বিশ্বের কোনো বড় বা বিশৃঙ্খল ঘটনাকে সহজ ও সুশৃঙ্খলভাবে ব্যাখ্যা করার প্রবণতা থেকে জন্ম নেয় ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বা ‘কনস্পিরেসি থিওরি’। তবে কেন কিছু মানুষ অন্যদের তুলনায় এই তত্ত্বগুলোর প্রতি বেশি আকৃষ্ট হন, তা নিয়ে নতুন তথ্য দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। অস্ট্রেলিয়ার ফ্লিন্ডার্স ইউনিভার্সিটির একদল গবেষকের মতে, মানুষের তথ্য বিশ্লেষণের বিশেষ ধরন এর পেছনে প্রধান কারণ।
গবেষণাটি বলছে, যারা জগৎকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামো বা নিয়মের মধ্য দিয়ে দেখতে পছন্দ করেন, তারা ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বেশি বিশ্বাস করেন। গবেষকরা এই বিশেষ চিন্তাধারাকে বলছেন ‘সিস্টেমাইজিং’ বা যান্ত্রিক চিন্তাশৈলী। এ ধরনের মানুষেরা যেকোনো ঘটনার পেছনে একটি নির্দিষ্ট ছক খোঁজার তীব্র তাড়না অনুভব করেন। তাদের কাছে অগোছালো ও অনিশ্চিত বিষয়ের চেয়ে ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো অনেক বেশি গোছানো এবং যৌক্তিক মনে হয়।
ফ্লিন্ডার্স ইউনিভার্সিটির গবেষক ড. নিওফাইটাস জর্জিওর নেতৃত্বে এই গবেষণাটি সম্পন্ন হয়েছে। তিনি জানান, সাধারণত মনে করা হয় যারা যৌক্তিকভাবে চিন্তা করতে পারেন না, তারা ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাস করেন। কিন্তু তাদের গবেষণায় দেখা গেছে ভিন্নচিত্র। প্রায় ৫৫০ জন মানুষের ওপর চালানো এই গবেষণায় দেখা গেছে, অনেকের বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তাশক্তি বা প্রখর যুক্তিজ্ঞান থাকা সত্ত্বেও তারা ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাস করছেন। এর কারণ তারা পৃথিবীকে একটি সুনির্দিষ্ট নিয়মে চলতে দেখতে চান। ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো বিচ্ছিন্ন সব ঘটনাকে একটি সুতোয় গেঁথে দেয়, যা এই মানুষগুলোকে মানসিক প্রশান্তি দেয়।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, যারা অতিরিক্ত নিয়মমাফিক চিন্তা করেন, তারা নিজেদের বিশ্বাসের ক্ষেত্রে বেশ অনড় হন। নতুন কোনো তথ্য ও প্রমাণ হাতে এলেও তারা সহজে নিজেদের আগের ধারণা বদলাতে চান না। এই একগুঁয়েমির কারণেই ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো সমাজে টিকে থাকে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, এমনকি জোরালো কোনো প্রমাণ পাওয়ার পরও যান্ত্রিক চিন্তার মানুষেরা তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে খুব একটা আগ্রহী হন না।
ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাসের ফলে সমাজে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এটি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর থেকে মানুষের আস্থা কমিয়ে দেয়, টিকাদানে অনীহা তৈরি করে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সরকারি পদক্ষেপে বাধা সৃষ্টি করে। এ ছাড়া এটি মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ায় এবং পারস্পরিক সম্পর্ক নষ্ট করে। দীর্ঘমেয়াদে এটি মানুষের সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তিকেও দুর্বল করে দেয়।
ড. জর্জিওর মতে, ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বা ভুল তথ্য মোকাবিলায় কেবল তথ্য যাচাই (ফ্যাক্ট চেক) ও যুক্তি দিয়ে কাজ হবে না। বরং মানুষ কীভাবে তথ্য গ্রহণ করতে পছন্দ করে, সেই মনস্তাত্ত্বিক দিকটি বুঝতে হবে। মানুষের বিশেষ কিছু মানসিক চাহিদা পূরণ করে বলে এই তত্ত্বগুলো জনপ্রিয় হয়। ‘কগনিটিভ প্রসেসিং’ সাময়িকীতে এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, এই আবিষ্কার ভুল তথ্য ও গুজব প্রতিরোধের নতুন কৌশল তৈরিতে বিজ্ঞানীদের সাহায্য করবে।


