আলাস্কা উপসাগরের তলদেশ। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩ হাজার ২৫০ মিটার গভীরে। সূর্যের এক চিলতে আলোও সেখানে পৌঁছাতে পারে না। অজানাকে জানতে সেই নিকষ অন্ধকার ভেদ করে এগিয়ে যাচ্ছিল রিমোট কন্ট্রোল যান ‘ডিপ ডিসকভারার’। এর উজ্জ্বল আলোয় হঠাৎ চকচক করে ওঠে একটি বস্তু। পাথরের গায়ে শক্তভাবে লেগে ছিল সোনালি রঙের মসৃণ এক গোলক।
রহস্যময় সেই বস্তু দেখে বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গিয়েছিলেন বিজ্ঞানীরা। ২০২৩ সালের সেই অভিযান চলাকালীন লাইভস্ট্রিমে এক গবেষককে বলতে শোনা গিয়েছিল, ‘এটা নিয়ে কী বলব, আমি বুঝতে পারছি না।’ কেউ কেউ চিন্তা করতে শুরু করেন—এটি হয়তো ভিনগ্রহের কোনো প্রাণের অস্তিত্ব, অথবা কোনো সমুদ্রদানবের ডিমের খোলস। অবশেষে তিন বছর পর সেই রোমাঞ্চকর রহস্যের সমাধান মিলেছে।
আবিষ্কারের সময় গোলকটির এক পাশে একটি ছিদ্র দেখা গিয়েছিল। তা দেখে অভিযানের এক বিজ্ঞানী রসিকতা করে বলেছিলেন, ‘আশা করি যখন আমরা এটাকে নাড়া দেব, ভেতর থেকে কিছু একটা বেরিয়ে আসবে না। এটি অনেকটা হরর মুভির শুরুর মতো!’ গবেষকরা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে রোবোটিক বাহু ব্যবহার করে নমুনাটি সংগ্রহ করেন। ল্যাবরেটরিতে নেওয়ার পর শুরু হয় দীর্ঘ তদন্ত। প্রাথমিকভাবে একে মৃত স্পঞ্জ বা প্রবাল ভাবা হলেও আসল রহস্য ছিল আরও গভীরে। যুক্তরাষ্ট্রে নোয়া (ন্যাশনাল অসিন অ্যান্ড অ্যাটমোসফেয়ার অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) ফিশারিজের প্রাণিবিজ্ঞানী অ্যালেন কলিন্স জানান, এটি কোনো সাধারণ কেস ছিল না। এর রহস্য উন্মোচনে জেনেটিক্স, অঙ্গসংস্থানিক এবং বায়োইনফরমেটিক্স—সব ধরনের দক্ষতার সমন্বয় ঘটাতে হয়েছে।
গবেষকরা গোলকটির টিস্যু বিশ্লেষণ করে ‘নাইডোসাইট’ নামক দংশক কোষের সন্ধান পান, যা সাধারণত অ্যানিমোন বা প্রবালের শরীরে থাকে। দংশক কোষ হলো দেহত্বকে অবস্থিত এক বিশেষ ধরনের আত্মরক্ষামূলক ও শিকারি কোষ। যেমন- হাইড্রা, জেলিফিশ।
ব্যাপক বিশ্লেষণ ও ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করা হয় বস্তুটির আসল পরিচয়। রহস্যময় এই গোলকটি ছিল মূলত ‘গ্লোরিয়াস সি অ্যানিমোন’ (রেলিক্যানথাস ড্যাফনি পর্বের) নামক একটি প্রাণীর শরীর থেকে খসে পড়া চামড়া বা ‘কিউটিকেল’। এই অ্যানিমোনগুলো বিশালাকার হতে পারে, যাদের কর্ষিকাগুলো প্রায় ২ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। সমুদ্রতলে চলাচলের সময় বা বংশবিস্তারের চেষ্টায় এই প্রাণীটি তার শরীরের বাইরের একটি স্তর বা আবরণ রেখে যায়। কাইটিন নামক উপাদানে তৈরি এই আবরণটিই সমুদ্রের স্রোতে এবং চাপে গোলক আকৃতি ধারণ করে পাথরের গায়ে আটকে ছিল।
বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এই সোনালি গোলকটি সম্ভবত ‘পেডাল ল্যাসারেশন’ নামক এক বিশেষ প্রক্রিয়ার অবশিষ্টাংশ। এটি এমন এক পদ্ধতি, যেখানে প্রাণীটি তার শরীরের একটি অংশ ফেলে রেখে চলে যায় এবং সেই পরিত্যক্ত অংশটি থেকে পরে একটি নতুন পলিপ বা প্রাণের জন্ম হয়।
তবে এই পরিত্যক্ত ‘চামড়া’ কেবল একটি ফেলে দেওয়া অংশ নয়। গভীর সমুদ্রের প্রতিকূল পরিবেশে এটি অণুজীবদের জন্য এক বিশাল ভোজের আসর। কিউটিকেলের গায়ে প্রচুর পরিমাণে অণুজীবের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, এটি সমুদ্রের নাইট্রোজেন চক্র বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অর্থাৎ একটি প্রাণীর ফেলে দেওয়া অংশ গভীর সমুদ্রের অন্যান্য ক্ষুদ্র প্রাণের জীবন বাঁচাতে সাহায্য করছে।
নোয়া ওশেন এক্সপ্লোরেশনের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ক্যাপ্টেন উইলিয়াম মাউইট এই আবিষ্কারের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, ‘এ কারণেই আমরা অনুসন্ধান চালিয়ে যাই। গভীর সমুদ্রের রহস্যগুলো উন্মোচন করা কেবল কৌতূহল মেটানো নয়, বরং আমাদের গ্রহের বাস্তুসংস্থান এবং সম্পদ সম্পর্কে আরও উন্নত ধারণা পাওয়ার একটি পথ।’ সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, সায়েন্স অ্যালার্ট


