প্রতিদান কবিতার অনুধাবনমূলক প্রশ্ন ও উত্তর:
প্রশ্ন-২. ‘আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই যে মোরে করেছে পর’- ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ‘প্রতিদান’ কবিতার এ চরণের মাধ্যমে কবি শত্রুকে ক্ষমা করে তার প্রতি শুভ কামনা জানিয়ে এ কথা বলেছেন।
যে কবিকে পর করেছে তাকেই আপন করতে কবির প্রাণ কাঁদে। কবি সবাইকে আপনজন মনে করেন। তিনি কাউকে শত্রু ভাবতে পারেন না। তাই যারা কবিকে ভুল বুঝে পর করে দেয়, কবি তাদের জন্যই কেঁদে বেড়ান। কারণ তারা তাকে পর ভাবলেও কবি তা ভাবেন না। পরম মমতায় তাদের আপন করতে চান। পাপী-অন্যায়কারী-ভুল পথে চলা মানুষ আসলে অসহায়। তাই কবি অন্যায়কারীকে নয়, পাপকে ঘৃণা করে পাপীর মঙ্গল চান।
প্রশ্ন-৩. ‘যে মোরে করিল পথের বিরাগী পথে পথে আমি ফিরি তার লাগি’- ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ‘প্রতিদান’ কবিতার এ চরণে কবি পরার্থপরতার দিকটি উপস্থাপন করেছেন, শত্রুকে পরম প্রেমে আবদ্ধ করতে।
অহিংসাই পরম শান্তি। কবি বিশ্বাস করেন প্রতিশোধের মনোভাব প্রতিহিংসা বর্জন করে পরার্থপরতার মধ্যেই প্রকৃত সুখ ও জীবনের সার্থকতা লাভ করা সম্ভব। তাই কবিকে যে পথের বিরাগী করেছে, কবি তার জন্যই পথে পথে ফেরেন। অর্থাৎ অনিষ্টকারীর মঙ্গল কামনায় কবি নিজেকে নিবেদন করেন। অপকারীর উপকার করার মাধ্যমে তার মাঝে ইতিবাচক পরিবর্তন আনাই কবির লক্ষ্য। ক্ষমার মহিমায় পাপীর মনেও পুণ্যের বোধ জাগ্রত হতে পারে। তাই ক্ষমা করেও সুযোগ দিতে হয় ভালো পথে ফেরার।
প্রশ্ন-৪. ‘দীঘল রজনী তার তরে জাগি ঘুম যে হরেছে মোর’- ব্যাখ্যা করো?
উত্তর: ‘প্রতিদান’ কবিতার এ চরণে কবি, কবির শান্তি বিনষ্টকারীকে ক্ষমা ও প্রেমের মহিমায় শুভ কামনা জানিয়ে এ কথা বলেছেন।
কবি পাপীকে নয়, পাপকে ঘৃণা করেন। কবি অনিষ্টকারীকে আপন ভেবে কাছে টেনে নিতে চান। কারণ প্রতিশোধ নয় ভালোবাসার মধ্যেই রয়েছে মানবতার প্রকৃত সমাধান। তাই যে কবির ঘুম কেড়ে নিয়ে তাকে অশান্তিতে রেখেছে তার জন্যই কবি নির্ঘুম রাত কাটাতে চান । তার মঙ্গল চিন্তাই কবিকে ঘুমাতে দেয় না। পাপী যে অশান্তিতে আছে তা ভেবেই কবি দুঃখ পেয়েছেন। কবি চান অন্যায়কারী সৎ পথে ফিরে আসুক এবং মহৎ জীবনের স্পর্শ লাভ করুক।
প্রশ্ন-৫. ‘যে মোরে দিয়েছে বিষে ভরা বাণ আমি দেই তারে বুক ভরা গান’- ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ‘প্রতিদান’ কবিতার এ চরণে কবি প্রতিহিংসা আর প্রতিশোধে বিশ্বাস করেন না বলেই তিনি শত্রুকে হিংসার বদলে প্রতিহিংসা না দিয়ে হৃদয় উজাড় করে শুভ কামনা জানিয়েছেন।
কবি ব্যক্তিস্বার্থকে গুরুত্ব না দিয়ে সমষ্টির কথা ভাবেন। তিনি মনে করেন হিংসা-বিদ্বেষ মানবসমাজের ক্ষতিই করে। ভালোবাসাপূর্ণ, ক্ষমাশীল মানুষই পৃথিবীকে সুন্দর করতে পারে। তাই কবি বিষে-ভরা বাণের পরিবর্তে বুক ভরা গান দিয়েছেন। অর্থাৎ কটু বা মন্দ কথার বিপরীতে কখনো মন্দ কথা দিয়ে বিজয়ী হওয়া যাবে না। মন্দের বিপরীতে সত্য-সুন্দর শক্তিশালী হলেই কেবল পৃথিবী শান্তিময় হবে।
প্রশ্ন-৬. ‘প্রতিদান’ কবিতায় কবি কাঁটার বিনিময়ে ফুল দান করতে চান কেন ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ‘প্রতিদান’ কবিতায় কবি অনিষ্টকারীর উপকার করতে চান, হিংসার বিপরীতে প্রেম দিতে চান বলেই কাঁটার বিনিময়ে ফুল দান করার কথা বলেছেন।
প্রতিহিংসা আর নিষ্ঠুর বদলায় মানুষ সুখী হয় না। হয়তো সাময়িক সুখ মনে আসতে পারে, কিন্তু মানবতাকামী মানুষ এসব দেখে হতাশ হন। যুদ্ধ কখনো পৃথিবীতে শান্তি আনেনি। কবি বিশ্বাস করেন, অনিষ্টকারীকে কেবল ক্ষমা করেই নয়, বরং প্রতিদান হিসেবে তার উপকার করার মাধ্যমে পৃথিবীকে সুন্দর করা সম্ভব। কেউ ক্ষতি করেছে বলে প্রতিশোধের বশবর্তী হয়ে তারও ক্ষতি করতে হবে কবি তা মানতে নারাজ, তা কবির মানবধর্ম নয়। তাই কবিকে কেউ কাঁটা দিলে, হিংসা করলে কবি তাকে প্রতিদানে ফুল উপহার দেন। অর্থাৎ কেউ তার অনিষ্ট করলে বিনিময়ে তার মঙ্গল
সাধন করেন। হিংসার বিপরীতে কবি প্রতিহিংসায় বিশ্বাসী নন।
প্রশ্ন-৭. ‘মোর বুকে যেবা কবর বেঁধেছে আমি তার বুক ভরি, রঙিন ফুলের সোহাগ জড়ানো ফুল মালঞ্চ ধরি’- ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ‘প্রতিদান’ কবিতার এ চরণে নিন্দুককে, হিংসুককে ভালোবাসার মালঞ্চ বা বাগান উপহার দিয়ে সহিষ্ণুতার পরিচয় দিয়েছেন।
মানবিক মানুষ অহিংস। কবি বিশ্বাস করেন প্রতিহিংসা-প্রতিশোধ নয় বরং ভালোবাসাই জীবনের আদর্শ হওয়া উচিত। তাই কবিকে কেউ দুঃখ-কষ্ট দিলে তিনি ক্ষমা করে তাকে ভালোবাসা উপহার দিয়েছেন। এই চিন্তা থেকেই কবি কবরের বিনিময়ে মালঞ্চ উপহার দিয়েছেন। সহনশীলতা ও প্রীতিতে বিশ্বাসী বলে যে কবির বুকে ব্যথার কবর বেঁধেছে, কবি তারই বুক ফুল মালঞ্চে ভরিয়ে দিতে চান। যে কবিকে আঘাত করে, কবি তাকেই বুকে টেনে নেন। সহনশীলতা, ক্ষমা এবং ভালোবাসাই সংকটের সমাধান। তাই অনিষ্টকারীর বিরুদ্ধে প্রতিশোধ না নিয়ে কবি তার উপকারে ব্রতী হন। ভালোবাসাই পরম মানবিক অস্ত্র।
প্রশ্ন-৮. ‘প্রতিদান’ কবিতায় অনিষ্টকারীর উপকার করার কথা বলা হয়েছে যে কারণে তা ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ‘প্রতিদান’ কবিতায় কবি ভালোবাসাপূর্ণ সুন্দর পৃথিবী নির্মাণের আকাঙ্ক্ষায় অনিষ্টকারীর উপকার করতে বলেছেন।
পরার্থপরতাই জীবনের ধর্ম। মানবধর্ম মানেই মানবিকতা। ‘প্রতিদান’ কবিতায় ক্ষুদ্র স্বার্থকে পরিহার করে বৃহৎ স্বার্থের কথা ভাবা হয়েছে। তাছাড়া সমাজে বিদ্যমান হানাহানি-হিংসার পথ পরিহার করে ভালোবাসা, ক্ষমা, উদারতার পথ অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। কবি মনে করেন, ভালোবাসাপূর্ণ মানুষই পৃথিবীকে সুন্দর করতে পারে। সেক্ষেত্রে অনিষ্টকারীকে ক্ষমা করে দিয়ে তার দিকে ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। আজকের যুদ্ধবিধ্বস্ত, ভোগবাদী পৃথিবীতে কবির প্রেমের বাণী শান্তির করুণাধারা হয়ে উঠতে পারে।
আরও পড়ুনঃ
প্রতিদান কবিতার মূলভাব, জ্ঞানমূলক প্রশ্ন ও উত্তর
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ
আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ, ঢাকা
জাহ্নবী