মহাকাশ থেকে পৃথিবীর অনন্য দৃশ্য দেখা অনেকের স্বপ্ন। পৃথিবীর বাইরে মহাকাশে দীর্ঘ সময় কাটানো এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। তবে মানুষের শরীর পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণে অভ্যস্ত, তাই শূন্য মাধ্যাকর্ষণের পরিবেশে দীর্ঘ সময় কাটানোর প্রভাব কাটিয়ে উঠতে অনেক বছর লেগে যেতে পারে।
সম্প্রতি নাসার দুই নভোচারী সুনীতা উইলিয়ামস ও বুচ উইলমোর আট দিনের জন্য আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (আইএসএস) গেলেও, অপ্রত্যাশিতভাবে তাদের সেখানে ৯ মাস থাকতে হয়। অবশেষে তারা পৃথিবীতে ফিরে এসেছেন। এখন তাদের সুস্থ হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
মহাকাশে শরীরের পরিবর্তন
ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ওয়েলসের মানব শরীরতত্ত্বের অধ্যাপক ড্যামিয়ান বেইলি বলেন, ‘মহাকাশ মানুষের জন্য সবচেয়ে চরম পরিবেশগুলোর একটি, যেখানে টিকে থাকার জন্য মানব শরীর বিবর্তিত হয়নি।’
মহাকাশে প্রবেশ করার পর মানব শরীরে কিছু পরিবর্তন আসে, যা প্রাথমিকভাবে আনন্দদায়ক মনে হতে পারে। নভোচারী টিম পিক ২০১৫ সালে আইএসএস সফরের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, ‘মহাকাশে থাকাটা প্রথমে যেন ছুটির মতো মনে হয়। পেশি ও হাড়ের ওপর তেমন চাপ পড়ে না। মহাকাশ স্টেশনে ভারহীন পরিবেশে ভেসে বেড়ানো এক চমৎকার অনুভূতি।’
কল্পনা করুন কয়েক সপ্তাহ ধরে বিছানায় শুয়ে আছেন এবং ওঠার প্রয়োজন হচ্ছে না। বিজ্ঞানীরা ঠিক এভাবে ভারহীনতার প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেন।
তবে পেশির ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। দীর্ঘদিন মাধ্যাকর্ষণের প্রভাব ছাড়া থাকলে পেশি দুর্বল হয়ে যায়। শূন্য মাধ্যাকর্ষণে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য কোনো পেশি ব্যবহার করতে হয় না, ফলে তা ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে শুরু করে।
দ্রুত বার্ধক্য
হৃৎপিণ্ড ও রক্তনালিগুলোরও একই অবস্থা হয়। মাধ্যাকর্ষণের বিরুদ্ধে রক্ত পাম্প করার প্রয়োজন না হওয়ায় সেগুলো দুর্বল হতে শুরু করে। হাড়ও দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে যায়। পুরোনো হাড় ভেঙে নতুন হাড় তৈরির মধ্যে একটি ভারসাম্য থাকা জরুরি। তবে মাধ্যাকর্ষণের অভাবে সেই ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। অধ্যাপক বেইলি বলেন, ‘প্রতি মাসে নভোচারীদের প্রায় ১ শতাংশ হাড় ও পেশি ক্ষয় হতে থাকে। এটি এক ধরনের দ্রুত বার্ধক্য প্রক্রিয়া।’
পৃথিবীতে ফেরার পর বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভিডিওতে দেখা যায়, নভোচারীদের ক্যাপসুল থেকে বের করে স্ট্রেচারে শুইয়ে দেওয়ার জন্য সাহায্যের প্রয়োজন হচ্ছে।
মহাকাশে থাকার সময় নভোচারীদের প্রতিদিন দুই ঘণ্টা করে শরীরচর্চা করতে হয়। তারা দৌড়ানোর জন্য ট্রেডমিল, সাইক্লিং ও ওয়েট লিফটিংয়ের মাধ্যমে যতটা সম্ভব পেশি ও হাড়ের স্বাস্থ্য ধরে রাখার চেষ্টা করেন।
দীর্ঘ সময় পর পৃথিবীতে ফেরার পর স্বাভাবিক জীবনে ফেরা সহজ নয়। সুনীতা ও বুচ তাদের হারানো শারীরিক সক্ষমতা ফিরে পেতে নিয়মিত ব্যায়াম করবেন। প্রথম ব্রিটিশ নভোচারী ড. হেলেন শারমান বলেন, ‘পেশির স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা ফিরে পেতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। আর হাড়ের ঘনত্ব পুনরুদ্ধার হতে কয়েক বছর সময় লাগে। পৃথিবীতে ফিরে আসার পর হাড়ে কিছু সূক্ষ্ম পরিবর্তন দেখা যায়, যা কখনো সম্পূর্ণরূপে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে না।’
শুধু হাড় ও পেশি নয়, মহাকাশে থাকলে পুরো শরীরের গঠন পরিবর্তিত হয়। এমনকি শরীরে বসবাসকারী উপকারী ব্যাকটেরিয়াও পরিবর্তিত হয়ে যায়। মাইক্রোগ্র্যাভিটিতে শরীরের তরল পদার্থও স্থানান্তরিত হয়। শরীরের তরলগুলো স্বাভাবিকভাবে নিচের দিকে নেমে যায় না, বরং উপরের দিকে উঠে যায়, ফলে মুখ ফুলে যায়।
মস্তিষ্কে তরল জমে যাওয়ায় মাথাব্যথা ও দৃষ্টিশক্তির পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। এমনকি চোখের আকৃতিও পরিবর্তিত হতে পারে। এই ‘স্পেসফ্লাইট-অ্যাসোসিয়েটেড নিউরো-অকুলার সিন্ড্রোম’-এর কারণে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যাওয়া ও স্থায়ী ক্ষতিও হতে পারে।
ভারসাম্য হারানোর সমস্যা
মহাকাশে থাকাকালীন ভারসাম্য রক্ষার সিস্টেম পরিবর্তিত হয়। মাইক্রোগ্র্যাভিটি ভেস্টিবুলার সিস্টেমকেও বিকৃত করে দেয়, যা ভারসাম্য রক্ষা করে এবং উপর ও নিচের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে সাহায্য করে। মহাকাশে কোনো উপর-নিচ বা পাশ নেই। উপরে গেলে যেমন দিক হারানোর অনুভূতি হয়, তেমনি পৃথিবীতে ফিরে আসার পরও একই রকম অনুভব হতে পারে।
নভোচারীরা পৃথিবীতে ফেরার পর প্রথম কয়েক দিন মাথা ঘোরা ও ভারসাম্য হারানোর সমস্যায় ভোগেন। টিম পিক বলেন, ‘মাথা ঘোরা বন্ধ হওয়া, ভারসাম্য ফিরে পাওয়া এবং স্বাভাবিকভাবে হাঁটার শক্তি ফিরে পাওয়ার প্রাথমিক পর্যায়টি মাত্র দুই-তিন দিনের ব্যাপার। পৃথিবীতে ফিরে আসার প্রথম দুই-তিন দিন সত্যিই কঠিন হতে পারে।’
সুনীতা ও বুচের মতো নভোচারীরা পৃথিবীতে ফেরার পর অনেক বেশি শরীরচর্চার মাধ্যমে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার চেষ্টা করবেন। তাদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ ও চিকিৎসা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যা কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত চলতে পারে।
মহাকাশ গবেষণার অগ্রগতির ফলে ভবিষ্যতে দীর্ঘ সময় মহাকাশে থাকার প্রভাব কমানোর উপায় বের করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে এখনো, মহাকাশ ভ্রমণের পর পৃথিবীতে ফেরার চ্যালেঞ্জ বড় এক বাস্তবতা।


