জন্ম থেকে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী আব্দুল গফুর মল্লিকের বয়স ৭৮ বছর। বয়সের ভারে দুই কদম হাঁটলেই হাঁপিয়ে ওঠেন। ভাঙাচোরা এক ঘরে স্ত্রীকে নিয়ে কাটে তার দিন। কোনো সন্তান নেই। তবুও প্রতিদিন সকালে তিনি একটি ঝুলিতে নাড়ু, বাদাম, হজমি ইত্যাদি নিয়ে পথে বের হন বিক্রির জন্য। অনেকেই তাকে ভিক্ষা করার পরামর্শ দিলেও তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন, ‘হাত পেতে নয়, ব্যবসা করেই খেতে চাই।’
রাজবাড়ী সদর উপজেলার পাঁচুরিয়া ইউনিয়নের খোলাবাড়িয়া গ্রামে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী আব্দুল গফুর মল্লিকের বাড়ি। একদিকে দরিদ্র আর অন্যদিকে অন্ধত্ব। এমন সীমাবদ্ধতাও আব্দুল গফুরকে আটকিয়ে রাখতে পারেনি। ৬৭ বছর ধরে তিনি নারকেলের নাড়ু বিক্রি করছেন। আগে মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে নারকেল পেড়ে দিতেন। বিনিময়ে কিছু নারকেল পেতেন তিনি। সেটা দিয়েই তিনি নিজ হাতে নাড়ু তৈরি করতেন। গত বছর পর্যন্ত আব্দুল গফুর নিজেই নারকেল ভেঙে নাড়ু বানাতেন। তারপর ছুটতেন খানখানাপুর রেলস্টেশনের দিকে। চোখে না দেখায় প্রায়ই পড়ে যেতেন এদিক-সেদিক। রেলের ঝাঁকুনিতে টিকে থাকতে পারতেন না। কখনো মানুষ তাকে ধরে উঠতে সাহায্য করত। হাত ধরে সামনে নিয়ে যেত।
গফুর নিজেই এই সাহসী আত্মসম্মানের জীবন বেছে নিয়েছেন। ছোটবেলায় গ্রামের অনেকেই বলেছিল, দুই সিপারা-কোরআন মুখস্থ করে গান খেয়ে ভিক্ষা করলে লাখ টাকা আয় করা সম্ভব। আত্মবিশ্বাসী আব্দুল গফুর তখন সাফ জানিয়ে দেন, কখনো ভিক্ষা করব না। কাজ করে খাব। ‘তুমি তো কাজ করতে পারবে না। তাহলে কীভাবে খাবে?’ বাবার এমন কথায় গফুরের জবাব ছিল- আল্লাহ খাওয়াবে। এই কথা বলে তিনি একটুও বসে থাকেননি। সর্বক্ষণ কাজ করে গেছেন। এক সময় চানাচুর, বিস্কুটও বিক্রি করেছেন। কারখানায়ও কাজ করেছেন কিছুদিন। খেয়ে-না খেয়ে থাকলেও এই দীর্ঘ জীবনে আব্দুল গফুর কারও কাছে হাত পাতেননি। অনেকে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী গফুরের বাদাম, নাড়ু নিয়ে ঠিকমতো টাকা দেয় না। এ নিয়ে মন খারাপ হলেও গফুরের কোনো আক্ষেপ নেই। যে জীবন তিনি ৭৮ বছর ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন তাতে শত শত না পাওয়া, কষ্ট, বেদনা থাকলেও তার কোনো আক্ষেপ নেই।
তিনি কখনো নারকেল গাছে উঠে মিষ্টি তৈরির উপকরণ জোগাড় করতেন, আবার কখনো ট্রেন ট্রেনে ঘুরে নাড়ু ও বাদাম বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। আব্দুল গফুর আজ আমাদের সমাজের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। আব্দুল গফুরকে নিয়ে তার স্ত্রী নূরজাহান বেগম বলেন, ‘আমার স্বামী কখনো ভিক্ষা করেন না। কারও কাছে হাত পেতে চলেন না। আমি তার কাজে সাহায্য করি। নারকেলের নাড়ু বানিয়ে দিই, বাদাম ভেজে প্যাকেট করে দিই। এগুলো নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বিক্রি করেন। এ থেকে যে আয় হয়, তা দিয়ে সংসার চলে।’
গফুরের কোনো সন্তান নেই। সংসারে স্ত্রী, বড় ভাই কেরামত মল্লিকের ছেলে আবদুল বাতেন, বাতেনের স্ত্রী ও এক সন্তান আছে। বাতেন মল্লিক বলেন, ‘প্রায় ২২ বছর আগে বাবা মারা যাওয়ায় আব্দুল গফুর চাচার কাছেই বড় হয়েছি। তাদের সন্তান না থাকায় আমাকে লালন-পালন করেন। চাচা জন্ম থেকে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। তিনি কখনো কারও কাছে হাত পাতেননি। জীবিকার জন্য নাড়ু-বাদাম বিক্রি করেন।’
জীবনসংগ্রামী আব্দুল গফুর মল্লিকের গল্পটা হয়তো আমাদের অজানাই থেকে যেত, যদি না থাকতেন মোহাম্মদ এনায়েত হোসেন- যিনি সবার কাছে মুন্সি এনায়েত নামে পরিচিত। তিনি একজন ভ্লগার, সমাজের সংগ্রামী মানুষদের গল্প এবং দেশের দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষের জীবনের বাস্তবচিত্র তার ক্যামেরার লেন্সে অনবদ্যভাবে ফুটে ওঠে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়ান তিনি, শুধু মানুষের গল্প খুঁজে পেতে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতায় মাস্টার্স শেষ করেও তিনি কোনো গণমাধ্যমে যুক্ত হননি। বরং নিজের ক্যামেরা হাতে তুলে নিয়ে প্রান্তিক মানুষের গল্প বলা শুরু করেছেন নিজস্ব উপায়ে- সত্যনিষ্ঠ, মানবিক আর অনুপ্রেরণামূলক দৃষ্টিতে।
কাজ করতে করতেই ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর মুন্সি এনায়েত আব্দুল গফুরের সন্ধান পান। আব্দুল গফুরকে নিয়ে তার ফেসবুক পেজে ভিডিওটি প্রায় ৪০ মিলিয়ন মানুষ দেখেছেন। অনেকেই এই ভিডিও ডাউনলোড করে তাদের পেজে আপলোড করেন। সেখানেও কারও ভিউ ১৫ থেকে ২৮ মিলিয়ন পর্যন্ত হয়েছে। অনুমতি না নিয়ে এভাবে অন্যের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে দিলেও এনায়েতের কোনো আপত্তি কিংবা অভিযোগ নেই। তিনি কপিরাইট ক্লেম পর্যন্ত করেননি। তিনি বলেন, “আমি শুধু চেয়েছিলাম মানুষ যেন একজন পরিশ্রমী ও আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন মানুষের গল্প জানে, আমি চেয়েছি আব্দুল গফুর মল্লিক ঘুরে দাঁড়াক। আমি ভাবতে পারিনি ‘গফুর চাচার’ ভিডিও এত মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যাবে। এখন দেখি, মানুষ শুধু দেখেনি- তার পাশে দাঁড়িয়েছে। এটিই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”
আব্দুল গফুর মল্লিক একদিন তাকে অনুরোধ করেছিলেন একটি মোবাইল ফোন এবং বিকাশ অ্যাকাউন্ট খুলে দেওয়ার জন্য। প্রথম দেখা হওয়ার দিনই এনায়েত গফুরের সেই ছোট্ট ইচ্ছা পূরণ করেন- একটি ফোন হাতে তুলে দেন এবং বিকাশ অ্যাকাউন্ট খুলে দেন তার নামে।
মূলত এনায়েতের তৈরি ভিডিওটিই বদলে দিয়েছে আব্দুল গফুরের জীবন। সেই ভিডিওটি দেখে বহু মানুষ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। সম্প্রতি একটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা থেকেও আব্দুল গফুরকে অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এরপর থেকে আব্দুল গফুরকে আর ট্রেনে চড়ে নাড়ু বিক্রি করতে হয়নি। উল্লেখ্য, একবার ট্রেন থেকে পড়ে গিয়ে তিনি গুরুতর আঘাতও পেয়েছিলেন।
জীবনের শেষপ্রান্তে এসে আব্দুল গফুর মল্লিক থেমে থাকতে চান না। শুয়ে-বসে কাটানো জীবন তার পছন্দ নয়। তিনি চান একটি স্থায়ী দোকানের ব্যবস্থা, যেখানে নিজের হাতে পরিশ্রম করে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কাজ করে যেতে পারবেন। কর্মই তার আনন্দ, আত্মসম্মানই তার শক্তি- এই বিশ্বাস নিয়েই এগিয়ে চলেছেন তিনি।
তারেক/
.jpg)
.jpg)