সাইবেরিয়ায় আবিষ্কৃত ৫০ হাজার বছর আগের এক ম্যামথ শাবকের ময়নাতদন্ত করেছেন বিজ্ঞানীরা। ‘ইয়ানা’ নামের ম্যামথটিকে এ পর্যন্ত পাওয়া সবচেয়ে ভালোভাবে সংরক্ষিত ম্যামথ বলে মনে করা হচ্ছে। এটি এ পর্যন্ত পাওয়া মাত্র সাতটি পূর্ণাঙ্গ ম্যামথ দেহাবশেষের একটি।
ইয়ানা রাশিয়ার সাইবেরিয়া অঞ্চলে গলিত পারমাফ্রস্ট থেকে আবিষ্কৃত হয়েছে, যা প্রচণ্ড ঠাণ্ডার কারণে প্রায় অক্ষত ছিল। নর্থ-ইস্টার্ন ফেডারেল ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীরা প্রাচীন এই ম্যামথ সম্পর্কে আরও জানতে এর ব্যবচ্ছেদ করেছেন, যা ম্যামথের জীবনধারা ও মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নতুন তথ্য দেবে। বিজ্ঞানীরা এখনো গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করেননি। তবে অতীতের বরফ যুগের স্তন্যপায়ী প্রাণীদের গবেষণা থেকে জানা গেছে, এ ধরনের পরীক্ষা প্রাণীর খাদ্যাভ্যাস ও আধুনিক প্রজাতির সঙ্গে সম্পর্ক বোঝাতে সহায়ক। ২০২৪ সালে ইয়ানার আবিষ্কারের সময় গবেষকরা জানিয়েছিলেন, ম্যামথটির মৃত্যুর সঠিক বয়স নির্ধারণের জন্য তারা আরও গবেষণা করার পরিকল্পনা করেছেন।
প্রাথমিকভাবে ইয়ানার মৃত্যুর সময় বয়স এ কবছর বা তার কিছু বেশি বলে ধারণা করা হয়েছিল। তবে এই ময়নাতদন্তের মাধ্যমে আরও নির্ভুল তথ্য পাওয়ার আশা করা যাচ্ছে। ইয়ানার ওজন ১৮০ কেজি, উচ্চতা ১২০ সেন্টিমিটার (চার ফুট) ও দৈর্ঘ্য দুই মিটার।
ইয়ানা ছাড়া বিশ্বের মাত্র ছয়টি ম্যামথের মৃতদেহ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে পাঁচটি রাশিয়ায় এবং একটি কানাডায়। ইয়ানার ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য হলো এর অবিশ্বাস্য স্তরের সংরক্ষণ। সাধারণত যখন কোনো প্রাণী হিমায়িত মাটি থেকে বেরিয়ে আসে এবং গলতে শুরু করে, তখন কিছু শিকারি প্রাণী উন্মুক্ত নরম টিস্যু খাওয়া শুরু করে।
কিন্তু ইয়ানার পেছনের পায়ে শিকারের কিছু চিহ্ন দেখা গেলেও, এর বাকি শরীর তুলনামূলকভাবে অক্ষত ছিল। ম্যামথটি আবিষ্কারের পর নর্থ-ইস্টার্ন ফেডারেল ইউনিভার্সিটির ম্যামথ মিউজিয়াম ল্যাবরেটরির প্রধান ম্যাক্সিম চেপ্রাসভ বলেন, ‘পরীক্ষায় দেখা গেছে, মাথা ও অভ্যন্তরীণ অঙ্গ প্রায় অক্ষত রয়েছে, যা অত্যন্ত বিরল ঘটনা। আমরা লক্ষ করেছি, সম্ভবত চড়ুই বা ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী এর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ খেয়েছে।’
এর আগের এক গবেষণায় নর্থ-ইস্টার্ন ফেডারেল ইউনিভার্সিটির গবেষকরা ৪৪ হাজার বছর আগে পারমাফ্রস্টে হিমায়িত এক নেকড়ের খাদ্য আবিষ্কার করেছিলেন। যার সঙ্গে আধুনিক নেকড়ে প্রজাতির সম্পর্ক নির্ধারণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ম্যামথের পাকস্থলীর উপাদান অক্ষত থাকলে, গবেষকরা এর খাদ্য নির্ধারণ করতে এবং সম্ভবত এর খাওয়া গাছগুলোর জিনগত ক্রম নির্ধারণ করতে সক্ষম হবেন। আবিষ্কারের সময় গবেষকরা বলেছিলেন, তারা এই বছর ম্যামথটির জন্য বড় ধরনের পরীক্ষার পরিকল্পনা করেছেন।
ইয়ানার দেহাবশেষ রাশিয়ার ইয়াকুতিয়া অঞ্চলে অবস্থিত ব্যাটগাইকা গর্তের গলিত পারমাফ্রস্টের মধ্যে পাওয়া গেছে। ১ কিলোমিটার গভীর এই গর্ত ‘গেটওয়ে টু দ্য আন্ডারওয়ার্ল্ড’ বা ‘পাতালের প্রবেশদ্বার’ নামে পরিচিত। এর আগে এখান থেকে প্রাচীন বাইসন, ঘোড়া ও কুকুরসহ অন্যান্য প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীর দেহাবশেষ পাওয়া গেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পারমাফ্রস্ট গলে যাওয়ায় এ ধরনের প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীর দেহাবশেষ আরও বেশি উন্মোচিত হচ্ছে।
স্থানীয় কিছু মানুষ ক্রেটারটি ঘুরতে গিয়ে ইয়ানাকে আবিষ্কার করেন। তারা দ্রুতই এটিকে মাটির ওপরে তোলার ব্যবস্থা করেন, যা ইয়ানাকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া বা শিকারি প্রাণীদের হাতে পড়ার হাত থেকে রক্ষা করেছে। চেপ্রাসভ বলেন, ‘বাসিন্দারা সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় ছিলেন।’
নর্থ-ইস্টার্ন ফেডারেল ইউনিভার্সিটির পরিচালক আনাতোলি নিকোলায়েভ বলেন, ‘ম্যামথের ব্যতিক্রমী সংরক্ষণ দেখে আমরা সবাই অবাক হয়েছিলাম।’


