বটলনোজ ডলফিন নিয়ে মানুষের কৌতূহল হাজার বছরের পুরোনো। গ্রিক পুরাণেও এই বুদ্ধিমান প্রাণীর সরব উপস্থিতি দেখা যায়। তবে ১৯৬০-এর দশকের আগে ডলফিনের যোগাযোগ পদ্ধতি নিয়ে তেমন কোনো পদ্ধতিগত গবেষণা হয়নি। জন লিলি এবং মেলবা ও ডেভিড ক্যালডওয়েল দম্পতির মতো বিজ্ঞানীরা প্রথম ডলফিনের শব্দরহস্য উন্মোচনের চেষ্টা করেন। ক্যালডওয়েল দম্পতি লক্ষ করেন, প্রতিটি ডলফিন একটি নির্দিষ্ট ও অনন্য শিস ব্যবহার করে যোগাযোগ করে। গবেষকরা একে বলেন ‘সিগনেচার হুইসেল’ বা পরিচয়জ্ঞাপক শিস।
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, এই শিসগুলো মানুষের নামের মতো কাজ করে। পানির নিচে যেখানে দৃষ্টিশক্তি সীমিত, সেখানে ডলফিনরা একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে এই নাম ব্যবহার করে। এটি অনেকটা অন্ধকার ঘরে কাউকে দেখতে না পেয়ে ‘আমি এখানে’ বলে ডাকার মতো। ফ্লোরিডার সারাসোটা বে-তে ১৯৮০-এর দশক থেকে বন্য ডলফিনের ওপর গবেষণা চলছে। এটি বিশ্বের দীর্ঘতম চলমান বন্য ডলফিন গবেষণা প্রকল্প। এখানে প্রায় ১৭০টি ডলফিনের বয়স, লিঙ্গ এবং পারিবারিক সম্পর্ক সম্পর্কে গবেষকদের বিস্তারিত ধারণা রয়েছে।
গবেষকরা ডলফিনের কপালে বিশেষ ধরনের ‘সাকশন-কাপ হাইড্রোফোন’ বা পানির নিচে শব্দ রেকর্ড করার যন্ত্র লাগিয়ে তাদের কথা বলার ধরন পর্যবেক্ষণ করেন। এতে দেখা গেছে, ডলফিনরা কেবল বন্দি অবস্থায় নয়, বরং মুক্ত সাগরেও নিজেদের অনন্য পরিচয়জ্ঞাপক শিস ব্যবহার করে। সারাসোটা ডলফিন হুইসেল ডেটাবেজে এখন পর্যন্ত ৩২৪টি পৃথক ডলফিনের প্রায় ১ হাজারটি রেকর্ডিং সেশন জমা হয়েছে। দেখা গেছে, ডলফিনের দেওয়া শিসের প্রায় ৮৫ শতাংশ তাদের নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করে।
গবেষণার একটি চমৎকার দিক হলো ডলফিন মায়েদের আচরণ। মানুষের মায়েরা যেমন ছোট শিশুদের সঙ্গে কথা বলার সময় কণ্ঠস্বর কিছুটা উঁচুতে বা একটু নমনীয় সুরে কথা বলেন, ডলফিন মায়েরা ঠিক তাই করে। একে বলা হয় ‘মাদারিজ’ বা অপত্য ভাষা। যখন কোনো ডলফিন মা তার সন্তানের সঙ্গে যোগাযোগ করে, তখন সে তার সিগনেচার হুইসেলের কম্পাঙ্ক বা পিচ বাড়িয়ে দেয়। আবার কোনো ডলফিন যখন অন্য কারও সঙ্গে পরিচিত হতে চায় বা কাউকে ডাকতে চায়, তখন সে ওই নির্দিষ্ট ডলফিনের সিগনেচার হুইসেলটি নকল করে। এটি ঠিক মানুষকে নাম ধরে ডাকার মতোই একটি প্রক্রিয়া।
গবেষকরা আরও দেখেছেন, এই পরিচয়জ্ঞাপক শিসগুলো সারা জীবন অপরিবর্তিত থাকে, বিশেষ করে স্ত্রী ডলফিনদের ক্ষেত্রে। তবে পুরুষ ডলফিনরা যখন অন্য কোনো পুরুষ ডলফিনের সঙ্গে গভীর বন্ধুত্ব গড়ে তোলে, তখন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের শিসগুলো একে অপরের মতো হয়ে যায়। বর্তমানে গবেষকরা এমন কিছু শিস খুঁজে পেয়েছেন, যা একাধিক ডলফিন ব্যবহার করে। এগুলোকে বলা হচ্ছে ‘নন-সিগনেচার হুইসেল’ বা অ-পরিচয়জ্ঞাপক শিস। ড্রোন এবং উন্নত এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে দেখা যায়, ডলফিনরা কোনো বিষয়ে সতর্ক করতে বা বিস্ময় প্রকাশ করতে এই সাধারণ শিসগুলো ব্যবহার করে।
ডলফিনের সামাজিক সম্পর্ক মানুষের মতো অত্যন্ত জটিল। তাদের প্রতিক্রিয়া নির্ভর করে পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির ওপর। যেমন–কোনো ডলফিন একা থাকলে যেভাবে সাড়া দেয়, দলবদ্ধ অবস্থায় থাকলে তার প্রতিক্রিয়া হয় ভিন্ন। এমনকি তাদের মেজাজের ওপরও যোগাযোগের ধরন বদলে যায়। গবেষকরা এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে ডলফিনের শব্দের ক্যাটালগ তৈরি করছেন। তাদের লক্ষ্য হলো ডলফিনরা যখন নিজেদের মধ্যে কথা বলে, তখন তারা অনুপস্থিত কোনো ডলফিনকে নিয়ে ‘গল্প’ করে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া। ডলফিনের এই অন্তহীন যোগাযোগ রহস্য বিজ্ঞানীদের প্রতিদিন নতুন করে ভাবাচ্ছে।


