মাত্রই শেষ হলো এফএম ৯২ মেগাহার্টজের অনুষ্ঠান। এখন সবার বাসায় ফেরার তাড়া। কারণ ঘড়ির কাঁটা তখন রাত ১১টা অতিক্রম করেছে। দ্রুত বাসায় ফিরতে হবে বলে লিফটের অপেক্ষা না করে কেউ কেউ সিঁড়ি দিয়েও নেমে গেলেন। অনুষ্ঠানটি হচ্ছিল দ্বিতীয় তলার স্টুডিওতে।
একে একে সবাই রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ বেতারের কার্যালয়ের মূল গেট থেকে বেরিয়ে গেলেন। শুধু বেরোলেন না একজন। তিনি একটি ব্যাগ নিয়ে চলে গেলেন বেতার কার্যালয়ের পেছনের দিকে। যেখানে তখন রাতের নিস্তব্ধতা। কয়েকটি কুকুর ছাড়া আর কেউ নেই। আরেকটু সামনে এগোতেই তাকে দেখেই কুকুরগুলো দৌড়ে এল; তারা যেন তারই অপেক্ষায় ছিল। তিনি ব্যাগ থেকে একটি করে প্যাকেট বের করলেন, আর ছুড়ে দিতে লাগলেন সামনের দিকে। কুকুরগুলো লাফিয়ে ক্যাচ ধরার মতো বিস্কুটগুলো ধরে ধরে খাচ্ছিল।
এভাবে কয়েক প্যাকেট বিস্কুট শেষ করে তিনি চলে এলেন বেতারের মূল ফটকের সামনে। এবার হয়তো বেরিয়ে পড়বেন। কিন্তু না। বেরোলেন না। তার চোখ গেল মূল গেটের বাম দিকে শুয়ে থাকা একটি কুকুরের দিকে। কাছে গিয়ে তাকেও বিস্কুট খাওয়ালেন। তারপর মাথায় হাত দিয়ে আদর করে বেরিয়ে একটি রিকশা নিলেন।
কিছু দূর গিয়ে একটি চায়ের দোকানের সামনে থামলেন। সেখানে অনেকগুলো কুকুর ঘুরছিল। তিনি রিকশা থেকে নামতেই তাকে দেখে কুকুরগুলো দৌড়ে তার কাছে এল। তিনিও দ্রুত একটি টুলে বসে ব্যাগ থেকে বের করে বিস্কুটের প্যাকেট ছিঁড়ে ছুড়ে দিতে লাগলেন। আহ্লাদে কুকুরগুলো যেন আটখানা। বলছিলাম বাংলাদেশ বেতারের উপস্থাপক নাসিমা রাজ্জাক যুথির কথা। সম্প্রতি তাকে এমনটা করতে দেখা যায়। তবে এমনটা তিনি প্রতিদিনই করেন।
যুথির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ছোটবেলা থেকেই তার অবলা প্রাণীদের প্রতি খুব টান। বাসায় বড় ভাই বিলাতি ইঁদুর, খরগোশ, বেজি, কবুতর ও ময়না পুষতেন। ভাইয়ের সঙ্গে সেই প্রাণীদের যত্ন নিতে নিতে জন্মে যায় অবলা প্রাণীদের প্রতি ভালোবাসা। তখন তিনি স্কুলে পড়তেন। আসা-যাওয়ার সময় রাস্তার কুকুর দেখে তার খুব মায়া হতো। টিফিনের টাকা জমিয়ে রাস্তায় থাকা বেওয়ারিশ কুকুরদের খাওয়াতেন।
.jpg)
চাকরি পাওয়ার পর প্রাণীদের খাওয়ানোর সেই পরিসর আরও বৃদ্ধি পায়। যুথি ২০১৬ সাল থেকে বাংলাদেশ বেতারে উপস্থাপক হিসেবে কর্মরত আছেন।
যুথি জানান, তিনি ডিউটি শেষ করে বাসায় ফেরার পথে প্রতিদিন এভাবে কুকুরদের খাওয়ান। তার বাসার নিচেও তিনটি কুকুর থাকে। সেগুলোকেও প্রতিদিন খেতে দেন। অসুস্থ হলে ট্রিটমেন্ট করান। ভ্যাকসিন লাগলে তাও দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। শুধু কুকুর না; বিড়ালদেরও খাওয়ান তিনি। প্রতিদিন ছয়টি বিড়াল আসে তার বাসায়। তিনি তাদের খাওয়ান এবং গোসল করিয়ে দেন। খাওয়ানো আর গোসল করিয়ে দেওয়ার পর একটি নির্দিষ্ট সময়ে বিড়ালগুলো চলে যায়। যখন তাদের ক্ষুধা লাগে তখন আবার তারা যুথির বাসায় চলে আসে।
২০১৩ সাল থেকে নিজের টাকায় এভাবে প্রতিদিন রাজধানীর সড়কে থাকা কুকুরদের খাওয়াচ্ছেন তিনি। চাকরি করে যা আয় করেন তার বড় একটা অংশ দিয়ে তিনি খাবার কিনে কুকুর-বিড়ালদের খাওয়ান। যে দিন তার অফিস বন্ধ থাকে সে দিন মুরগির হাড়-ডানা কিনে নিয়ে বিভিন্ন পার্কে গিয়ে কুকুরদের খাওয়ান। যুথি বলেন, ‘যেখানেই যাই। সেখানেই এরকম কুকুর দেখলেই কিছু না কিছু কিনে খাওয়াই। আমাদের ক্ষুধা লাগলে আমরা বলতে পারি। কিন্তু ওরা বলতে পারে না। তাই আমাদের উচিত ওদের খাবার দেওয়া।’
যুথির এ কাজ তার সহকর্মীদের ভালো লাগে। পরিবারের সদস্যরাও তাকে বেশ সাপোর্ট করে। যুথির বাবা আব্দুর রাজ্জাক মিয়া বলেন, ‘যেখানে মানুষের প্রতি মানুষের মায়া দিন দিন কমে যাচ্ছে, যেখানে সামান্য কারণেই মানুষ মানুষকে হত্যা করছে—সেখানে আমার মেয়ের প্রাণীদের প্রতি এত মমতা দেখে সত্যিই একজন বাবা হিসেবে গর্ব অনুভব করি।’
যুথির সহকর্মী শেখ আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘যুথিকে দেখি অফিসে ঢোকার সময় ব্যাগে করে অনেকগুলো বিস্কুটের প্যাকেট নিয়ে আসে। আর বের হওয়ার সময় কুকুরগুলোকে খাওয়াতে যায়। এটা আমাদের কাছে বেশ ভালো লাগে। ও আসলে খুবই মানবিক। আমাদের সবারই এমন মানবিক হওয়া উচিত।’
তারেক
.jpg)
.jpg)