হাটবারে গ্রামের কাঁচা সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতাম কখন এ সড়ক দিয়ে শিবু নাপিত যাবে। বাড়ির পাশেই সড়ক। হাটবার হলে এ সড়ক ছাড়া হাটে যাওয়া যায় না। শিবু নাপিত বয়সের ভারে একেবারে নুয়ে পড়েছেন। হাতে ছোট একটা পুঁটলি থাকত। তা আবার সাদা কাপড়ে পেঁচানো থাকত। সে সাদা পুঁটলির ভেতরেই চুল কাটার কাঁচি-ক্ষুর রাখতেন তিনি। শিবু নাপিত বাড়ির কাছে এলেই তাকে চুল কাটতে কাচারি ঘরের কাছে নিয়ে আসতাম। একটা কাঠের পিঁড়িতে বসে শিবু নাপিত চুল কাটতেন। শিবু নাপিতকে মজুরি দেওয়া হতো ধান। যে মৌসুমে তিনি আসতেন সে ফসলই তাকে দেওয়া হতো। এ তো গেল গ্রামের চুল কাটার ইতিবৃত্ত।
এর পর শহরে যখন চলে আসি তখন চুল একটু বড় হলেই দোকানে চলে যেতাম। চুল একটু বড় হলেই অজুহাত খুঁজতাম কখন কাটতে যাব। তবে চুল কাটার চেয়ে চুল কেটে বাড়ি ফেরার পথে মিষ্টি খেতে দিতেন বাবা। সে লোভই ছিল সবচেয়ে বড়।
তবে চুল কাটতে গেলে বাবা সুনীল নাপিতের কাছে পাঠিয়ে দিতেন। সুনীল নাপিতের দোকান ছিল কাঠপট্টি লঞ্চঘাট যেতে খালের ওপার ব্রিজের পাশে। ছোট একটা কাঠের দোকান ছিল তার আর বসার জন্য একটা কাঠের বেঞ্চ। চুল কাটতে সিরিয়াল পাওয়াটা ছিল বড় একটা কঠিন কাজ। তাই বসে থাকা ছাড়া অন্য কোনো উপায়ও ছিল না। তখন সুনীল নাপিতের দোকানে গেলে দেশের রাজনীতি কী জিনিস তা মুখস্থ বলে দিতেন সুনীল নাপিত। রেডিওর মতো সবই যেন তার নখদর্পণে। তা ছাড়া দেশের কোথায় কী ঘটছে তা একনাগাড়ে বলতেন সুনীল নাপিত। চালের দর বাড়ল কি না। ভূষা মাল এ বছর মজুত করলে তাতে কেমন লাভ পাবেন তা হর হর করে বলতে থাকতেন। যখন আমরা তার কাছে চুল কাটি তখনো তিনি বিয়ে করেননি। তবে তার কয়েক বছর পর তিনি অপরূপ সুন্দরী একজনকে বিয়ে করে আমাদের পাড়াতেই বাসা ভাড়া করে থাকা শুরু করলেন।
নাপিতের বউ বলে কথা। তার ওপরে লাস্যময়ী সুন্দরী। দেখতে দুধের আলতা গায়ের রং। নাকটা খাড়া, চোখ দুটি কাজল কালো, ভরাট বুক, ঠোঁটে মিষ্টি একটা তিলক রয়েছে। হাসলে দাঁত থেকে মুক্তা ঝড়ে। সুনীল নাপিত তার বউকে সাজাতে কখনো কার্পণ্যে করেননি। সে হাঁটলে তার পা যেন আর মাটিতে পড়ে না। তিনি নিত্যনতুন শাড়ি পরতেন। হাফ হাতা লাল ব্লাউজের সঙ্গে বাহারি ডিজাইনের ভারতীয় শাড়ি পরতেন। পিঠ থাকত খোলা। রূপের মাধুরী মিশিয়ে নাপিতের বউয়ের আমাদের এ বাড়ি ও বাড়ি প্রতিদিন বিকালে একটা চক্কর খাওয়া রোজকারের ডিউটি ছিল। শাড়ি পরে পাড়ায় পাড়ায় তার না ঘুরলে আবার পেটের ভাত হজম হতো না। ইতোমধ্যে নাপিতের ঘরে একটা ছেলে জন্ম নেয়। নাপিত রাজ্যের খবরাখবর রাখেন। আয়রোজগার ভালো। তিনি ইতোম্যেধই অনেক টাকা জমা করলেন। সে টাকা আবার ঘরে রাখতেন না। তা তিনি মৌসুমের মুগ ডাল, মসুর ডালসহ অন্যান্য ভূষা মাল আড়তে মজুত করতেন। নাপিতের ষোলো চুঙ্গা বৃদ্ধি থাকায় তার সঞ্চয়ের কথা তিনি নিজের পরিবারকেও জানাতেন না। নাপিতের বুদ্ধি মতে নিজের জমানো অর্থের বিষয়ে নিজের বউকে জানাতে নেই। এটা গোপন রাখতে হয়। সারা জীবনে অর্থ সঞ্চয় করে এভাবেই কমলাঘাট বন্দরের আড়তে আড়তে তিনি ভূষা মাল কিনে কিনে খামার দিয়ে রাখতেন। দাম বাড়লে তা বিক্রি করে দিতেন। এভাবে সুনীল নাপিত অনেক টাকা সঞ্চয় করলেন। কিন্তু নাপিত ভাবতে পারলেন না অসময়েই তাকে চলে যেতে হবে। তার লিভার ক্যানসার হওয়ায় তিনি অকালপ্রয়াত হলেন। তাতে তার যত সম্পদ সঞ্চয় ছিল তার কথা পরিবার বা অন্য কাউকে বলে যেতে পারেননি।
আরো পড়ুন: যেখানে দাদি ভাড়া পাওয়া যায়
এতে তার সুন্দরী অপ্সরা স্ত্রী একটা ছেলেকে নিয়ে অকূল দরিয়ায় পড়ে গেলেন। কীভাবে এখন তার সংসার চলবে? ছেলেকে কীভাবে মানুষ করবেন? সে চিন্তায়ই তিনি অস্থির হয়ে পড়লেন। কয়েক দিন পাড়ার বিভিন্ন ঘর থেকে মানুষ খাবার দিলেন। সে খাবারেই তাদের মা-ছেলের চলে যেত। ধীরে ধীরে পাড়া-প্রতিবেশীদের খাবার আসা কমতে থাকে। দিশেহারা হয়ে পড়েন নাপিতের স্ত্রী সর্মিলী। তাই কোনো উপায় না দেখে তিনি ছোট ছেলে উজ্জ্বলকে নিয়ে একজন হিন্দু ডাক্তারের বাড়িতে কাজ শুরু করলেন। তার সব অহংকার আর আতিশয্যে সবই যেন আগুনের লেলিহান শিখায় দাউ দাউ করে পুড়ে ছাই হয়ে গেল। নাপিতের স্ত্রী সর্মিলী স্বামীর সঞ্চয়ের কোনো খোঁজ আর পেলেন না। কোন আড়তে তার মজুত করা মাল রয়েছে তার সন্ধানও কেউ কোনো দিন দেয়নি।
ছেলেটা ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। মানুষের সহযোগিতায় তার ছেলে ক্লাস সেভেন পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিল। তারপর আর পারেনি। তার বাবার পথেরই দিশারি হলো ছেলেটি। একদিন সেও সেলুনে কাজ শুরু করল। লাস্যময়ী সুন্দরী সর্মিলী মানুষের বাড়িতে কাজ করতে গিয়ে তার সেই রূপের জৌলুস আর রইল না। এক সময় তার চেহারা কালো হতে হতে বিবর্ণ রূপ ধারণ করল। একটা ছন্দময় জীবন যেন হঠাৎ করেই দপ করে নিভে গেল। ছেলেটি ধীরে ধীরে কর্মে ফেরায় পাড়ায় তাদের আর কোনো অভাব অনটন রইল না। অনেক বছর ধরে তাদের দেখি না। তারা যেন এখন আমাদের এলাকা ছেড়ে অনেক দূরে কোথাও চলে গেছেন। আমিও গ্রামের বাড়ি থেকে ঢাকা শহরে এসে বসবাস শুরু করছি কয়েক যুগ হলো।
সর্মিলী আর তার ছেলে উজ্জ্বলকে এখনো খুঁজে বেড়াই। উজ্জ্বল কি তার মায়ের জীবন আবার উজ্জ্বলতায় ভরিয়ে দিতে পেরেছে? নাকি ক্ষয়িষ্ণু হয়ে গেছে তার মুখের আদল আর সাদা চুল। সেটা দেখতে এখন ভারি ইচ্ছা জাগে।
মিরাপাড়া, রিকাবীবাজার, মুন্সীগঞ্জ।
তারেক/
.jpg)
.jpg)