ব্রণ বা Acne খুবই সাধারণ ত্বকের সমস্যা, যা প্রায় সবার জীবনেই কোনো না কোনো সময় দেখা দেয়। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের মধ্যে এটি বেশি হয়। ব্রণ এমন একটি ত্বকের অবস্থা, যেখানে ত্বকের রন্ধ্র বা লোমকূপ বন্ধ হয়ে যায়। এই বন্ধ রন্ধ্রে তেল (Sebum), মৃত কোষ ও ব্যাকটেরিয়া জমে গিয়ে ছোট ফুসকুড়ি তৈরি করে। এই ফুসকুড়িগুলোই ব্রণ নামে পরিচিত। অনেক সময় এটি ব্যথাযুক্ত হয় এবং ঠিকভাবে চিকিৎসা না করলে দাগ থেকে যেতে পারে।
ব্রণের ধরন
ব্রণের বিভিন্ন ধরন রয়েছে। যেমন-
সিস্টিক ব্রণ: গভীর ও পুঁজভরা বড় ব্রণ, যা ত্বকে স্থায়ী দাগ ফেলতে পারে।
ফাঙ্গাল ব্রণ: ছত্রাক সংক্রমণের কারণে হয়, চুলকায় ও প্রদাহ সৃষ্টি করে।
হরমোনজনিত ব্রণ: হরমোনের ভারসাম্যহীনতার কারণে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে দেখা যায়।
নডুলার ব্রণ: ত্বকের নিচে শক্ত ও ব্যথাযুক্ত গাঁট তৈরি করে।
এগুলোর মধ্যে সিস্টিক ও নডুলার ব্রণ বেশি মারাত্মক এবং দাগের ঝুঁকি বেশি। তাই দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
কারা বেশি আক্রান্ত হয়
ব্রণ মূলত কিশোর-কিশোরী ও তরুণ বয়সে বেশি হয়। কারণ এ সময় শরীরে হরমোনের পরিবর্তন ঘটে। তবে অনেক প্রাপ্তবয়স্ক নারীও হরমোনের কারণে বা মানসিক চাপের কারণে ব্রণে আক্রান্ত হতে পারেন। পরিবারে কারও ব্রণের ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি আরও বাড়ে। বিশ্বজুড়ে প্রায় ১১ থেকে ৩০ বছর বয়সী ৮০ শতাংশ মানুষ জীবনের কোনো না কোনো সময় ব্রণে ভোগেন।
কোথায় বেশি হয়
ব্রণ সাধারণত এমন জায়গায় হয় যেখানে তেলগ্রন্থি বেশি থাকে। যেমন- মুখ, কপাল, বুক, কাঁধ ও পিঠে।
ব্রণের লক্ষণ
ব্রণ সব সময় এক রকম নয়। এর কয়েকটি সাধারণ রূপ হলো—
পিম্পল বা পুঁজভরা ফুসকুড়ি
লালচে ছোট দানা (Papule)
ব্ল্যাকহেডস (Blackheads)—রন্ধ্রের মুখ কালচে হয়ে যায়
হোয়াইটহেডস (Whiteheads)—সাদা টিপযুক্ত ছোট দানা
নডিউল বা সিস্ট— ত্বকের নিচে বড় ব্যথাযুক্ত গাঁট
কখনো কখনো এসবের সঙ্গে ত্বকে জ্বালাভাব বা ব্যথা থাকতে পারে।
ব্রণের কারণ
ত্বকের রন্ধ্র বন্ধ হয়ে গেলে ব্রণ হয়। রন্ধ্র বন্ধ হওয়ার প্রধান কারণগুলো হলো—
অতিরিক্ত তেল নিঃসরণ
ত্বকে থাকা ব্যাকটেরিয়া
মৃত ত্বককোষ জমে থাকা
এগুলো একত্রে জমে রন্ধ্র বন্ধ করে দেয়। ফলে ত্বকে প্রদাহ ও ফুসকুড়ি হয়।
ব্রণ বাড়িয়ে দেয় যেসব কারণ
টাইট পোশাক বা হেলমেট, টুপি ব্যবহার
ঘাম, আর্দ্রতা ও দূষণ
অতিরিক্ত তেলযুক্ত বা ভারী ক্রিম ব্যবহার
মানসিক চাপ বা স্ট্রেস
কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
বারবার ব্রণ খোঁচানো বা ফাটানো
অতিরিক্ত দুধ, চিনি ও প্রোটিনযুক্ত খাবার গ্রহণ
বিশেষজ্ঞরা বলেন, চকলেট সরাসরি ব্রণ সৃষ্টি করে না, তবে বেশি চিনি খেলে ব্রণ বাড়তে পারে।
হরমোন ও ব্রণ
ব্রণ অনেকাংশেই হরমোননির্ভর। কিশোর বয়সে টেস্টোস্টেরনসহ বিভিন্ন হরমোন ত্বকের তেল উৎপাদন বাড়ায়। ফলে রন্ধ্র বন্ধ হয়ে ব্রণ হয়। নারীদের মাসিকের সময় হরমোন পরিবর্তনের কারণেও ব্রণ দেখা দিতে পারে।
ঘরোয়া যত্ন ও করণীয়
ব্রণ হলে প্রথমে ঘরোয়া যত্নে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে—
প্রতিদিন অন্তত একবার হালকা গরম পানি ও মৃদু ক্লিনজার দিয়ে মুখ ধুতে হবে।
ঘাম বা ধুলো লাগলে মুখ পরিষ্কার করতে হবে।
অ্যালকোহল, টোনার বা স্ক্রাবযুক্ত পণ্য এড়িয়ে চলুন।
প্রতিদিন মেকআপ তুলে ঘুমাতে যান।
তেলমুক্ত (oil-free) ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন।
ব্রণ খোঁচানো বা ফাটানো থেকে বিরত থাকুন। এতে দাগ পড়ে যায়।
যদি এসব পদ্ধতিতে উন্নতি না হয়, তবে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
চিকিৎসা ও সময়কাল
সাধারণ ব্রণ দুই সপ্তাহের মধ্যে নিজে নিজেই সেরে যেতে পারে। তবে গুরুতর ব্রণ হলে ওষুধ বা বিশেষ চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে। চিকিৎসার মাধ্যমে ত্বক দ্রুত ভালো হয় ও দাগ পড়ার ঝুঁকি কমে।
ব্রণ প্রতিরোধের উপায়
প্রতিদিন মুখ ধোয়া ও ত্বক পরিষ্কার রাখা
তেলমুক্ত প্রসাধনী ব্যবহার
মেকআপ ব্যবহারের পর ধুয়ে ফেলা
অপ্রয়োজনে মুখে হাত না দেওয়া
ব্রণ কোনো গুরুতর রোগ নয়, তবে আত্মবিশ্বাসে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এটি অবহেলা না করে শুরুতেই যত্ন নিলে ও প্রয়োজন হলে চিকিৎসা নিলে ত্বক আবার আগের মতো উজ্জ্বল ও পরিষ্কার হয়ে উঠবে।
সূত্র: ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক


