যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে এক ঐতিহাসিক যাত্রার সূচনা হলো। দীর্ঘ ৫৪ বছর পর আবারও মানুষের চন্দ্রাভিযানের পথে এক বিশাল পদক্ষেপ নিল মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। আর্টেমিস-২ মিশনের মাধ্যমে চারজন নভোচারী এখন পৃথিবীর কক্ষপথে অবস্থান করছেন। তাদের গন্তব্য এখন আমাদের চিরচেনা চাঁদ। মহাকাশ বিজ্ঞানের ইতিহাসে এই অভিযানকে এক নতুন মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পয়লা এপ্রিল ২০২৬ তারিখে আর্টেমিস-২ মিশনটি সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা হয়। এ মিশনের মূল লক্ষ্য চাঁদকে প্রদক্ষিণ করে ফিরে আসা। নভোচারীরা সরাসরি চাঁদে নামবেন না, তবে এই ১০ দিনের মিশনটি ভবিষ্যতে মানুষের চন্দ্রপৃষ্ঠে অবতরণের পথ প্রশস্ত করবে। নাসা জানিয়েছে, নভোচারীরা চাঁদের দূরবর্তী অংশ থেকে প্রায় ৬ হাজার ৪০০ মাইল দূরে ভ্রমণ করবেন, যা আগে কখনো ঘটেনি। এ মিশনের সফলতার ওপর ভিত্তি করেই ২০২৮ সালে আর্টেমিস-৪ ও ৫ মিশনে মানুষকে চাঁদে নামানোর পরিকল্পনা করছে নাসা।
উৎক্ষেপণের সময় কেনেডি স্পেস সেন্টারে এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। নাসার সবচেয়ে শক্তিশালী রকেট ‘স্পেস লঞ্চ সিস্টেম’ (এসএলএস)-এর গর্জনে চারপাশ কেঁপে ওঠে। রকেটটি প্রায় ৮৮ লাখ পাউন্ড শক্তি নিয়ে ফ্লোরিডার সন্ধ্যার আকাশে ডানা মেলে। উৎক্ষেপণের আগে অবশ্য কিছুটা স্নায়ুচাপের সৃষ্টি হয়। কারিগরি ত্রুটির কারণে কাউন্টডাউন ঘড়িটি ১০ মিনিটের জন্য থামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। রকেটের ‘লঞ্চ অ্যাবোর্ট সিস্টেম’ ও ফ্লাইট টার্মিনেশন সিস্টেমে কিছু সমস্যা দেখা দেয়। তবে নাসার প্রকৌশলীরা দ্রুত এ সমস্যার সমাধান করেন। একজন কর্মকর্তা জানান, পুরোনো স্পেস শাটল প্রোগ্রামের হার্ডওয়্যার ব্যবহার করে একটি ত্রুটি সারিয়ে তোলা হয়।
মহাকাশযান ‘ওরিয়ন’ এখন পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে। এর ভেতরে রয়েছেন কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান এবং তার তিন সঙ্গী। উৎক্ষেপণের সময় রিড ওয়াইজম্যান বলেন, ‘আমরা পুরো মানবজাতির জন্য যাচ্ছি।’ ওরিয়ন ক্যাপসুলটি রকেট থেকে আলাদা হওয়ার পর নভোচারীরা এখন বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছেন। পরবর্তী ২৪ ঘণ্টা তারা পৃথিবীর কক্ষপথে থাকবেন। সবকিছু ঠিক থাকলে ওরিয়ন তার মূল ইঞ্জিন চালু করবে এবং পৃথিবীর মহাকর্ষ বল কাটিয়ে চাঁদের দিকে যাত্রা করবে। একে বলা হচ্ছে ‘ট্রান্স-লুনার ইনজেকশন’ বার্ন। প্রকৌশলীরা যদি মহাকাশযানের অবস্থা নিয়ে পুরোপুরি সন্তুষ্ট না হন, তবে এই বার্ন বাতিল করে নভোচারীদের পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা হতে পারে।
মহাকাশে যাত্রা করার পর থেকে নভোচারীরা ছোটখাটো কিছু সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল মহাকাশযানের টয়লেট বা বর্জ্যব্যবস্থাপনা পদ্ধতি নিয়ে ঝামেলা। নাসা নিশ্চিত করেছে যে, টয়লেটের সেন্সরগুলো কিছু অস্বাভাবিক তথ্য দিচ্ছিল। তবে নভোচারী ক্রিস্টিনা কচ এ সমস্যা সমাধানে কাজ করেছেন এবং বর্তমানে টয়লেটটি ব্যবহারের উপযোগী রয়েছে। এ ছাড়া একটি পানির ট্যাংক ভালভ বন্ধ হয়ে যায়, যা উৎক্ষেপণের ঝাঁকুনিতে হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মহাকাশযানের ইলেকট্রনিক্স ব্যবস্থায় খুব সামান্য বিচ্যুতি দেখা দিলেও তা মিশনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ নয় বলে নাসা জানিয়েছে।
মহাকাশে নভোচারীদের জীবনযাপন মোটেও সহজ নয়। ওরিয়ন ক্যাপসুলের ভেতরে তাদের প্রতিটি কাজ পূর্বনির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী করতে হয়। শোয়ার জন্য তাদের দেয়ালের সঙ্গে লাগানো স্লিপিং ব্যাগে নিজেদের আটকে রাখতে হয়। নভোচারী স্টিফেন বোয়েন জানিয়েছেন, মহাকাশে ভেসে থাকার অনুভূতি কখনো পুরোনো হয় না। সেখানে কান্নার জল চোখ থেকে নিচে পড়ে না, বরং চোখের ভেতরে জমা হয়ে থাকে। নভোচারীরা বর্তমানে মহাকাশযানের ভেতরে ব্যায়াম, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা এবং যানের রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করছেন। ওরিয়ন ক্যাপসুলটি বর্তমানে অন্য একটি বস্তুর খুব কাছ দিয়ে ওড়ার মহড়া দিচ্ছে, যাকে বলা হয় ‘প্রক্সিমিটি অপারেশনস’। এটি ভবিষ্যতে অন্য কোনো মহাকাশযানের সঙ্গে ডকিং বা যুক্ত হওয়ার দক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করবে।
এ মিশনের একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে বিজ্ঞান গবেষণা। গভীর মহাকাশ ভ্রমণ মানুষের শরীর ও মনের ওপর কেমন প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে গবেষণা চালানো হচ্ছে। ‘অ্যাভাটার’ নামে একটি পরীক্ষার মাধ্যমে তেজস্ক্রিয়তা ও অতি-ক্ষুদ্র মহাকর্ষ বল মানুষের স্বাস্থ্যের কী ক্ষতি করে, তা দেখা হবে। এ তথ্যগুলো ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহে মানুষের ভ্রমণের ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হবে। এ ছাড়া নভোচারীরা চাঁদের পৃষ্ঠের বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য যেমন জ্বালামুখ ও প্রাচীন লাভার প্রবাহের ছবি তুলবেন।
আর্টেমিস-২ মিশনের কন্ট্রোল রুম এখন অনেক আধুনিক। অ্যাপোলো মিশনের সময়কার বড় বড় কনসোল এখন বদলে গিয়ে পাতলা স্ক্রিন ও আধুনিক কম্পিউটারে রূপ নিয়েছে। তবে কাজের ধরন আগের মতো রয়ে গেছে। বর্তমানে নয়জন ফ্লাইট ডিরেক্টরের একটি দল এ মিশনটি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছেন। নভোচারীদের পরিবারের সদস্যরাও কেনেডি স্পেস সেন্টারে উপস্থিত ছিলেন। সফল উৎক্ষেপণের পর তারা স্বস্তি প্রকাশ করলেও মিশন শেষ করে নিরাপদে ফিরে না আসা পর্যন্ত উৎকণ্ঠা কাটছে না।
নাসা আশা করছে, এ মিশনের মাধ্যমে মহাকাশ গবেষণার এক নতুন যুগের সূচনা হবে। ওরিয়ন মহাকাশযানটি যদি ১০ দিনের এ সফর সফলভাবে শেষ করতে পারে, তবে তা ২০২৬ সালের পরবর্তী মাসগুলোতে আরও বড় বড় মিশনের পথ খুলে দেবে। এটি কেবল একটি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নয়, বরং মানবজাতির অজানাকে জানার এক নিরন্তর প্রচেষ্টার অংশ। আর্টেমিস-২ এর মাধ্যমে আমরা আবারও চাঁদের খুব কাছে পৌঁছাতে যাচ্ছি, যা আগামী দিনে মঙ্গল জয়ের স্বপ্নকেও বাস্তবে রূপ দিতে সহায়তা করবে।


