কোয়ান্টাম কম্পিউটার প্রযুক্তিকে আরেক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেলেন বিজ্ঞানীরা। এ প্রযুক্তির অগ্রগতিতে একটি মৌলিক চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করেছেন তারা। কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের ইতিহাসে এযাবৎকালের সর্বনিম্ন ত্রুটির হার অর্জন করে বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন তারা। এটি আরও ছোট, দ্রুত ও শক্তিশালী কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরির সম্ভাবনাকে বহু গুণে বাড়িয়ে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘এপিএস ফিজিক্যাল রিভিউ লেটারস’ জার্নালে গত ১২ জুন প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বিজ্ঞানীরা জানান, তারা কোয়ান্টাম কম্পিউটারের ত্রুটির হার মাত্র ০.০০০১৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছেন। এর অর্থ হলো, ৬৭ লাখ কোয়ান্টাম অপারেশনে মাত্র একটি ত্রুটি হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। এটি এখন পর্যন্ত রেকর্ড করা সবচেয়ে কম ত্রুটির হার।
২০১৪ সালে একই গবেষকদল প্রতি ১০ লাখ অপারেশনে একবার ত্রুটির রেকর্ড গড়েছিল। এবার প্রায় এক দশকের ব্যবধানে তারা নির্ভুলতার মান ১০ গুণ বাড়াতে সক্ষম হয়েছেন।
এই ত্রুটিগুলো মূলত কম্পিউটারের আর্কিটেকচার, অ্যালগরিদম এবং পদার্থবিজ্ঞানের কিছু মৌলিক সীমাবদ্ধতা থেকে আসে। কোয়ান্টাম ত্রুটি সংশোধন (এরর কারেকশন) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই সমস্যাগুলো দূর করার চেষ্টা করা হয়। তবে এবার বিজ্ঞানীরা কম্পিউটারের নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি এবং স্থাপত্য থেকে সৃষ্ট ত্রুটি প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে পেরেছেন।
কোয়ান্টাম কম্পিউটারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এর কার্যক্রম স্থিতিশীল রাখা। কোয়ান্টাম কণা বা কিউবিট অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় পারিপার্শ্বিক সামান্য গোলযোগ বা ‘নয়েজ’-এর কারণে এর গণনায় ত্রুটি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এই ত্রুটি সংশোধনের জন্য বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত কিউবিট ও অবকাঠামো প্রয়োজন হয়। এটি কোয়ান্টাম কম্পিউটারকে অত্যন্ত বড় ও ব্যয়বহুল করে তোলে।
প্রচলিত কোয়ান্টাম কম্পিউটারের তুলনায় এবার গবেষকরা একটি ভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। এই গবেষণায় তারা ফোটনের বদলে ক্যালসিয়াম-৪৩ আইনের ‘ট্র্যাপড আয়ন’ ব্যবহার করেছেন কিউবিট হিসেবে। আর এই প্রক্রিয়া হয়েছে কক্ষতাপমাত্রায়, যা ভবিষ্যতের কম্পিউটার স্থাপন ও পরিচালনায় সুবিধা এনে দেবে। কারণ বেশির ভাগ কোয়ান্টাম সিস্টেমকে কাজ করার জন্য অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়।
এতে ব্যবহৃত হয়েছে মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে আয়নগুলোকে একটি হাইপারফাইন ‘অ্যাটমিক ক্লক স্টেট’-এ স্থাপন করা হয়। এরপর স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে মাইক্রোওয়েভের দ্বারা সৃষ্ট শব্দ বা গোলযোগ নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তারা এমন একটি স্বয়ংক্রিয় অ্যালগরিদম তৈরি করেছেন, যা মাইক্রোওয়েভ নিয়ন্ত্রণের কারণে তৈরি হওয়া ত্রুটিগুলো সঙ্গে সঙ্গে শনাক্ত ও সংশোধন করে ফেলে। এর ফলে কম্পিউটারের নিজস্ব অবকাঠামোগত ত্রুটির হার প্রায় শূন্যে নেমে আসে।
এই পদ্ধতি ব্যবহার করে এমন কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরি করা সম্ভব হবে, যা প্রায় শূন্য ত্রুটিতে বৃহৎ পরিসরে ‘সিঙ্গল-গেট’ কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। এর ফলে কোয়ান্টাম কম্পিউটার নির্মাতাদের ত্রুটি সংশোধনের জন্য অতিরিক্ত কিউবিট ব্যবহার করতে হবে না।
অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির পদার্থবিজ্ঞানের গবেষক ও গবেষণার সহ-লেখক মলি স্মিথ বলেন, ‘ত্রুটির হার নাটকীয়ভাবে কমিয়ে আনায় এই কাজটি কোয়ান্টাম ত্রুটি সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উল্লেখযোগ্যভাবে কমাবে। এর ফলে ভবিষ্যতের কোয়ান্টাম কম্পিউটারগুলো আরও ছোট, দ্রুত এবং কার্যকর হবে।’
তবে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এই রেকর্ডটি একক কিউবিট অপারেশনের ক্ষেত্রে অর্জিত হয়েছে। অনেক জটিল কোয়ান্টাম অ্যালগরিদম চালানোর জন্য একাধিক কিউবিটের সমন্বিত অপারেশন প্রয়োজন, যেখানে ত্রুটির হার এখনো তুলনামূলকভাবে বেশি (প্রায় প্রতি ২,০০০ অপারেশনে একটি)। যদিও এই গবেষণা ব্যবহারিক কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরির পথে একটি বড় পদক্ষেপ, মাল্টি-কিউবিট সিস্টেমের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলার জন্য আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।


