‘একটা সময় ছিল, পাঠ্যবইয়ের ভেতরে লুকিয়ে ম্যাগাজিন-গল্পের বই পড়তাম। এখনকার ছেলেমেয়েদের বই পড়ার প্রতি আগ্রহ নেই, তারা তো পড়েই না লিখবেই কী করে! আর আমরাই লেখা পাব কীভাবে? তাই তো লিটল-ম্যাগ নিয়ে কারও আগ্রহ নেই। বাংলা একাডেমিও মেলাতে লিটল ম্যাগ চত্বরকে অনেকটা একঘরে করে রেখেছে।’ এভাবে বইমেলার ১৯তম দিনে পাঠক ও দর্শনার্থী-খরায় ভোগা মেলার লিটলম্যাগ চত্বর নিয়ে খবরের কাগজকে নিজের আক্ষেপের কথা বলছিলেন ম্যাপ লেখনীর সম্পাদক ও প্রকাশক প্রসপারিনা সরকার।
প্রসপারিনার কথায় ফুঠে ওঠে গতকাল বুধবার মেলার লিটলম্যাগ চত্বরের খণ্ডচিত্র। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, লিটলম্যাগ চত্বর একেবারেই পাঠক-দর্শনার্থীশূন্য। কেউ একটু জিরিয়ে নেওয়ার জন্য এখানে এসেছেন, কেউবা বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে খোশগল্প করতে এসেছেন। তবে কারোরই চোখেমুখে লিটল ম্যাগ নিয়ে তেমন আগ্রহের ছাপ নেই। যেই লিটল ম্যাগাজিনে ভর করে অনেক বোদ্ধা লেখক, কবি ও প্রকাশক উঠে আসতেন, সেই লিটল ম্যাগাজিন নিয়ে এখন আর কারোরই আগ্রহ নেই। তরুণদের ইন্টারনেটমুখী লেখালেখির কারণে আগ্রহ নেই ম্যাগাজিনের লেখায়।
গত তিন বছরের বইমেলায় লিটল ম্যাগ চত্বরে কাজ করেছেন রনি মল্লিক। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া রনি এবারের মেলায় কাজ করছেন শীতপাটির বিক্রয়কর্মী হিসেবে। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘বরাবরই মেলাতে পাঠক-দর্শনার্থীশূন্যতায় ভোগে লিটল ম্যাগ চত্বর, কিন্তু এবার অনেক কম। বিগত বছরগুলোর মেলার তুলনায় বিক্রিও খারাপ। এখন পর্যন্ত মাত্র একটি বই বিক্রি করেছি।’
গারো সাহিত্যপত্র থকবিরিম, ২০০৮ সালে যাত্রা শুরু হলেও এ বছর বের হয়নি তাদের কোনো সংখ্যা। থকবিরিমের বিক্রয়কর্মী বন্দনা মৃ খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাদের বিক্রি নেই বললেই চলে, তবে তারপরেও মেলায় এসেছি পুরোনো সংখ্যাগুলো নিয়ে। এবার আশা ছিল ভালো বিক্রি হবে, কিন্তু এবার তেমন বিক্রিও নাই লোকও নাই!’
মেলায় মোটামুটি সাড়া পাচ্ছেন উল্লেখ করে গ্রাম থিয়েটারের বিক্রয়কর্মী চায়না আক্তার বলেন, ‘আমাদের এ পর্যন্ত ১ হাজার ৪৩০ সংখ্যাটি সংখ্যা বের হয়েছে। দুই মাস অন্তর বের হয়, সবশেষটি ২০২৩ সালের আগস্টে বের হয়েছিল। এ বছর নতুন সংখ্যা নেই। তবে আশা করা যায়, ২০২৪ ও ২০২৫-এর সংখ্যা মেলার শেষ সপ্তাহ আসতে পারে।’
বেশ দীর্ঘ সময় ধরে লিটল ম্যাগাজিনের সঙ্গে যুক্ত খননের সহযোগী সম্পাদক জিয়াবুল ইবন। লিটল ম্যাগাজিন টিকিয়ে রাখতে উদ্যোগ গ্রহণ না করা হলে কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়ার সংশয় প্রকাশ করে খবরের কাগজকে বলেন, ‘লিটল ম্যাগাজিনের যে বিপ্লব, সেটি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি; কালের বিবর্তনে সেটি হারাতে বসেছে। অনেক লিটল ম্যাগ বন্ধও হয়েছে। তা ছাড়া একটি লিটল ম্যাগাজিনের যখন যাত্রা শুরু হয়, ম্যাগাজিন বন্ধের একধরনের শঙ্কা নিয়েই যাত্রা শুরু করেন। নানা সীমাবদ্ধতা কেটে ওঠারও পরিকল্পনা নেন, কিন্তু শেষমেশ লেখা আর ফান্ডিংয়ের অভাবে হারিয়ে যায় পত্রিকাটি। এমন এক অনিশ্চয়তার মাঝে থেকে অনেকে স্বল্প পরিসরে টিকিয়ে রেখেছেন। তবে এটিকে আগের মতো বৃহৎ পরিসরে টিকিয়ে রাখতে বাংলা একাডেমিসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকেই নজর দিতে হবে এবং একই সঙ্গে তরুণ প্রজন্মকে লেখার বিষয়ে আগ্রহী করে গড়ে তুলতে হবে ও উৎসাহ দিতে হবে। নয়তো দেখা যাবে কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে।’
গতকাল বিকেলে বইমেলার মূল মঞ্চে সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় ‘শিশুসাহিত্যের মহীরুহ রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জুলফিকার শাহাদাৎ এবং আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন শাহাবুদ্দীন নাগরী। এদিকে মেলার ‘লেখক বলছি’ অনুষ্ঠানে নিজেদের নতুন বই নিয়ে আলোচনা করেন মাহমুদউল্লাহ, কাজল রশীদ শাহীন এবং তুহিন খান। এ ছাড়া সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি করেন কবি মজিদ মাহমুদ, কবি কামরুজ্জামান এবং কবি শফিকুল ইসলাম। সেই সঙ্গে ছিল সৈয়দা শামছি আরা সায়েকার পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘নবরস’ এবং জহির আলীমের পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘আবদুল আলীম ফাউন্ডেশন’-এর পরিবেশনা।
এখন পর্যন্ত মেলায় নতুন বই ১৭৯৩টি
গতকাল বইমেলার ১৯তম দিনে নতুন বই এসেছে ৭০টি। গত মঙ্গলবার এ সংখ্যা ছিল ৭৯টি। এ নিয়ে এবারের বইমেলায় প্রকাশ হওয়া নতুন বইয়ের সংখ্যা দাঁড়াল ১ হাজার ৭৯৩টিতে। গতকাল বুধবার গল্প ৭টি, উপন্যাস ৬টি, প্রবন্ধ ৪টি, কবিতা ২৭টি, গবেষণা ১টি, ছড়া ৩টি, শিশুসাহিত্য ৬টি, জীবনী ৩টি, রচনাবলি ২টি, মুক্তিযুদ্ধ ১টি, ভ্রমণ ১টি, ইতিহাস ১টি, গণ-অভ্যুত্থান ২টি, অনুবাদ ১টি, অভিধান ১টি, সায়েন্স ফিকশন ১টি এবং অন্যান্য ২টি বই নতুন এসেছে।