প্রকৃতি থেকে একটি গাছ পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গেলে, তা কি ফিরিয়ে আনা সম্ভব? অস্ট্রেলিয়ার একদল বিজ্ঞানী ঠিক এই কাজটি সম্ভব করতে চাইছেন। তারা ‘অ্যাঙ্গেল-স্টেমড মার্টল’ নামের একটি অতিবিপন্ন গাছকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে হিমশীতল সংরক্ষণ বা ক্রায়োপ্রিজারভেশন প্রযুক্তির সাহায্য নিচ্ছেন। এই পদ্ধতিতে গাছটির ডিএনএ এমনভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে এটিকে আবার পুনরুজ্জীবিত করা যায়।
পুরো বিশ্বে অ্যাঙ্গেল-স্টেমড মার্টল (Gossia gonoclada) প্রজাতির মাত্র ৩৮০টি গাছ বুনো পরিবেশে টিকে আছে। এর মধ্যে প্রায় ৩০০টি অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডের লোগান সিটি এলাকায় অবস্থিত। বিজ্ঞানীরা বলছেন, যদি এই প্রজাতির জিনগত বৈচিত্র্যকে সফলভাবে ক্রায়োব্যাংকে সংরক্ষণ করা যায়, তবে গাছটি প্রকৃতি থেকে হারিয়ে গেলেও তাকে ফিরিয়ে আনার একটি সুযোগ থাকবে। এই গবেষণার নেতৃত্বে থাকা কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্ল্যান্ট মলিকুলার ফিজিওলজিস্ট অ্যালিস হেওয়ার্ড বলেন, ‘এই প্রজাতির বাকি থাকা বৈচিত্র্যকে ক্রায়োব্যাংকে বাঁচিয়ে রাখার মাধ্যমে আমরা মূলত প্রজাতিটির জন্য একটি ব্যাকআপ স্টোরেজ তৈরি করছি।’
অ্যাঙ্গেল-স্টেমড মার্টল অস্ট্রেলিয়ার শুষ্ক রেইনফরেস্ট অঞ্চলের জলাধারের পাশে জন্মানো একটি ছোট গাছ। এর পাতাগুলো চকচকে, কাণ্ড চারকোনা ও ফলগুলো মিষ্টি ও মাংসল, যা বাঁদুড় ও পাখিদের খাবারের উৎস। গবেষকদের মতে, এই গাছ নদীর পাড় স্থিতিশীল রাখতে ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায়ও ভূমিকা রাখে। ২০১০ সাল থেকে এই গাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমতে শুরু করেছে।
মূলত তিনটি কারণে অ্যাঙ্গেল-স্টেমড মার্টল গাছটি আজ বিলুপ্তির পথে রয়েছে। প্রথমত আবাসস্থল ধ্বংস, দ্বিতীয়ত বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা এবং তৃতীয় সবচেয়ে বড় কারণ হলো ‘মার্টল রাস্ট’ নামের একটি ছত্রাকজনিত রোগ। অস্ট্রোপুচসিনিয়া সিডিআই নামের এই ছত্রাক গাছের নতুন গজানো অংশে আক্রমণ করে। এর ফলে পাতা বিকৃত হয়, গাছের বৃদ্ধি থেমে যায় এবং প্রজনন ক্ষমতা কমে যায়। এই রোগের কারণে গাছটির বীজ ব্যবহার করে বংশবিস্তার করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
গাছটিকে বাঁচাতে বিজ্ঞানীরা এর বীজ ব্যবহার না করে ‘শুট টিপ’ বা গাছের বর্ধনশীল ডগা সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কারণ, ছত্রাকের আক্রমণে বীজের উর্বরতা কমে গেছে এবং এগুলো ক্রায়োপ্রিজারভেশন পদ্ধতিতে দীর্ঘকাল টিকে থাকতে পারবে না বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এই পদ্ধতিতে প্রথমে জীবাণুমুক্ত ডগাগুলোকে একটি জেলির মতো মাধ্যমে জন্মানো হয়। এরপর সেই ডগাগুলোর মাথা কেটে নিয়ে একটি ক্রায়োপ্রোটেক্টিভ দ্রবণে শোধন করা হয়। সবশেষে তরল নাইট্রোজেনে মাইনাস ১৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় হিমায়িত করে সংরক্ষণ করা হয়।
অ্যালিস হেওয়ার্ড জানিয়েছেন, ক্রায়োপ্রোটেক্টিভ দ্রবণ কোষের ভেতরের পানিকে বরফ হয়ে কোষ ফেটে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করে। ফলে পানি কাচের মতো অবস্থায় পরিণত হয়। বিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যে অ্যাঙ্গেল-স্টেমড মার্টলের নিকটাত্মীয় ‘সুইট মার্টল’ গাছের ডগা দিয়ে এই পদ্ধতিতে শতভাগ সাফল্য পেয়েছেন। এখন তারা বিলুপ্তপ্রায় গাছটির জন্যও পদ্ধতিটি আরও উন্নত করার চেষ্টা করছেন।
বিজ্ঞানীদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, গাছটির পর্যাপ্ত জিনগত বৈচিত্র্য সংগ্রহ করা। কারণ একটি সুস্থ ও টেকসই গাছ পুনরুজ্জীবিত করতে হলে বিভিন্ন ধরনের জিনের প্রয়োজন। অ্যালিস হেওয়ার্ড বলেন, ‘ভবিষ্যতে প্রজাতির টিকে থাকার সেরা সুযোগটি নিশ্চিত করতে হলে পর্যাপ্ত জিনগত বৈচিত্র্য সংরক্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যদি মার্টল রাস্ট বা পরিবর্তিত জলবায়ু পরিস্থিতির বিরুদ্ধে কোনো প্রাকৃতিক সহনশীলতা থেকে থাকে, তবে তা খুঁজে বের করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বুনো পরিবেশে এই প্রজাতির ওপর যে হুমকি রয়েছে, তাতে এই কাজ খুব দ্রুত করতে হবে।’ গবেষকরা এখন রোগ-প্রতিরোধী বা জলবায়ু-সহনশীল গাছ শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন, যাতে ভবিষ্যতের প্রজনন কর্মসূচির জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করা যায়। এই গবেষণা শুধু একটি গাছকে বাঁচানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি বিশ্বের অন্যান্য বিপন্ন উদ্ভিদ ও খাদ্যশস্যের প্রজাতিকে ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণে ক্রায়োব্যাংক প্রতিষ্ঠার গুরুত্বকেও তুলে ধরেছে।


