২০০২ সালের ১১ নভেম্বর। গণিতবিশ্বে দিনটি চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। সেদিন গ্রিশা পেরেলমান নামে এক রুশ গণিতবিদ একটি গবেষণাপত্র অনলাইনে প্রকাশ করেন। ‘দ্য এন্ট্রপি ফর্মুলা ফর দ্য রিচি ফ্লো অ্যান্ড ইটস জিওমেট্রিক অ্যাপ্লিকেশনস’ শিরোনামের সেই গবেষণাপত্রটি ছিল গণিতের ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত ও অমীমাংসিত একটি সমস্যার সমাধানের ভিত্তি। গবেষণাপত্রটি সেই সময় গণিতবিশ্বকে আলোড়িত করে। এটি ছিল এক শতাব্দী ধরে অমীমাংসিত একটি বিখ্যাত গাণিতিক সমস্যার সমাধানের প্রথম ধাপ।
সমস্যাটি হলো ‘পোয়াঁকারে হাইপোথিসিস’। প্রায় এক শতাব্দী আগে ফরাসি গণিতবিদ হেনরি পোয়াঁকারে এই হাইপোথিসিসটি প্রস্তাব করেছিলেন।
সহজ কথায় পোয়াঁকারে হাইপোথিসিসটি বলে, যদি একটি ত্রিমাত্রিক বস্তুর ওপর আঁকা যেকোনো দ্বিমাত্রিক লুপকে ছেঁড়া বা ভাঙা ছাড়াই একটি বিন্দুতে সংকুচিত করা যায়, তবে বস্তুটি গাণিতিকভাবে একটি গোলকের সমতুল্য।
এই হাইপোথিসিস প্রমাণ করা ‘টপোলজি’ বা আকৃতিবিষয়ক গণিতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। গণিতবিদ স্টিফেন স্মেল ১৯৬১ সালে পাঁচ মাত্রার ক্ষেত্রে এটি প্রমাণ করে গণিতের সর্বোচ্চ সম্মান ফিল্ডস মেডেল জিতেছিলেন। তবে ত্রিমাত্রিক ক্ষেত্রটি সবচেয়ে দুরূহ প্রমাণিত হয়।
১৯৮০-এর দশকে কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির গণিতবিদ রিচার্ড এস হ্যামিল্টন এই সমস্যা সমাধানের জন্য ‘রিচি ফ্লো’ নামের একটি গাণিতিক কৌশল ব্যবহারের প্রস্তাব দেন। এই কৌশল আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব ও স্ট্রিং থিওরিতেও ব্যবহৃত হয়।
রিচি ফ্লো কৌশলটিকে একটি কুঁচকানো প্লাস্টিককে হেয়ার ড্রায়ারের উত্তাপ দিয়ে মসৃণ করার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। একইভাবে এই কৌশল জটিল গাণিতিক আকারকে মসৃণ করে একটি মৌলিক আকারে (যেমন- গোলক) রূপান্তর করতে পারে। তবে এই প্রক্রিয়ায় ‘সিংগুলারিটি’ বা অসীম ঘনত্বের বিন্দু তৈরি হচ্ছিল, যা গবেষকদের আটকে দেয়।
পেরেলমানের গবেষণাপত্রটি এই সিংগুলারিটির সমস্যা সমাধান করে। গ্রিগরি পেরেলমান যার ছদ্মনাম ‘গ্রিশা’, এর আগে যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গবেষণা করেছেন। ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের লোভনীয় ফেলোশিপ প্রত্যাখ্যান করে সেন্ট পিটার্সবার্গে ফিরে গিয়ে স্টেকলভ ইনস্টিটিউট অব ম্যাথমেটিক্সে যোগ দেন।
সহকর্মীদের মতে, তিনি ছিলেন প্রচারবিমুখ, লাজুক ও জাগতিক বিষয়ে উদাসীন। তিনি সম্পদ বা সাফল্যে সম্পূর্ণ আগ্রহহীন ছিলেন।
পেরেলমান ২০০২ থেকে ২০০৩ সালের মধ্যে মোট তিনটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। এ ছাড়া কয়েকটি সেমিনারে বক্তৃতা দেন। এর পর তিনি আবার আড়ালে চলে যান।
তার কাজ প্রমাণ করে, রিচি ফ্লো প্রক্রিয়ায় উদ্ভূত সমস্ত সিংগুলারিটি সাধারণ আকারে (গোলক বা টিউব) হ্রাস পায় এবং শেষ পর্যন্ত ত্রিমাত্রিক আকৃতিটি একটি গোলকে পরিণত হয়। গণিতবিদদের এই জটিল প্রমাণটি যাচাই করতে কয়েক বছর সময় লাগে। ২০০৬ সালে গণিতবিদ জন মরগান ও গ্যাং টিয়ান একটি ৪৭৩ পৃষ্ঠার গবেষণাপত্রে পেরেলমানের কাজকে সঠিক বলে নিশ্চিত করেন।
এই যুগান্তকারী সমাধানের জন্য পেরেলমানকে ২০০৬ সালে ‘ফিল্ডস মেডেল’ (গণিতের নোবেল) এবং ‘ক্লে মিলেনিয়াম’ গণিত পুরস্কার দেওয়া হয়। ক্লে পুরস্কারের অর্থমূল্য ছিল ১০ লাখ ডলার। তবে গ্রিগরি পেরেলমান এই উভয় সম্মাননা ও পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেন।
তিনি ২০০৫ সালে স্টেকলভ ইনস্টিটিউট থেকে পদত্যাগ করেন। এর পর থেকে তিনি কঠোরভাবে লোকচক্ষুর আড়ালে জীবনযাপন করেন। ২০১০ সালে এক সাংবাদিক তার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে তিনি বলেন, ‘আপনি আমাকে বিরক্ত করছেন। আমি মাশরুম কুড়াচ্ছি।’


