অবশেষে আইসল্যান্ডেও মশার সন্ধান পাওয়া গেল। কয়েক দশক ধরে দেশটি বিশ্বের একমাত্র মশামুক্ত দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল। তবে গত সপ্তাহে দেশটির কিওসাররেপুর পৌরসভার একটি বাড়ির বাগানে তিনটি মশা খুঁজে পাওয়ার পর সেই দুর্লভ খ্যাতির অবসান ঘটল।
আইসল্যান্ড মনিটরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবরের মধ্যে বিয়র্ন হিয়ালতাসন নামের এক ব্যক্তি তার বাড়ির বাগানে দুটি স্ত্রী ও একটি পুরুষ মশা দেখতে পান। এই আবিষ্কার আইসল্যান্ডের বিজ্ঞানীদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে।
বিয়র্ন হিয়ালতাসন ‘ইনসেক্টস অব আইসল্যান্ড’ নামের একটি ফেসবুক গ্রুপে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি লেখেন, ‘আমি দেখে বুঝতে পারছিলাম যে, এমন কিছু আগে কখনো দেখিনি।’ তার এই আবিষ্কারের পর তিনি আইসল্যান্ডের আইসল্যান্ডিক ইনস্টিটিউট অব ন্যাচারাল হিস্ট্রির সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
প্রতিষ্ঠানটির কীটতত্ত্ববিদ ম্যাথিয়াস আলফ্রেডসন মশাগুলো পরীক্ষা করে নিশ্চিত করেছেন, এগুলো ‘কুলিসেটা অ্যানুলাটা’ প্রজাতির মশা।
এই আবিষ্কারের তাৎপর্য তুলে ধরে হিয়ালতাসন তার ফেসবুক পোস্টে মন্তব্য করেন, ‘শেষ দুর্গটিরও পতন হলো।’ তবে এই মশাগুলো আইসল্যান্ডের তীব্র শীত সহ্য করে দীর্ঘ মেয়াদে টিকে থাকতে পারবে কি না এবং বংশবিস্তার করতে সক্ষম হবে কি না, তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিত নন। বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
কেন আইসল্যান্ড এতদিন মশামুক্ত ছিল?
আইসল্যান্ডের এই মশামুক্ত পরিবেশ বিজ্ঞানীদের কাছে দীর্ঘদিন ধরে একটি আগ্রহের বিষয় ছিল। আশ্চর্যের বিষয়, এর প্রতিবেশী দেশ নরওয়ে, স্কটল্যান্ড ও গ্রিনল্যান্ড সবখানে মশার একাধিক প্রজাতি রয়েছে। উল্লেখ্য, অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশও মশামুক্ত, তবে এটি কোনো দেশ নয়।
আইসল্যান্ডের মশামুক্ত থাকার পেছনে বিজ্ঞানীরা একাধিক তত্ত্ব দিয়েছেন। একটি ধারণা ছিল, বিচ্ছিন্ন দ্বীপরাষ্ট্র হওয়ায় মশা হয়তো সেখানে পৌঁছাতে পারেনি। চারদিকে শত শত মাইল সমুদ্রের প্রাকৃতিক বাধা মশার জন্য একটি বড় প্রতিবন্ধক ছিল।
তবে এই তত্ত্বকে পুরোপুরি সমর্থন করেন না বিশেষজ্ঞরা। কারণ, আধুনিক যুগে বিমানের মাধ্যমে মশার এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়া খুব সাধারণ ঘটনা। আইসল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গিসলি মার গিসলাসন নিজে একবার গ্রিনল্যান্ড থেকে আইসল্যান্ডে আসা একটি বিমানের ভেতর থেকে একটি মশা ধরেছিলেন। তিনি ২০১৭ সালে রেইকিয়াভিক গ্রেপভাইনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, মশা বিমানের ল্যান্ডিং গিয়ারে কনকনে ঠাণ্ডার মধ্যেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বেঁচে থাকতে পারে।
তাহলে মশা পৌঁছানোর পরও কেন সেখানে তাদের বংশবিস্তার ঘটেনি? এর সবচেয়ে সম্ভাব্য এবং বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হলো আইসল্যান্ডের প্রতিকূল ও বিশেষ জলবায়ু।
মশার জীবনচক্র ও আইসল্যান্ডের জলবায়ু
মশার জীবনচক্র ডিম, লার্ভা, পিউপা ও পূর্ণবয়স্ক মশা এই চারটি ধাপে সম্পন্ন হয়। পূর্ণবয়স্ক স্ত্রী মশা পানিতে ডিম পাড়ে। সেই ডিম ফুটে লার্ভা বের হয় এবং পানিতে তা পিউপা বা মূককীটে রূপান্তরিত হয়। এরপর পিউপা থেকে পূর্ণবয়স্ক মশা বেরিয়ে আসে। লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের পতঙ্গ জীববিজ্ঞানী রবার্ট জোনস লাইভ সায়েন্সকে বলেন, মশার লার্ভার বিকাশের জন্য অবিচ্ছিন্নভাবে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তরল পানির প্রয়োজন হয়।
খুব শীতল অঞ্চলে কিছু মশা ডিম অবস্থায় শীতকাল পার করে। এই ডিমগুলো জমাট বাঁধা বরফের নিচেও কয়েক মাস টিকে থাকতে পারে। আবার মধ্য ইউরোপের মতো উষ্ণ অঞ্চলে মশা ডিম, লার্ভা অথবা পূর্ণবয়স্ক অবস্থায় গর্তে বা সুরক্ষিত স্থানে শীতকাল কাটায়।
তবে আইসল্যান্ডের জলবায়ু এই দুই চরম অবস্থার মাঝামাঝি। এখানকার শীতকাল দীর্ঘ এবং শরৎ ও বসন্তকালে আবহাওয়া খুব দ্রুত ওঠানামা করে। এই সময়ে জলাশয়গুলো বারবার জমে বরফ হয়, আবার গলে যায় এবং পুনরায় জমে যায়।
এই অনিয়মিত ‘ফ্রিজ-থ’ বা জমা-গলা চক্র মশার বিকাশের জন্য মারাত্মক। পানি গলার পর মশা ডিম পাড়লেও, লার্ভা বা পিউপা দশায় পৌঁছানোর আগে তা আবার জমে বরফ হয়ে যায়। ফলে লার্ভাগুলো পূর্ণবয়স্ক মশারূপে আবির্ভূত হওয়ার আগে মারা যায়। এতে কোনো স্থায়ী প্রজাতি গড়ে উঠতে পারে না।
অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, আইসল্যান্ডের উষ্ণ প্রস্রবণগুলোর পানি শীতেও জমে যায় না। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ওই প্রস্রবণগুলোর তাপমাত্রা মশার লার্ভার বেঁচে থাকার জন্য অতিরিক্ত বেশি উষ্ণ। এ ছাড়া সেগুলোর রাসায়নিক গঠনও মশার বিকাশের উপযোগী নয়।
জলবায়ু পরিবর্তন কি পরিস্থিতি বদলাচ্ছে?
যদিও আইসল্যান্ডে সদ্য আবিষ্কৃত মশাগুলো শীতকালে টিকে থাকতে পারে কি না, তা এখনো দেখা বাকি। তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আইসল্যান্ডের এই মশামুক্ত থাকার গৌরব হয়তো চিরস্থায়ী হবে না।
রবার্ট জোনসের মতে, জলবায়ু উষ্ণ হওয়ার ফলে যদি আইসল্যান্ডের বসন্ত ও শরৎকাল দীর্ঘতর ও উষ্ণ হয়, তবে তা দীর্ঘ সময় ধরে পানিকে তরল অবস্থায় রাখতে পারে। এটি মশার স্থায়ী বংশবিস্তারের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ করে দেবে।
নিউ মেক্সিকো স্টেট ইউনিভার্সিটির জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক ইমো হ্যানসেনও এই আশঙ্কার সঙ্গে একমত। তিনি বলেন, ‘আমরা এরই মধ্যে দেখছি, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় মশাগুলো উষ্ণ শীতের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে।’
মশামুক্ত অঞ্চলের পতনের ঘটনা এটাই প্রথম নয়। হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ, যা বিশ্বের সবচেয়ে বিচ্ছিন্ন দ্বীপপুঞ্জ, ১৮২৬ সাল পর্যন্ত মশামুক্ত ছিল। তবে ইউরোপীয় ও আমেরিকান জাহাজের মাধ্যমে দুর্ঘটনাক্রমে সেখানে মশা পৌঁছে যায়। হাওয়াইয়ের অনুকূল জলবায়ুতে মশা দ্রুত বংশবিস্তার করে এবং দ্বীপগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মশাগুলো এখন হাওয়াইয়ের সেসব উঁচু বনাঞ্চলেও পৌঁছে যাচ্ছে, যা একসময় তাদের বেঁচে থাকার জন্য খুব শীতল ছিল।
রোগের ঝুঁকি কতটা?
আইসল্যান্ডে মশা পাওয়া গেলেও, জীবাণুবাহী এডিস মশার মতো বিপজ্জনক প্রজাতি সেখানে টিকে থাকার সম্ভাবনা এখনো খুব কম।
বিশেষজ্ঞ রবার্ট জোনস বলেছেন, এসব মশার বেঁচে থাকার জন্য গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বা উপ-গ্রীষ্মমণ্ডলীয় জলবায়ু প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তন এবং আধুনিক পরিবহনের কারণে দক্ষিণ ইউরোপে এসব রোগের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি বেড়েছে। তবে গবেষণা বলছে, ২০৮০ সাল নাগাদও উত্তর ইউরোপ ডেঙ্গু সংক্রমণের জন্য অনুপযুক্ত থাকবে। সূত্র: লাইভ সায়েন্স


