ক্যাসিনো নামটি ২০১৯ সালের আগে খুব কমসংখ্যক মানুষ জানত। ওই বছর রাজধানীতে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে শতাধিক ব্যক্তি আটক হওয়ার পর গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বদৌলতে নামটি সবার মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। ক্যাসিনো জিনিসটা কী, এটা সাধারণের বোধগম্য হতে খানিকটা সময় নিয়েছিল। তবে ধীরে ধীরে বিষয়টি খোলাসা করে দেয় ফেসবুকের বিজ্ঞাপন।
হঠাৎ করেই ফেসবুকে ভাসতে থাকে অনলাইন ক্যাসিনোর বিজ্ঞাপন। নামিদামি তারকাদের ছবি দিয়ে কোটিপতি হওয়ার প্রলোভন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো তারকা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের ছবি ও ফুটেজ ব্যবহার করে বিজ্ঞাপন। ফেসবুকে বাংলায় সবচেয়ে বেশি অনলাইন জুয়ার বিজ্ঞাপনে ব্যবহার হয়েছে তার ছবি।
ধারণা করা হয়, প্রস্তর যুগের আগেও জুয়া খেলার প্রচলন ছিল। যিশুখ্রিষ্টের জন্মের তিন হাজার বছর আগে ইরাক, সিরিয়া, তুরস্কের বিভিন্ন জায়গায় বাজি ধরে পাশা খেলার মতো এক ধরনের খেলা হতো। খ্রিষ্টের জন্মের হাজার বছর আগে চীনে পশুর লড়াইয়ের ওপর বাজি ধরার প্রচলন ছিল। ১৬৩৮ সালে ইতালির ভেনিসে প্রথম জুয়ায় আসর বসে। যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাসকে বলা হয় জুয়ার নগরী। ইংল্যান্ডেও জুয়া বৈধ।
তবে হালে অনলাইন জুয়ার প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপনে সয়লাব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। আর এর সবচেয়ে বড় শিকার ক্রিকেটের এই তারকা ও সংসদ সদস্য।
বাংলাদেশে আইনত জুয়া অবৈধ। তা ছাড়া, কোনো ধর্মই জুয়াকে বৈধতা দেয়নি। ইসলাম ধর্মে তো জুয়া সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ।
সম্প্রতি অনলাইনে জুয়া খেলার বিজ্ঞাপন নিয়ে তথ্য যাচাই-বাছাই করেছে রিউমর স্ক্যানার বাংলাদেশ।
আন্তর্জাতিক ফ্যাক্ট চেকিং নেটওয়ার্ক স্বীকৃত তথ্য যাচাইকারী এই প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে চলমান গুজব ও ভুয়া খবর নির্মূল করা এবং সঠিক তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া নিয়ে কাজ করে থাকে।
এই প্রতিষ্ঠানটি পর্যবেক্ষণ করে দেখেছে, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইনে জুয়ার অ্যাপের প্রচারণার বিষয়টি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। দেশের কোনো সেলিব্রিটি তারকা এই প্রচারণায় অংশ না নিলেও তাদেরকে জড়িয়ে নিয়মিতই এসব বিজ্ঞাপন রীতিমতো ফেসবুকে বুস্ট করে প্রচার করা হচ্ছে।
পর্যবেক্ষণে বেরিয়ে এসেছে, ভুয়া এসব বিজ্ঞাপনের প্রচারণার প্রধান শিকার হয়ে উঠেছেন সাকিব আল হাসান। গত তিন মাসে শুধু সাকিবকে জড়িয়ে প্রচারিত এমন ১৯টি ভুয়া প্রচারণা শনাক্ত করা হয়েছে।
তা ছাড়া, ক্রিকেটার মাশরাফি বিন মর্তুজা, মুশফিকুর রহিম, তামিম ইকবাল, মোস্তাফিজুর রহমান, চিত্রনায়ক শাকিব খান, মনোয়ার হোসেন ডিপজল, সংগীতশিল্পী এবং অভিনেতা তাহসান রহমান খান, কনটেন্ট নির্মাতা তাওহীদ আফ্রিদি এবং ইফতেখার রাফসানও হয়েছেন এসব ভুয়া বিজ্ঞাপনের শিকার।
বাংলাদেশের জুয়ার বিজ্ঞাপনে আইনগত নিষেধাজ্ঞা থাকলেও অনলাইনে জুয়া খেলার অ্যাপগুলো দেদার প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মতো জনপ্রিয় সামাজিক মাধ্যমগুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থার অ্যাড লাইব্রেরি অনুসন্ধান করে প্রতিদিন হাজারো জুয়ার অ্যাপের বিজ্ঞাপন প্রচারিত হতে দেখা যায়।
এসব প্রচারণায় ভিডিও বিকৃতি করে ব্যবহার করা হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, সাকিব আল হাসানের বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারের অংশে তার কণ্ঠ নকল করে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে নতুন অডিও জুড়ে দিয়ে ভিডিওগুলো জুয়ার বিজ্ঞাপন হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে।
এসব বিকৃতি থেকে রেহাই পায়নি গণমাধ্যমের সংবাদ বুলেটিনও। দেশি-বিদেশি এসব বুলেটিন প্রযুক্তির মাধ্যমে বিকৃতি করা হচ্ছে দর্শকদের বিশ্বাস অর্জনের জন্য।
পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, এক পেজে কিছুদিন বিজ্ঞাপন চালানোর পর সে পেজে বিজ্ঞাপন চালানো বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর আবার অন্য কিছু পেজে বিজ্ঞাপন চালানো হয়। এভাবে বিজ্ঞাপন চলতে থাকে। এ ছাড়া যে পেজগুলো থেকে বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়, সে পেজগুলোর টাইমলাইনে সংশ্লিষ্ট পোস্টগুলো থাকে না।
পেজগুলোর ট্রান্সপারেন্সি সেকশন পর্যবেক্ষণে জানা যায়, এ পেজগুলোর বেশিরভাগই দেশের বাইরে থেকে পরিচালনা করা হয়।
সাধারণ ফেসবুক ব্যবহারকারীরা এসব বিজ্ঞাপনের সত্যতা যাচাই করতে যান না। ফলে এতে সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন ভিক্টিম। বুস্ট করা এসব বিজ্ঞাপনকে সত্য ভেবে কমেন্টে সাকিবকে গালমন্দ করছেন অনেকেই।
সাকিবই কেন বিজ্ঞাপনের মুখ? এর পেছনে রয়েছে ছোট একটু ইতিহাস। ২০১৯ সালের অক্টোবরে জুয়াড়ির কাছ থেকে প্রস্তাব পাওয়ার তথ্য গোপন করায় এক বছরের জন্য আইসিসি কর্তৃক ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ হয়েছিলেন সাকিব আল হাসান। পরবর্তী সময়ে ২০২২ সালে বেটউইনার নিউজ নামে একটি ওয়েবসাইটের পণ্যদূত হন সাকিব, যা বেটউইনার নামে এক বেটিং প্রতিষ্ঠানের ক্রীড়াবিষয়ক সংবাদমাধ্যম। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) প্রধান নাজমুল হাসান পাপন তখন স্পষ্ট জানিয়ে দেন, যদি সাকিব এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি বাতিল না করেন, তা হলে বিসিবি তার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখবে না। এরপর সাকিব ওই প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি বাতিল করেন।
এই ঘটনার বছরখানেক পরেই বাবুএইটিএইট নামের একটি অনলাইন জুয়ার পোর্টালের বিজ্ঞাপনে দেখা যায় সাকিবকে। ভিডিওতে সাকিব বলছেন, “বাবু এইটিএইট স্পোর্টস বাংলাদেশের এক নম্বর স্পোর্টস প্ল্যাটফর্ম, যেখানে আপনি ক্রিকেটসহ অন্যান্য খেলার আপডেট পাবেন।” কিন্তু পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, এই সাইটটি আসলে একটি জুয়ার সাইট, যেখানে ক্রিকেট নিয়ে বাজি ধরার পাশাপাশি ক্যাসিনো, স্লট গেমের মতো জুয়াও খেলা যায়। এসব ঘটনাপ্রবাহ সাকিবকে জুয়ার ভুয়া বিজ্ঞাপনগুলোর শিকার বানানোর ক্ষেত্রে প্রভাবক হয়ে থাকতে পারে।
তা ছাড়া, সাকিবের জনপ্রিয়তা ও পূর্বের জুয়াসংশ্লিষ্টতার অভিযোগের কারণে প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপনের জন্য তাকে ব্যবহার করা সহজ এবং কার্যকর বলে মনে করছে বিজ্ঞাপন প্রচারকারীরা।
মেটা’র নীতিমালা কী বলে?
ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের পরিচালনা প্রতিষ্ঠান মেটার অনলাইন জুয়া এবং গেমিং বিজ্ঞাপন নীতিমালা রয়েছে। এ ধরনের বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্য বিজ্ঞাপনদাতাদের মেটার লিখিত অনুমতি এবং স্থানীয় আইন মেনে চলার প্রমাণ দেখানোর কথা বলা আছে। এ ধরনের বিজ্ঞাপন চালানো যাবে শুধু মেটার নির্ধারণ করা নির্দিষ্ট কিছু দেশে। নীতিমালায় অনুমতি নিয়ে জুয়াসংক্রান্ত বিজ্ঞাপন চালানো যাবে এমন ৩৪টি দেশের নাম উল্লেখ থাকলেও এর মধ্যে বাংলাদেশের নাম নেই।
তবে অনুমতি ছাড়া শুধু জুয়াসংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান, সরকারি লটারি এবং বিনামূল্যে খেলার গেমগুলোর প্রচার করা যাবে।
বর্তমান আইনে বাংলাদেশে জুয়া বেআইনি হলেও এই আইন ১৮৬৭ সালে ব্রিটিশ আমলে প্রণীত হয়েছিল। বাংলাদেশ পুলিশ ১৮৬৭ সালের পাবলিক গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট সংশোধনের আহ্বান জানিয়েছে। এই আইন অনলাইন জুয়ার মতো নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অপ্রতুল।
অনেকেই শুধুমাত্র বিনোদনের জন্য জুয়া খেলা শুরু করেন। পরে তাদের অনেকেই এতে আসক্ত হয়ে পড়েন। আর এই আসক্তি তাদের বিভিন্ন অপকর্মের দিকে ঠেলে দেয়। জুয়া খেলে হেরে যাওয়া টাকা ফেরত পেতে তারা বারবার জুয়া খেলেন। ফলে এক সময় তা মস্তিষ্কের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে।
অমিয়/