নদী পাগলা হয়া গেছে, হামার আর কিছু না থাকিল। ৪০ বছর ধরি আছি, মনটা কুনঠে যাবার চাওছে না। কতদিন যে না খায়া থাকবার নাগবে, আল্লাহ জানে।’ তিস্তার তীব্র ভাঙনের শিকার রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার নোহালী ইউনিয়নের কাচারীপাড়ার ষাটোর্ধ্ব সুলতানা বেগম এভাবেই নিজের কষ্টের কথা বলছিলেন।
তিস্তা নদীর ভাঙনে গঙ্গাচড়ার নোহালী ইউনিয়নের চর নোহালী কাচারীপাড়া এলাকায় ৯টি বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে আরও প্রায় শতাধিক পরিবার। ঝুঁকিতে পড়েছে সরকারি-বেসরকারি কয়েকটি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় হাট-বাজার ও বিস্তীর্ণ ফসলি জমি। হঠাৎ শুরু হওয়া ভাঙনে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন নদীপাড়ের মানুষ।
গত বুধবার সরেজমিনে দেখা যায়, নদীর তীরজুড়ে ভাঙন চলছে। কোথাও বসতভিটার একাংশ ধসে নদীতে পড়ছে, আবার কোথাও নদী এসে ঠেকেছে বাড়ির আঙিনায়। অনেক পরিবার ঘরের টিন, কাঠ, বাঁশ, কংক্রিটের খুঁটি ও প্রয়োজনীয় মালামাল খুলে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন। চোখের সামনে বসতভিটা ও আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হতে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন অনেকে।
স্থানীয়রা জানান, গত সোমবার সকাল থেকে তিস্তার পানি বাড়তে শুরু করে। মঙ্গলবার সকাল থেকে পানি কমতে থাকলে শুরু হয় তীব্র ভাঙন। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ৯টি বসতবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে যায়। নোহালী ইউনিয়নের ২, ৭ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ড সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
স্থানীয়দের স্বেচ্ছাশ্রমে নির্মিত প্রায় ১৪ লাখ টাকা ব্যয়ে অন্তত দেড় হাজার মিটার দীর্ঘ একটি বালুর বাঁধ চর নোহালী, সুফিয়ারপাড়া, মেম্বারপাড়া, মিনারবাজার, আনন্দবাজার, আশ্রয়ণ বাজার, ব্রিফ বাজার ও সখের বাজারসহ আশপাশের বসতভিটা ও আবাদি জমি রক্ষা করছিল। তবে এক সপ্তাহ আগে বাঁধটি ভেঙে যাওয়ার পর থেকেই তিস্তার ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে আরও শতাধিক বাড়ি যেকোনো সময় নদীগর্ভে চলে যেতে পারে।
ক্ষতিগ্রস্ত মোতালেব হোসেন বলেন, ‘তিস্তার ভাঙনে আমার ৪৫ দোন (২৪ শতকে এক দোন) আবাদি জমি, ৮০ শতক বসতভিটা এবং সাত দোনের একটি পুকুর নদীগর্ভে চলে গেছে। বহু বছরের কষ্টে গড়া সবকিছু মুহূর্তেই হারিয়ে ফেলেছি। এখন পরিবার নিয়ে কোথায় থাকব, সেটাই বুঝতে পারছি না।’
আরেক ক্ষতিগ্রস্ত সাদিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমার ২০ দোন আবাদি জমির সঙ্গে বসতবাড়িটাও নদীগর্ভে চলে গেছে। বহু বছরের কষ্টে গড়া ঘরবাড়ি চোখের সামনে নদীতে বিলীন হয়ে গেল। এখন পরিবার নিয়ে কোথায় যাব, সেটাই বুঝতে পারছি না। মাথা গোঁজার কোনো ঠাঁই নেই।’
চর বাঘডহড়া এলাকার বাসিন্দা আজিনুর রহমান বলেন, ‘স্থানীয়দের স্বেচ্ছাশ্রমে নির্মিত বাঁধে যখন প্রথম ভাঙন দেখা দিয়েছিল, তখনই যদি পানি উন্নয়ন বোর্ড কার্যকর ব্যবস্থা নিত, তাহলে একটি বাড়িও ভাঙত না। এখন জরুরি ভিত্তিতে ভাঙনরোধে ব্যবস্থা না নিলে আরও শতাধিক বাড়ি নদীগর্ভে চলে যাবে।’
নোহালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফ আলী বলেন, ‘এরই মধ্যে ৯টি বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। আরও প্রায় ১০০টি বাড়ি চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।’
গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জেসমিন আক্তার বলেন, ‘নদীগর্ভে বিলীন হওয়া জায়গাটি প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা পরিদর্শন করেছেন। অর্থবছরের শেষের দিকে হওয়ায় এই মুহূর্তে তেমন বরাদ্দ মজুত নেই। চেয়ারম্যানকে বলা হয়েছে, তারপরও কিছু সহযোগিতা পৌঁছে দিতে। ওই পরিবারগুলোর যেহেতু থাকার জায়গা নেই, এ ক্ষেত্রে সরকারি খাস জমিতে থাকার বন্দোবস্ত করা যায় কি না, সেটিও ভেবে দেখা হচ্ছে।’