ক্যানসার জয় করার দীর্ঘ সময় পর শরীরে রোগটির ফিরে আসার মূল কারণ নির্ণীত হয়েছে। শরীরের ভেতরে বছরের পর বছর ওত পেতে থাকা ‘সুপ্ত টিউমার কোষ’ (Dormant Tumor Cells) চিহ্নিত করার মাধ্যমে এই মরণব্যাধিকে চিরতরে নির্মূল করার নতুন আশা দেখছেন গবেষকরা।
গত ৬ জানুয়ারি বিজ্ঞানবিষয়ক জার্নাল নেচার সাময়িকীতে এ নিয়ে নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। সেই নিবন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসক দলের অনুসন্ধান সবিস্তারে তুলে ধরা হয়েছে।
শরীরের ভেতরে অদৃশ্য শত্রু
গবেষণায় দেখা গেছে, ক্যানসার আক্রান্ত হওয়ার প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু কোষ মূল টিউমার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে হাড়ের মজ্জা বা লসিকা গ্রন্থির মতো নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেয়। এই কোষগুলো কোনো বিভাজন বা বৃদ্ধি ছাড়াই কয়েক বছর এমনকি কয়েক দশক পর্যন্ত ‘ঘুমন্ত’ অবস্থায় থাকতে পারে। যেহেতু এরা সক্রিয় নয়, তাই প্রচলিত রাসায়নিক চিকিৎসা (Chemotherapy) এদের খুঁজে পায় না। প্রায় ৩০ শতাংশ ক্যানসারজয়ী মানুষের শরীরে এমন অদৃশ্য শত্রু লুকিয়ে থাকার আশঙ্কা থাকে।
কেন জেগে ওঠে এই ঘুমন্ত কোষ
বায়োমেডিকেল প্রকৌশলী শেলি পেটনের মতে, কোষগুলোর জেগে ওঠা অনেকটা ‘ভাগ্যের খেলা’। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী থাকলে এগুলো নিয়ন্ত্রণে থাকে। কিন্তু কিছু বিশেষ কারণে এই ভারসাম্য নষ্ট হলে কোষগুলো পুনরায় সক্রিয় হয়ে ওঠে। প্রধানতম কারণ সংক্রমণ, ইনফ্লুয়েঞ্জা বা শ্বাসতন্ত্রের মারাত্মক সংক্রমণ সুপ্ত কোষগুলোকে জাগিয়ে তুলতে পারে।
বয়সের কারণে হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়া বা হরমোনের পরিবর্তন ক্যানসার কোষের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করে। হাড়ের মজ্জার নরম পরিবেশ যখন অস্বাভাবিকভাবে শক্ত হয়ে যায়, তখন সেখানে থাকা সুপ্ত কোষগুলো ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পায়।
লিসা ডাটনের লড়াই
যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক লুইস চোডশ এবং অ্যাঞ্জেলা ডেমিকলে গত ২০ বছর ধরে এই কোষগুলোর ওপর কাজ করছেন। এই গবেষণায় আশার আলো হয়ে এসেছেন লিসা ডাটন নামে এক নারী। ২০২০ সালে উন্নত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তার হাড়ের মজ্জায় এই সুপ্ত কোষের অস্তিত্ব ধরা পড়ে। বর্তমানে দুটি বিশেষ পদ্ধতির মাধ্যমে এই লড়াই চলছে। একটি হলো পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি। এর মাধ্যমে শরীরে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত কোষগুলোকে নিবিড়ভাবে খুঁজে দেখা হয়। অন্যটি হলো নির্মূল পদ্ধতি- এর লক্ষ্য হলো ঘুমন্ত কোষগুলো জেগে ওঠার আগেই সেগুলোকে খুঁজে বের করে চিরতরে ধ্বংস করা।
ক্যানসারবিজ্ঞানী সাইরাস গাজার এই গবেষণাকে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় অগ্রগতি হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। গবেষকরা এখন এমন কিছু ওষুধের সংমিশ্রণ নিয়ে কাজ করছেন, যা এই সুপ্ত কোষগুলোর বিপাকীয় ক্ষমতা পুরোপুরি নষ্ট করে দেবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্যানসার মানেই মৃত্যু-এই প্রাচীন ধারণা এখন ভাঙার মুখে। যদি এই সুপ্ত কোষগুলোকে শুরুতেই নির্মূল করা যায়, তবে ভবিষ্যতে ক্যানসার পুনরায় ফিরে আসার ঝুঁকি প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে।
জয়ন্ত/এসজি/


