মহাকাশ জয়ের নতুন এক ইতিহাস গড়ে পৃথিবীতে ফিরেছেন আর্টেমিস-২ মিশনের চার নভোচারী। চাঁদে যাওয়ার দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে রেকর্ড গড়া এই সফর শেষে গত শনিবার টেক্সাসের হিউস্টনে অবস্থিত নাসার জনসন স্পেস সেন্টারে তাদের রাজকীয় সংবর্ধনা দেওয়া হয়। গভীর মহাকাশে দীর্ঘতম পথ পাড়ি দেওয়ার অনন্য নজির স্থাপন করে এই নভোচারী দল এখন বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হচ্ছেন।
অভিযান শেষে ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগো উপকূলে তাদের বহনকারী ওরিয়ন ক্যাপসুলটি প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করে। সেখান থেকে বিমানে করে গত শনিবার হিউস্টনের এলিংটন ফিল্ডে পৌঁছান তারা। চার নভোচারী কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান, পাইলট ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কচ এবং কানাডার জেরেমি হ্যানসেনকে স্বাগত জানাতে সেখানে উপস্থিত ছিলেন শত শত মানুষ। নাসার প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান তাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সময় উপস্থিত সুধীবৃন্দ দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানান।
এই বীরোচিত প্রত্যাবর্তনটি ছিল বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। যে দিনটিতে তারা হিউস্টনে ফিরেছেন, সেটি ছিল অ্যাপোলো-১৩ মিশনের ৫৬তম বার্ষিকী। কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান আবেগের সঙ্গে বলেন, ‘মহাকাশে যাওয়ার আগে মনে হয় এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। কিন্তু যখন আপনি সেখানে থাকবেন, তখন কেবল পরিবার আর বন্ধুদের কাছে ফেরার তীব্র আকাঙ্ক্ষা কাজ করে। পৃথিবীতে জন্ম নেওয়া সত্যিই বিশেষ কিছু।’
প্রায় ১০ দিনের এই মিশনে আর্টেমিস-২ নভোচারীরা মহাকাশের এমন গভীরে গিয়েছিলেন, যেখানে এর আগে কোনো মানুষ পৌঁছাতে পারেনি। তারা পৃথিবী থেকে সর্বোচ্চ ২ লাখ ৫২ হাজার ৭৫৬ মাইল (৪ লাখ ৬ হাজার ৭৭১ কিলোমিটার) দূরে ভ্রমণ করে অ্যাপোলো-১৩-এর গড়া দূরত্বের রেকর্ড ভেঙে দিয়েছেন। এই যাত্রায় তারা চাঁদের উল্টো পিঠের এমন কিছু দৃশ্য প্রথমবার সরাসরি দেখেছেন, যা আগে মানুষের চোখে পড়েনি। পূর্ণ সূর্যগ্রহণ মহাকাশে তাদের অভিজ্ঞতায় এক নতুন মাত্রা যোগ করে।
মিশন চলাকালে ক্রিস্টিনা কচ চাঁদের দিগন্তে পৃথিবীর অস্ত যাওয়ার একটি অসাধারণ ছবি তুলেছেন। ১৯৬৮ সালে অ্যাপোলো-৮ মিশনের তোলা বিখ্যাত ‘আর্থরাইজ’ ছবির স্মৃতি মনে করিয়ে দেয় এই ছবিটি। ক্রিস্টিনা বলেন, ‘মহাকাশের বিশাল অন্ধকারের মাঝে আমাদের নীল পৃথিবীটা ছিল যেন এক শান্ত জীবনতরী।’ তবে সফলতার পাশাপাশি তাদের কিছু ছোটখাটো সমস্যারও মোকাবিলা করতে হয়েছে। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে মহাকাশযানের শৌচাগারটি অকেজো হয়ে গিয়েছিল। নাসা জানিয়েছে, পরবর্তী দীর্ঘমেয়াদি চন্দ্রাভিযানের আগে নকশায় এই ত্রুটি সংশোধন করা হবে।
১৯৭২ সালের অ্যাপোলো-১৭ মিশনের পর এই প্রথম কোনো মানুষ চাঁদের পথে পাড়ি জমালো। আর্টেমিস-২ মিশনের এই সাফল্য নাসার পরবর্তী বড় প্রকল্পগুলোর জন্য পথ প্রশস্ত করেছে। আগামী বছর আর্টেমিস-৩ মিশনে নভোচারীরা পৃথিবীর কক্ষপথে লুনার ল্যান্ডারের সঙ্গে ওরিয়ন ক্যাপসুলের ডকিং বা সংযোগ স্থাপনের মহড়া দেবেন। আর সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৮ সালে আর্টেমিস-৪ মিশনের মাধ্যমে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে আবারও মানুষের পদচিহ্ন পড়বে। জ্যারেড আইজ্যাকম্যানের ভাষায়, ৫৩ বছরের দীর্ঘ বিরতি শেষে মহাকাশ জয়ের মহোৎসব আবারও শুরু হলো। সূত্র: বিবিসি


