জ্যোৎস্না রাত। চাঁদের আলোয় চারদিকে সব স্পষ্ট। একেবারে দিনের মতো। গ্রামে সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গেই গ্রাম একেবারে নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে। সব কোলাহল যেন থেমে যায় তখন। গ্রামের বেশির ভাগ মানুষই কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। হাড়ভাঙা খাটুনির পর সন্ধ্যা নামলেই তারা ঘুমিয়ে পড়েন। আবার ফজরের নামাজ পড়েই তাদের কর্মব্যস্ততা বেড়ে যায়। তবে কোনো ধরনের বিয়ে-পার্বণ থাকলে ভিন্ন কথা। তখন পুরো গ্রাম আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে পড়ে। এক বাড়িতে বিয়ে হলে আশপাশের সব বাড়িতেই সেই আনন্দের ছোঁয়া লাগে।
গ্রামের বিয়ে মানেই নারীদের গীত গাওয়ার আসর। দলবেঁধে তারা গীত গায়। বিয়েবাড়িতে আশপাশের বাড়ির ভাবিরা আসেন গীত গাইতে। অনেকেই সং সাজেন। সং সেজে সবার কাছ থেকে বকশিশ আদায় করেও থাকেন। সে টাকায় আবার সবাই ভাগ বসান। তা দিয়ে খাওয়া হয় বনভাত। আগের দিনে গ্রামের বিয়েগুলো এমনই আনন্দ-উৎসবে ভরপুর ছিল। ছয় মাস আগ থেকে চলত বিয়ের আয়োজন। শুকনো পিঠা তৈরি করে মাটির মটকা ভরে রাখা হতো। সব আত্মীয়স্বজন বিয়ের আগেই পিঠা বানিয়ে তা শুকিয়ে বিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দিত। তখনকার সময়ে বিয়ের আয়োজন চলত রাতে। বাড়ির বিশাল উঠানে চলত খাওয়ার পর্ব। পাটের ছালার চট বিছিয়ে সন্ধ্যা থেকে পিঠা পরিবেশন করা হতো। গ্রামে তখনকার সময়ে বৈদ্যুতিক বাতি ছিল না। তবে কেরোসিনের হ্যাজাক বাতি ছিল। তা জ্বালালে পুরো উঠান আলোতে ফকফক করত। হ্যাজাক বাতি আবার হাট বা গঞ্জ থেকে ভাড়ায় আনা লাগত।
পিঠা পরিবেশন এবং খেতে খেতে মধ্যরাত পেরিয়ে যেত। তারপর আসত ভাতের পালা। ছয় মাসে ধরে তৈরি পিঠার আয়োজনে থাকত নানা ধরনের মুনশিয়ানার ছাপ। বাহারি এবং বৈচিত্র্যময় পিঠা খেতে খেতে মুখ ব্যথা হয়ে যেত। তাই যখনই ভাত আসত তখন একটা আনন্দবোধ করতাম। গ্রাম্য বিয়েগুলো মূলত শীতকালেই বেশি হতো। তখনকার সময়ে খাল-বিল শুকিয়ে গেলে ধরা পড়ত বড় বড় গজার মাছ। বিয়ে বাড়ির তখনকার মূল আয়োজনে থাকত গজার মাছের ভাপাড়া। তার ঘ্রাণ ও স্বাদ অন্য কিছুর সঙ্গে তুলনা চলে না। গজার মাছের সরিষা ভাপাড়া একবার যে খেয়েছে সে কখনো ভুলতে পারবে না। তবে সবাই সে মাছ রান্না করতে পারত না। তার জন্য রয়েছে আলাদা হাত-যশের ব্যাপার। গজার মাছ রান্নার জন্য অনেক দূর থেকে বাবুর্চিদের আনা হতো।
গ্রাম্য বিয়ের সবচেয়ে মজার ব্যাপার ছিল ছেলেপক্ষ এবং মেয়েপক্ষ শ্লোক ভাঙানি। তাদের আগেই খাবার পরিবেশ করা হতো না। আগে চলত দুপক্ষের ভাড়া করা আনা শ্লোক শিল্পীদের নানা ধরনের প্যাঁচে ভরা শ্লোক। এসব শ্লোক এক পক্ষ অপর পক্ষকে ভাঙাতে দিত। তাতে যদি ছেলেপক্ষ মেয়ে পক্ষকে আগে হারাতে পারত তাহলেই খাবার তাড়াতাড়ি পেত। নাহলে ছেলেপক্ষের আর দুর্দশার সীমা-পরিসীমা থাকত না। অনেক বিয়েতে শ্লোক ভাঙানি করতে করতে ফজর পর্যন্ত গড়াত। এমনই আমোদময় ছিল আবহমান গ্রামবাংলার বিবাহপর্ব। শ্লোক ভাঙানোর জন্য অন্য জেলা থেকে ফুটবল খেলার প্লেয়ার হায়ার করার মতো তাদের হায়ার করে আনা হতো। কোনোমতেই মেয়েপক্ষের কাছে ছেলেপক্ষের শ্লোকে হারা চলবে না। তাই তো শ্লোক ভাঙানোর জন্য এত আয়োজন থাকত।
তা ছাড়া বিয়ের দিন চলত কাদামাটি আর কালি মাখামাখি। উঠানে কলসের পর কলস পানি ঢেলে তা কাদায় পরিণত করা হতো। গ্রামে আবার এ কাদাকে বলা হতো প্যাক। যুবক-যুবতী এবং ভাবি-দেবরদের কাদা-কালি খেলা ছিল আনন্দের এক ব্যাপার। কেউ ঘরের ভেতর গিয়ে লুকালেও তাকে সেখান থেকে খুঁজে বের করে কাদার মধ্যে গড়ানি খাওয়ানো হতো। এমনভাবে কাদায় ডুবানো হতো যে এটা মানুষ না ভূত তা বলা যেত না।
তবে বিয়েবাড়ির প্রধান আকর্ষণ ছিল পালকি। পালকির বেহারাদের হেলে-দুলে মানুষের বাড়ির উঠান, আবার কখনো কখনো কাশবনের মাঠ পেরিয়ে জ্যোৎস্না রাতে পথ চলা সবচেয়ে বেশি আনন্দের। অনেক দূরের পথ চলতে গিয়ে তাদের গীত গাওয়া শুনে অনেক বাড়ির মানুষ জেগে উঠত। তখনকার সময়ে এত পাকা সড়ক ও গাড়ি ছিল না। খেতের আইল, মানুষের বাড়ির উঠান এবং মেঠো পথ ছিল চলার পথ। এমন সংকীর্ণ পথের বাহন ছিল একমাত্র পালকি। চারজন বা কখনো ছয়জন তাগড়া জোয়ানের সমন্বয়ে গড়ে উঠত পালকির বেহারার দল। রাত যখন গভীর তখন জাগর দিতে দিতে বরপক্ষ হাজির হতো। তবে কখনো আবার যদি কাছাকাছি কারও বিয়ের আয়োজন হতো। তাতেও পালকি ছাড়া মেয়েকে তুলে দিত না মেয়ের বাবা। অনেক কাছের পথ ভেবে পালকি আনেনি বলে কত যে বিয়ে পিছিয়ে গেছে তার কোনো শেষ নেই। পালকি ছাড়া মেয়ের বাবা কিছুতেই তার মেয়েকে তুলে দেবেন না। এটা ছিল তখনকার সময়ের বায়না। তাই তো কাছের বিয়ের ঘটনায় বরপক্ষ পালকি নিয়ে অনেক দূর-দূরান্ত দিয়ে ঘুরে আসত। আবার কনেকে নিয়েও অনেক দূরের পথ ঘুরে তারপর বাড়িতে আসত।
আবার বউ নিয়ে যখন পালকি বেহারারা বরের বাড়িতে এসে হাজির হতো। তখনকার দৃশ্য হতো আবার ভিন্ন। বেহারা সহজে বর-বউকে পালকি থেকে নামাত না। তারা আগে বরের দাদা-দাদি, নানা-নানি, চাচা-চাচি সব মুরব্বিকে ধরে ধরে বকশিশ আদায় করত। বর-বউ নিয়ে তো এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা যায় না। তাই তো বেহারা বর-কনেকে নিয়ে একটু আগ-পিছ করতে থাকত ঘণ্টার পর ঘণ্টা। এভাবেই বকশিশ আদায় শেষে বর-কনেকে পালকি থেকে নামানো হতো।
তবে তখনকার সময়ে রাগ-গোসসা ছিল চোখে পড়ার মতো। ছেলের বোন জামাইকে ঠিকভাবে দাওয়াত দেওয়া হয়নি। এ ছুতায় তিনি হয়তো আসেননি। তার রাগ ভাঙানোর জন্য আবার ছেলের বাবাকে যেতো হতো মেয়ের জামাইয়ের বাড়ি। আবার কেউ বিয়েতে দাওয়াত করেছে কিন্তু বিয়ে উপলক্ষে জামাইকে নতুন নতুন কাপড় দেওয়া হয়নি। এ নিয়ে চলতো মান-অভিমান। এ তো গেল বরের বোন জামাইয়ের রাগ-গোসসা। বোন জামাইয়ের বোনকে আবার ভুলে বিয়ের দাওয়াত পৌঁছানো হয়নি। এমনই একটি বিয়ের আয়োজনে থাকত বর্ণিল হাসি- আনন্দ আর রাগ-গোসসায় ভরা।
তবে সব আয়োজন যখন শেষ পর্যায়ে তখন আবার চলত মেয়েকে আনার পালা। ধুমধাম করে মেয়েকে বাবার বাড়ির নাইওর আনা হতো। সেখানে থাকত বিশাল খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন।
তখনকার বিয়েতে উপহার হিসেবে কেউ দিত পিঠা, মোরগ, ছাগল এবং চাল। যার যার সাধ্যমতো জিনিসপত্র নিয়ে আসত।
মিরাপাড়া, রিকাবীবাজার, মুন্সীগঞ্জ
তারেক/
.jpg)
.jpg)