড এবি ব্যাংক শাখায় জমা করার জন্য বের হন। পরবর্তীতে গাড়িতে তাকে মলম লাগিয়ে ও নেশার ওষুধ খাইয়ে অজ্ঞান করে ৫ লাখ ৫০ হাজার ও ২টি মোবাইল লুট করা হয়েছে বলে জানান। কিন্তু তার কথাবার্তা সন্দেহ হওয়ায় তাকে নজরে রাখতে বলা হয়। পরে বিষয়টি জেনে এবি ব্যাংকের ঢাকা থেকে অডিট এসে তদন্ত করলে আরিফুলের বিরুদ্ধে কয়েকটি গুরুতর অনিয়ম ও মোট ৫ লাখ ৭১ হাজার টাকার গড়মিল ধরা পড়ে। পরে ২০ জুলাই আরিফুল টাকাগুলো পরিশোধের অঙ্গীকার করেন। এরপর পালিয়ে যান তিনি।
তিনি মামলায় আরও উল্লেখ করেন, ইউনিয়ন পরিষদ ও স্থানীয় সালিশ বিচারে আরিফ তাকে লোকজন নিয়ে হেনস্তা করেন এবং হামলার চেষ্টা করেন। মামলায় এজেন্ট মিনহাজ আরিফুলের বিরুদ্ধে ১৯ ব্যক্তির কাছ থেকে মোট ২১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৫০ টাকা আত্মসাতের বর্ণনা দেন।
এসব বিষয়ে জানতে এবি ব্যাংক নেমসন ডিপো এজেন্ট ব্যাংকিং শাখার এজেন্ট মিনহাজকে অসংখ্যবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। পরে হোয়াটস অ্যাপে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো উত্তর মেলেনি। তবে তার আইনজীবী দুলাল চন্দ্র দেবনাথ খবরের কাগজকে বলেন, ‘জালিয়াতির মাধ্যমে আরিফুল টাকাগুলো আত্মসাৎ করেছেন। মামলাটি বর্তমানে সিআইডি তদন্ত করছে। এজেন্ট মিনহাজের বিরুদ্ধে গ্রাহকদের করা অন্য মামলার বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না।’
এবি ব্যাংক সীতাকুণ্ড শাখার ব্যবস্থাপক শিমুল তাপস বড়ুয়া খবরের কাগজকে বলেন, ‘এজেন্ট তার কর্মকর্তাদের ঠিকমতো পরিচালনা করেননি। তদারকিতে গাফিলতি রয়েছে, ফলে এই ঘটনা ঘটেছে।’
জানতে চাইলে এবি ব্যাংকের হেড অব এজেন্ট ব্যাংকিং সামিউল কবির খবরের কাগজকে বলেন, ‘এসব কারণে বর্তমানে ওই এজেন্টটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আমাদের এজেন্ট অভিযুক্ত আরিফুলের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছেন। যেসব গ্রাহক এজেন্টের কাছে সরাসরি অভিযোগ করেছেন সেসব গ্রাহককে এজেন্ট টাকা ফেরত দিয়েছেন। তবে আমাদের কাছে কোনো গ্রাহক অভিযোগ করেননি।’ এ সময় স্থায়ীকালে এজেন্টটিতে কতজন গ্রাহক হয়েছে এবং মোট লেনদেনের পরিমাণ জানতে চাইলে তিনি তা জানাতে পারেননি।
ব্যাংকটির ব্যাংক কমিউনিকেশন হেড তানিয়া সাত্তার খবরের কাগজের সঙ্গে যোগাযোগ করে বলেন, ‘এ বিষয়ে মামলা হয়েছে। সেখানে গ্রাহক লেনদেনটি সরাসরি অফিসারের সঙ্গে করেছেন এবং সিস্টেমে টাকাগুলো পোস্টিং হয়নি। এখানে মূলত পকেট ব্যাংকিং হয়েছে। ফলে এই টাকার দায় ব্যাংক নেবে না। আর এজেন্টের কর্মী কিন্তু ব্যাংকের কর্মী নন। এটি আমরা আউটসোর্সিং করে দিই। এজেন্টের মালিক সেই লোক ঠিক করেন।’
তিনি এ সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধ করে আরও বলেন, ‘এমন সংবাদ এ সেক্টরে একটি অস্থিরতা তৈরি করবে এবং এক ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।’