নেদারল্যান্ডসের সীমান্তে দাঁড়িয়ে থাকা ইটের তৈরি এ ভবনটি দূর থেকে দেখলে পরিত্যক্ত কোনো কারখানা বা পুরোনো গুদামঘরের মতো মনে হতে পারে প্রথমে। উঁচু লোহার গেট, তার ওপর জালের বেড়া, দেয়ালজুড়ে লতাগুল্মের দখল; সব মিলিয়ে নিস্তব্ধ পরিবেশ। গেটের গায়ে ঝোলানো কাঠের সাইনবোর্ডে বড় অক্ষরে লেখা, ‘Gesloten 2015’ অর্থাৎ ২০১৫ সালে বন্ধ। পাশে রাখা কয়েকটি মরিচা ধরা সাইকেল সময়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তবে এটি কোনো কারখানা নয়, এটি একটি কারাগার। জেলখানা আছে তবে কয়েদি নেই।
নেদারল্যান্ডসে অপরাধের হার এতটাই কমে গেছে যে সরকারের কাছে কারাগার চালু রাখাই হয়ে উঠছে অপ্রয়োজনীয় ও ব্যয়বহুল। ফলাফল হিসেবে একের পর এক জেলখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছে রাষ্ট্র। ছবিতে দেখা বন্ধ কারাগারটি তারই একটি উদাহরণ; যেটাতে ২০১৫ সাল থেকেই তালা ঝুলছে।
সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৩ সালে নেদারল্যান্ডসে বন্ধ হয়ে গেছে ১৯টি কারাগার। এর পর ২০১৪ সালের পর আরও ২৩টি কারাগার বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিতে হয়। ইউরোপের অনেক দেশের সঙ্গে তুলনা করলে এই তথ্য বিস্ময়কর মনে হলেও নেদারল্যান্ডসের সামাজিক কাঠামো ও রাষ্ট্রীয় নীতির দিকে তাকালে বিষয়টি ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এই দেশের বিচারব্যবস্থা মূলত শাস্তির চেয়ে পুনর্বাসনের ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়।
অপরাধীকে সমাজ থেকে চিরতরে বিচ্ছিন্ন না করে কীভাবে তাকে সমাজের উপযোগী নাগরিক হিসেবে ফিরিয়ে আনা যায়, সেটিই এখানে মূল দর্শন। ছোটখাটো অপরাধে কারাদণ্ডের বদলে দেওয়া হয় কমিউনিটি সার্ভিস, জরিমানা কিংবা কাউন্সেলিং। মাদকাসক্তদের ক্ষেত্রে শাস্তির বদলে চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এর ফলে অপরাধ পুনরাবৃত্তির হার কমে আসে উল্লেখযোগ্যভাবে। শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগও অপরাধ কমার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। নেদারল্যান্ডসে দারিদ্র্য ও সামাজিক বৈষম্য তুলনামূলকভাবে কম। রাষ্ট্র নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা পূরণে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে। কেউ বেকার হলে সামাজিক ভাতা আছে, মানসিক সমস্যায় ভুগলে আছে সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা। ফলে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও কমে যায়।
এই বাস্তবতার আরেকটি দিক হলো কারাগার ব্যবস্থাপনার খরচ। কয়েদি না থাকলেও কারাগার চালু রাখতে গেলে নিরাপত্তা, কর্মচারী, রক্ষণাবেক্ষণ- সব মিলিয়ে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। যখন কয়েদির সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে, তখন সরকার বাধ্য হয় অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও সিদ্ধান্ত নিতে। তাই একের পর এক কারাগার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
তবে এই বন্ধ হয়ে যাওয়া জেলখানাগুলো পুরোপুরি পরিত্যক্ত হয়ে থাকেনি সব ক্ষেত্রে। কিছু কারাগারকে রূপান্তর করা হয়েছে শরণার্থী আশ্রয়কেন্দ্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস কিংবা আবাসিক ভবনে। কোথাও কোথাও এগুলোকে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বা হোটেল হিসেবেও ব্যবহার করা হচ্ছে। পুরোনো কারাগারের দেয়ালের ভেতরে নতুন জীবনের গল্প লেখা হচ্ছে; যেখানে এক সময় বন্দিত্ব ছিল, সেখানে এখন কেবল স্বাধীনতার সুর।
তারেক/
.jpg)
.jpg)