রসায়নের জগতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচনের স্বীকৃতি হিসেবে চলতি বছর রসায়নে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তিন বিজ্ঞানী। তারা হলেন- জাপানের সুসুমু কিতাগাওয়া, অস্ট্রেলিয়ার রিচার্ড রবসন ও যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানী ওমর এম ইয়াঘি। আণবিক পর্যায়ে এক বিশেষ ধরনের স্থাপত্য বা কাঠামো তৈরির কৌশল আবিষ্কারের জন্য রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস তাদের এই সম্মাননা প্রদান করেছে।
তাদের আবিষ্কৃত এই কাঠামো ‘মেটাল–অরগানিক ফ্রেমওয়ার্কস’ বা সংক্ষেপে ‘এমওএফ’ নামে পরিচিত। ধাতব আয়ন ও জৈব অণুর সমন্বয়ে গঠিত এই কাঠামোর ভেতরে রয়েছে অসংখ্য ক্ষুদ্র গহ্বর বা ফাঁকা স্থান, যার মধ্য দিয়ে বিভিন্ন অণু প্রবেশ ও নির্গমন করতে পারে। বিজ্ঞানীরা এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে মরুভূমির বাতাস থেকে পানি আহরণ, দূষিত পানি থেকে দূষক পদার্থ অপসারণ, কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ, এমনকি হাইড্রোজেন গ্যাস সংরক্ষণেও সফল হয়েছেন।
মেটাল-অরগানিক ফ্রেমওয়ার্কস বা এমওএফ আসলে কী?
বিষয়টিকে সহজভাবে ব্যাখ্যা করতে গেলে, মেটাল-অরগানিক ফ্রেমওয়ার্কস এক ধরনের ‘রসায়নিক স্থাপত্য’। এমওএফ’কে একটি আণবিক আকারের বহুতল ভবনের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। এর প্রতিটি তলা নির্দিষ্ট কোনো অণুর জন্য বিশেষভাবে তৈরি। এর গঠন এতটাই সুশৃঙ্খল ও ক্ষুদ্র গহ্বরের দ্বারা গঠিত যে, মাত্র কয়েক গ্রাম এমওএফের অভ্যন্তরীণ পৃষ্ঠের ক্ষেত্রফল একটি ফুটবল মাঠের সমান হতে পারে। এই বিশাল পৃষ্ঠতলের কারণে এটি বিপুল পরিমাণ গ্যাস বা অন্যান্য পদার্থ শোষণ করতে পারে।
রসায়নবিদরা এই তিন নোবেলজয়ীর দেখানো পথে হেঁটে এর মধ্যে হাজার হাজার ভিন্ন ধরনের এমওএফ তৈরি করেছেন। এটি জ্বালানি, পরিবেশ, চিকিৎসাসহ বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। ফল পাকাতে সাহায্যকারী ইথিলিন গ্যাস আটকে দিয়ে ফলকে বেশি দিন সতেজ রাখা থেকে শুরু করে মানবদেহে নির্দিষ্ট স্থানে ওষুধ পৌঁছে দেওয়া কিংবা পরিবেশ থেকে অ্যান্টিবায়োটিকের মতো ক্ষতিকর উপাদান ধ্বংস করার মতো নানা প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে।
রবসনের কাঠের বল থেকে অনুপ্রেরণা
গল্পের শুরু ১৯৭৪ সালে। মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রিচার্ড রবসন তার ছাত্রদের অণু-পরমাণুর গঠন শেখানোর জন্য কাঠের বল ও রড দিয়ে মডেল তৈরি করছিলেন। পরমাণুর মডেল হিসেবে ব্যবহৃত কাঠের বলগুলোতে রাসায়নিক বন্ধনের জন্য নির্দিষ্ট কোণে ছিদ্র করার প্রয়োজন ছিল। কাজ শেষে বলগুলো হাতে নিয়ে তিনি উপলব্ধি করেন, ছিদ্রগুলোর সঠিক অবস্থান অণুর গঠনকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সঠিক রূপ দিচ্ছে।
এই সাধারণ পর্যবেক্ষণ থেকে তার মাথায় আসে এক প্রশ্ন— ‘যদি বাস্তব পরমাণুর মধ্যকার স্বাভাবিক আকর্ষণকে কাজে লাগিয়ে অণুগুলোকে জোড়া লাগানো যায়, তবে কি নতুন ধরনের উপাদান তৈরি করা সম্ভব?’ এই ভাবনা থেকে এক দশকের বেশি সময় পর তিনি গবেষণায় নামেন। হীরার গঠন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি কপার আয়নের সঙ্গে চার বাহুবিশিষ্ট একটি জৈব অণু যুক্ত করেন। রসায়নবিদদের তৎকালীন ধারণা ছিল, এটি একটি বিশৃঙ্খল জট তৈরি করবে। কিন্তু রবসন সবাইকে অবাক করে দিয়ে ১৯৮৯ সালে একটি সুশৃঙ্খল ত্রিমাত্রিক কাঠামো তৈরি করতে সক্ষম হন, যার ভেতরে ছিল বিশাল ফাঁকা জায়গা। এটি ছিল এমওএফ তৈরির পথে প্রথম মাইলফলক।
তবে রবসনের তৈরি কাঠামো খুব একটা স্থিতিশীল ছিল না। এই ধারণাটিকে বাস্তবে রূপ দিয়ে স্থিতিশীল ও কার্যকর কাঠামো তৈরির কাজটি করেন সুসুমু কিতাগাওয়া ও ওমর এম ইয়াঘি।
অপ্রয়োজনীয়ও একদিন প্রয়োজনীয় হতে পারে: কিতাগাওয়া
জাপানের কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সুসুমু কিতাগাওয়া ছোটবেলা থেকে বিশ্বাস করতেন, ‘অপ্রয়োজনীয়ও কখনো না কখনো উপকারী হয়।’ প্রাথমিক পর্যায়ে তার তৈরি এমওএফ কাঠামো অস্থির হওয়ায় গবেষণার জন্য অর্থ পেতে তাকে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। ১৯৯৭ সালে তিনি প্রথম স্থিতিশীল একটি ত্রিমাত্রিক এমওএফ তৈরি করেন, যা তার অভ্যন্তরীণ গঠন ঠিক রেখে গ্যাস শোষণ ও নির্গমন করতে পারত।
১৯৯৮ সালে কিতাগাওয়া ব্যাখ্যা করেন, এমওএফ উপকরণের মূল বিশেষত্ব হলো নমনীয়তা ও বৈচিত্র্য। এগুলো কঠিন জিওলাইটের মতো নয়; বরং নমনীয় ও পরিবর্তনযোগ্য। পরে তিনি এমন এমওএফ তৈরি করেন, যা গ্যাস ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে আকার পরিবর্তন করে, আবার খালি হলে আগের অবস্থায় ফিরে যায়। তার এই ধারণা এমওএফ গবেষণায় এক নতুন মাত্রা যোগ করে। তার তৈরি করা নমনীয় এমওএফ অনেকটা ফুসফুসের মতো গ্যাস শোষণ করে সংকুচিত বা প্রসারিত হতে পারত।
ইয়াঘি: মরুভূমির বাতাস থেকে পানির ফোঁটা
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত ওমর এম ইয়াঘি রসায়নে গতানুগতিক পদ্ধতির বাইরে গিয়ে ‘পরিকল্পিত নকশার’ মাধ্যমে নতুন বস্তু তৈরিতে আগ্রহী ছিলেন। জর্ডানের এক সাধারণ পরিবারে বেড়ে ওঠা ইয়াঘি ছোটবেলায় স্কুলের লাইব্রেরিতে প্রথম আণবিক কাঠামোর ছবি দেখে মুগ্ধ হন।
১৯৯৫ সালে তিনি প্রথমবারের মতো ‘মেটাল–অরগানিক ফ্রেমওয়ার্কস’ শব্দটি ব্যবহার করেন। সেই সময় তিনি প্রথম সফলভাবে একটি স্থিতিশীল দ্বিমাত্রিক কাঠামো প্রকাশ করেন। তবে তার সেরা কাজটি আসে ১৯৯৯ সালে, যখন তিনি ‘এমওএফ-৫’ নামে একটি ব্যতিক্রমী স্থিতিশীল ও বিশাল অভ্যন্তরীণ পৃষ্ঠতলবিশিষ্ট কাঠামো তৈরি করেন। এই কাঠামো ৩০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাতেও তার গঠন ধরে রাখতে পারত। এর শোষণ ক্ষমতা এত বেশি ছিল যে, মাত্র কয়েক গ্রামের পৃষ্ঠতল একটি ফুটবল মাঠের সমান।
এর পর ইয়াঘি দেখান, কীভাবে এমওএফের কাঠামোর নকশা পরিবর্তন করে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য অর্জন করা যায়। তার তৈরি এক সংস্করণ মিথেন গ্যাস সংরক্ষণে, আরেকটি পানিশূন্য মরুভূমির বাতাস থেকে পানি আহরণে সক্ষম হয়। রাতে এই পদার্থ বাতাসের জলীয় বাষ্প শোষণ করে, আর সূর্যের তাপে সকালে সেই পানি বেরিয়ে আসে—পানি সংগ্রহের এক অভিনব পদ্ধতি।
বাস্তব জীবনে এমওএফের প্রয়োগ
এই তিন বিজ্ঞানীর মৌলিক গবেষণার ওপর ভিত্তি করে আজ এমওএফ প্রযুক্তি বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য প্রয়োগ:
পানি সংগ্রহ
ইয়াঘির গবেষক দল অ্যারিজোনার মরুভূমিতে এমওএফ ব্যবহার করে রাতের বাতাস থেকে জলীয় বাষ্প সংগ্রহ করে সকালে তা থেকে বিশুদ্ধ পানযোগ্য পানি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
কার্বন শোষণ
কানাডার একটি কারখানায় ‘CALF-২০’ নামের একটি এমওএফ ব্যবহার করে চিমনি থেকে নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণের পরীক্ষা চলছে।
জ্বালানি সংরক্ষণ
হাইড্রোজেনকে নিরাপদ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের বড় চ্যালেঞ্জ হলো এর সংরক্ষণ। ‘NU–১৫০১’-এর মতো এমওএফ সাধারণ চাপে বিপুল পরিমাণ হাইড্রোজেন গ্যাস সংরক্ষণ করতে পারে।
দূষণ নিয়ন্ত্রণ
সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে ব্যবহৃত বিষাক্ত গ্যাস ধারণ করতে কিংবা পানি থেকে PFAS-এর মতো মারাত্মক দূষক পদার্থ অপসারণে এমওএফ কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
রাসায়নিক অস্ত্র নিষ্ক্রিয়করণ
কিছু এমওএফ ক্ষতিকর গ্যাস, এমনকি রাসায়নিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত গ্যাসকেও ভেঙে নিষ্ক্রিয় করে দিতে পারে।
গবেষকরা মনে করছেন, মেটাল-অরগানিক ফ্রেমওয়ার্কস একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে সম্ভাবনাময় পদার্থগুলোর একটি। রিচার্ড রবসন, সুসুমু কিতাগাওয়া এবং ওমর এম ইয়াঘি তাদের কাজের মাধ্যমে মানবজাতির সামনে থাকা বহু বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার নতুন পথ দেখিয়েছেন— যা আলফ্রেড নোবেলের উইল অনুসারে ‘মানবতার জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ উপকার’ বয়ে এনেছে।


