মহাকাশে আর্টেমিস-২ অভিযানের চার নভোচারীর শুরুর দিনগুলো বেশ স্বস্তিদায়ক ছিল। উড্ডয়নকালীন বড় কোনো সংকট তাদের মানসিক শান্তিতে বিঘ্ন ঘটাতে পারেনি। তবে ১৬ দশমিক ৫ ফুট চওড়া ওরিয়ন ক্যাপসুলের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি বা টয়লেট নিয়ে তৈরি হয় ভিন্ন এক বিড়ম্বনা।
উড্ডয়নের তৃতীয় দিনের শেষ ভাগে গত শনিবার ভোরে এই সমস্যা প্রথম ধরা পড়ে।
আর্টেমিস-২-এর ফ্লাইট ডিরেক্টর জাড ফ্রিলিং সাংবাদিকদের জানান, টয়লেট থেকে বর্জ্য নিষ্কাশনে সমস্যা হচ্ছিল। ইঞ্জিনিয়ারদের ধারণা ছিল, ভেন্ট লাইনে সম্ভবত মূত্র জমাট বেঁধে এই প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। ওই সময় নাসার রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কোচ ও জেরেমি হ্যানসেন পৃথিবী থেকে প্রায় ২ লাখ মাইল দূরে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন।
মিশন কন্ট্রোল দ্রুত একটি কর্মপরিকল্পনা সাজায়। তারা ক্যাপসুলটিকে মহাকাশে এমনভাবে ঘুরিয়ে দেন যাতে সূর্যের আলো সরাসরি হিমায়িত ভেন্ট লাইনের ওপর পড়ে। সূর্যের তাপে লাইনটি গরম হওয়ার পর জমাট বরফ গলতে শুরু করে। এতে ময়লার ঝুড়ির আকারের ট্যাঙ্ক থেকে কিছু বর্জ্য মহাকাশের শূন্যতায় নির্গত করা সম্ভব হয়।
শনিবার বিকেলে জানানো হয়, টয়লেটটি ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত। তবে প্রাথমিক নির্দেশে বলা হয় এটি ‘শুধুমাত্র মলত্যাগের জন্য’ ব্যবহার করা যাবে। দিনভর মেরামতের পর মধ্যরাতে মিশন কন্ট্রোলের জ্যাকি মাহাফি সুখবর দেন।
তিনি জানান, এখন থেকে সব ধরনের কাজে টয়লেটটি ব্যবহারযোগ্য। এই খবরে নভোচারী ক্রিস্টিনা কোচ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। তিনি জানান, পুরো ক্রু দল এই ঘোষণায় অত্যন্ত আনন্দিত।
ক্যাপসুলের বাইরে মূত্র ত্যাগের প্রক্রিয়াটি ছিল অভাবনীয়। ক্রিস্টিনা কোচ ক্যামেরায় দেখান, ওরিয়নের জানালার পাশ দিয়ে তীব্র বেগে ছুটে যাওয়ার সময় মূত্র উজ্জ্বল রত্নের মতো মহাকাশে ঝরে পড়ছে। তবে কেবল হিমায়িত লাইনই নয়, অভিযানের শুরুতেই টয়লেটের পাম্প নিয়ে সমস্যা দেখা দিয়েছিল।
গত বুধবার ফ্লোরিডার নাসা কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে উড্ডয়নের পরেই জানা যায় পাম্প কাজ করছে না। মহাকাশে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি না থাকায় শরীর থেকে বর্জ্য বের করতে পাম্পের ভূমিকা অপরিসীম।
তদন্তে দেখা যায়, কর্মীরা পাম্প চালু করতে পর্যাপ্ত পানি দেননি। এটি ছিল একটি ছোট ভুল। পর্যাপ্ত পানি দেওয়ার পর সিস্টেমটি দ্রুত সচল হয়।
বৃহস্পতিবার এক ভার্চুয়াল সাক্ষাৎকারে নভোচারীরা এই বিজয় উদযাপন করেন। ক্রিস্টিনা কোচ কৌতুক করে নিজেকে ‘স্পেস প্লাম্বার’ হিসেবে পরিচয় দেন।
তিনি বলেন, ‘টয়লেট ঠিক হওয়ার পর আমরা সবাই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছি। আমরা ভেবেছিলাম হয়তো কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিয়েছে।’ আরাম-আয়েশপ্রিয় নভোচারীদের কাছে মহাকাশযানের সবচেয়ে প্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হলো এই শৌচাগার।
বর্তমান সময়ের আধুনিক শৌচাগারের তুলনায় অতীতের অবস্থা ছিল ভয়াবহ। ওরিয়ন টয়লেট বিকল থাকা অবস্থায় নভোচারীদের বিকল্প হিসেবে সিসিইউ বা ‘কোল্যাপসেবল কন্টিনজেন্সি ইউরিনাল’ নামে ব্যাগ পদ্ধতির ওপর নির্ভর করতে হয়েছিল। এটি মূলত অ্যাপোলো যুগের একটি আদিম কৌশল। ১৯৬০-এর দশকে অ্যাপোলো অভিযানে কোনো নির্দিষ্ট শৌচাগার ছিল না। নভোচারীরা মলমূত্র ত্যাগের জন্য প্লাস্টিকের ব্যাগের ওপর নির্ভর করতেন।
১৯৬৯ সালের অ্যাপোলো ১০ অভিযানের এক গোপন নথিতে দেখা যায়, অভিযানের ষষ্ঠ দিনে কেবিনের ভেতর মানুষের বিষ্ঠার টুকরো ভাসছিল। নভোচারী টমাস স্ট্যাফোর্ড ও ইউজিন সারনান এই পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে চরম বিরক্ত হয়েছিলেন। তারা দ্রুত ন্যাপকিন দিয়ে সেই বর্জ্য পরিষ্কারের চেষ্টা করেন।
২০০৭ সালের নাসার একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই ব্যাগ পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত ‘অরুচিকর’। ছোট ক্যাপসুলের ভেতরে ব্যাগে ভরা বর্জ্যের উৎকট গন্ধ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব ছিল না।
শুধু অ্যাপোলো নয়, আধুনিক স্পেসএক্স ক্রু ড্রাগন ক্যাপসুলেও স্বাস্থ্যবিধিসংক্রান্ত জটিলতা দেখা দেয়। ২০২১ সালে উড্ডয়নকালে মূত্র পরিবহনের নল খুলে গিয়ে ক্যাপসুলের মেঝের নিচে চুইয়ে পড়েছিল। সেই সময় নভোচারীদের বিকল্প হিসেবে বড়দের ডায়াপারের ওপর নির্ভর করতে হয়।
বর্তমান নাসা প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যানও তার ব্যক্তিগত মহাকাশ ভ্রমণে একই ধরনের টয়লেট সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিলেন।
আর্টেমিস-২ মিশনে ব্যবহৃত বর্তমান শৌচাগারটি কয়েক দশকের অভিজ্ঞতার ফসল। এটি ইউনিভার্সাল ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (ইউডব্লিউএমএস) নামে পরিচিত। কলিন্স অ্যারোস্পেস ৩০ মিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তির আওতায় এটি তৈরি করেছে। এই পদ্ধতিতে তরল বর্জ্য বাইরে ফেলে দেওয়া হয় এবং কঠিন বর্জ্য সংকুচিত করে পৃথিবীতে ফেরত আনা হয়।
সাবেক নভোচারী মাইক মাসিমিনো বলেন, মহাকাশের টয়লেট ব্যবহার করা একটি বড় দায়িত্ব। কেবিনের পরিবেশ ও সহযাত্রীদের সুস্থতার কথা ভেবে ব্যবহারের পর প্রতিটি অংশ নিখুঁতভাবে পরিষ্কার রাখা জরুরি। ওরিয়ন ক্রুরা এখন সেই দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে তাদের দীর্ঘ যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সূত্র: সিএনএন


