প্রথমবারের মতো একটি স্তন্যপায়ী প্রাণীর মস্তিষ্কের সবচেয়ে বড় ও বিশদ ‘ওয়্যারিং ডায়াগ্রাম বা সংযোগ নকশা’ তৈরি করেছেন একদল স্নায়ুবিজ্ঞানী। ইঁদুরের সেরিব্রাল কর্টেক্সের টিস্যু ব্যবহার করে এই যুগান্তকারী কাজটি সম্পন্ন হয়েছে। মস্তিষ্কের ছোট একটি টিস্যু বিশ্লেষণ করে তারা একসঙ্গে কাঠামো ও কার্যকারিতা মানচিত্র তৈরি করেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, এই গবেষণা মানব মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে, তা বুঝতে সহায়তা করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘মাইক্রনস’ (মেশিন ইন্টেলিজেন্স ফ্রম কর্টিক্যাল নেটওয়ার্কস) নামে একটি বৈজ্ঞানিক কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১৫০ জন বিজ্ঞানী এই গবেষণায় অংশ নেন। এতে ব্যবহার করা হয় ইঁদুরের প্রাথমিক ভিজ্যুয়াল কর্টেক্সের একটি বালু কণার আকারের টিস্যু, যা দৃষ্টিসংক্রান্ত তথ্য প্রক্রিয়াজাত করে।
গবেষকরা জানান, এই নমুনাতে ২ লাখের বেশি কোষ ছিল, যার মধ্যে প্রায় ৮৪ হাজার স্নায়ুকোষ বা নিউরন। এই নিউরনগুলোর মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী প্রায় ৫২ কোটি ২৪ লাখ সংযোগস্থল বা সিন্যাপ্স রয়েছে। সব মিলিয়ে তারা মস্তিষ্কের যে অংশ চোখের দেখা তথ্য প্রক্রিয়াজাত করে, সেখানকার প্রায় ৫ দশমিক ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ স্নায়বিক সংযোগ পথের তথ্য সংগ্রহ করেছেন। সম্প্রতি বিজ্ঞানবিষয়ক ‘নেচার’ জার্নালে গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে।
অ্যালেন ইনস্টিটিউট ফর ব্রেন সায়েন্সের স্নায়ুবিজ্ঞানী ফরেস্ট কোলম্যান বলেন, ‘লাখ লাখ সিন্যাপ্স এবং লাখ লাখ কোষের বিভিন্ন আকার ও আকৃতির জটিলতা দেখে আমাদের নিজেদের মস্তিষ্কের রহস্যময়তা উপলব্ধি করা যায়।’ ফরেস্ট কোলম্যান এই গবেষণার অন্যতম প্রধান বিজ্ঞানী।
সেরিব্রাল কর্টেক্স হলো মস্তিষ্কের বাইরের স্তর, যা মূলত সচেতন উপলব্ধি, বিচারক্ষমতা, পরিকল্পনা ও কাজ সম্পাদনের প্রধান স্থান। এই গবেষণায় বিজ্ঞানীরা এর একটি অংশ প্রাথমিক ভিজ্যুয়াল কর্টেক্সের ওপর মনোযোগ দেন।
বেলর কলেজ অব মেডিসিনের গবেষকরা প্রথমে একটি জীবন্ত ইঁদুরকে বিভিন্ন ভিডিও দেখানোর সময় তার মস্তিষ্কের কোষগুলোর প্রতিক্রিয়া রেকর্ড করে স্নায়বিক কার্যকলাপের মানচিত্র তৈরি করেন। এই ইঁদুরকে জেনেটিকভাবে পরিবর্তন করা হয়েছিল, যাতে নিউরন সক্রিয় হলে ফ্লুরোসেন্ট আলো ছড়ায়। এরপর অ্যালেন ইনস্টিটিউটে সেই কোষগুলোর উচ্চ রেজল্যুশনের থ্রিডি ছবি তোলা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির গবেষকরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে সেই ছবিগুলো থেকে নিউরন এবং তাদের সংযোগের বিন্যাস ত্রিমাত্রিকভাবে পুনর্গঠন করেন।
বেলর কলেজ অব মেডিসিনের আরেক স্নায়ুবিজ্ঞানী আন্দ্রেয়াস টোলিয়াস বলেন, ‘এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বিজ্ঞানীরা মস্তিষ্কের গঠন নিয়ে গবেষণা করছেন। কিন্তু সার্কিট স্তরে নিউরনের কার্যকলাপ কীভাবে উদ্ভূত হয়, তা বোঝা বেশ কঠিন ছিল। আমাদের গবেষণা একই ইঁদুরের মধ্যে মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যকারিতা পদ্ধতিগতভাবে একত্রিত করার সবচেয়ে বড় প্রচেষ্টা এটি।’ যদিও ইঁদুর ও মানুষের মস্তিষ্কের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে, অনেক সাংগঠনিক নীতি প্রজাতি নির্বিশেষে একই রকম থাকে।
তিনি আরও বলেন, ‘এটি ভবিষ্যতে অটিজম ও সিজোফ্রেনিয়ার মতো স্নায়ুবিক জটিলতা বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।’
গবেষণায় ‘ইনহিবিটরি বা নিবৃত্তিমূলক কোষ’ নামে পরিচিত মস্তিষ্কের এক ধরনের নিউরনের সংযোগ বিন্যাস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। এই কোষগুলো সক্রিয় হলে তাদের সঙ্গে সংযুক্ত অন্যান্য কোষের কার্যকলাপ কমিয়ে দেয়, যা মস্তিষ্কের সুষম কার্যকারিতার জন্য জরুরি। এর বিপরীতে রয়েছে ‘এক্সাইটেটরি বা উদ্দীপক কোষ’, যা সংযুক্ত কোষের কার্যকলাপ বাড়িয়ে তোলে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, এই ইনহিবিটরি কোষগুলো এলোমেলোভাবে নয়, বরং অত্যন্ত নির্দিষ্ট ধরনের নিউরনের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে। এটি আগের ধারণার চেয়েও বেশি জটিল বিন্যাস নির্দেশ করে। ইনহিবিটরি কোষগুলো কর্টেক্সের মোট নিউরনের প্রায় ১৫ শতাংশ।
গবেষকরা মনে করছেন, এই গবেষণা ভবিষ্যতে অটিজম ও সিজোফ্রেনিয়া মতো বিভিন্ন স্নায়বিক ও মানসিক রোগ সম্পর্কে বুঝতে সাহায্য করবে। কারণ, এগুলোর সঙ্গে মস্তিষ্কের সংযোগের সূক্ষ্ম ত্রুটির সম্পর্ক থাকতে পারে। টোলিয়াস বলেন, ‘মস্তিষ্কের ওয়্যারিং কীভাবে এর কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করে, তা সঠিকভাবে জানতে পারলে আমরা উপলব্ধির মৌলিক প্রক্রিয়াগুলো উন্মোচন করতে পারব।’
এই বিস্তারিত মানচিত্র বিজ্ঞানীদের মস্তিষ্কের গঠন ও কাজের মধ্যে সম্পর্ক বুঝতে এবং মানব মস্তিষ্কের জটিল রহস্য সমাধানে ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।


