ঐতিহাসিক তেলিয়াপাড়া দিবস ৪ এপ্রিল । খবরের কাগজ
ঢাকা ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, সোমবার, ২০ মে ২০২৪

ঐতিহাসিক তেলিয়াপাড়া দিবস ৪ এপ্রিল

প্রকাশ: ০৪ এপ্রিল ২০২৪, ০৩:০৩ পিএম
ঐতিহাসিক তেলিয়াপাড়া দিবস ৪ এপ্রিল
তেলিয়াপাড়া চা বাগানের ম্যানেজার বাংলোর পাশে নির্মিত বুলেট আকৃতির মুক্তিযুদ্ধের প্রথম স্মৃতিসৌধ। ছবি: খবরের কাগজ

আজ ৪ এপ্রিল, ঐতিহাসিক তেলিয়াপাড়া দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার তেলিয়াপাড়া চা বাগান ম্যানেজার বাংলোতে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

এ বৈঠকেই দেশকে স্বাধীন করার শপথ ও রণকৌশল তৈরি হয়। এ বৈঠকেই অস্ত্রের জোগান ও আন্তর্জাতিক সমর্থনসহ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনকে ভাগ করা হয় ১১টি সেক্টর ও তিনটি ব্রিগেডে। 

ওই দিনের বৈঠকে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ঊর্ধ্বতন ২৭ সেনা কর্মকর্তার মধ্যে উপস্থিত ছিলেন- মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক আতাউল গণি ওসমানী, তৎকালীন মেজর সি আর দত্ত, মেজর জিয়াউর রহামন, কর্নেল এম এ রব, রব্বানী, ক্যাপ্টেন নাসিম, আব্দুল মতিন, মেজর খালেদ মোশাররফ, কমান্ডেন্ট মানিক চৌধুরী, ভারতের ব্রিগেডিয়ার শুভ্রমানিয়ম ও মেজর কে এম শফিউল্লাহ প্রমুখ।

শপথগ্রহণের পর এম এ জি ওসমানী নিজের পিস্তল থেকে ফাঁকা গুলি ছুড়ে যুদ্ধের আনুষ্ঠানিকতা করেন।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শহিদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে তেলিয়াপাড়া চা বাগানের ম্যানেজার বাংলোর পাশে নির্মিত হয় বুলেট আকৃতির মুক্তিযুদ্ধের প্রথম স্মৃতিসৌধ। ১৯৭৫ সালের জুন মাসে এ স্মৃতিসৌধের উদ্বোধন করেন সেনাপ্রধান (অব.) মেজর জেনারেল শফিউল্লাহ বীর উত্তম।

দীর্ঘদিন ধরে ওই স্থানটিকে সংরক্ষণ ও চা বাগান বাংলোতে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন মুক্তিযোদ্ধা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। এমনকি ২০১১ সালের ৭ মে মুক্তিযোদ্ধাদের এক সমাবেশে সেখানে ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়। কিন্তু এখনো এই প্রকল্প আলোর মুখ না দেখায় হতাশ মুক্তিযোদ্ধারা।

এ ব্যাপারে বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা রফিক বলেন, ‘তেলিয়াপাড়া চা বাগান বাংলো মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম ঐতিহাসিক স্থান। এখান থেকে মূলত মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়। কিন্তু স্বাধীনতার এত বছর পরও ওই স্থানটিকে সংরক্ষণ করা হয়নি। বিষয়টি আমাদের জন্য খুবই দুঃখজনক বিষয়।’

পরিবেশ ও সংস্কৃতিকর্মী তোফাজ্জল সোহেল বলেন, ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তেলিয়াপাড়া চা বাগানের বাংলোটি একটি অন্যতম ঐতিহাসিক স্থান। কিন্তু দুঃখের বিষয়, স্বাধীনতার পর ৫৩ বছর পেরিয়ে গেলেও বাংলোটিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেনি কোনো স্মৃতি জাদুঘর।’

তিনি বলেন, ‘ওই সময়ে বাংলোতে ব্যবহৃত আসবাবপত্র, ফাইলপত্র এবং অন্যান্য সামগ্রী যথাযথ সংরক্ষণ/ সংগ্রহ করে তেলিয়াপাড়া বাংলোটিকে এখনো মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি জাদুঘরে পরিণত করা সম্ভব। এর মাধ্যমে আগামী প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের এক গৌরবতম ইতিহাস সম্পর্কে জানার সুযোগ পাবে।’

কাজল সরকার/ইসরাত চৈতী/অমিয়/

গণহত্যার সাক্ষী ভাড়াউড়া বধ্যভূমি

প্রকাশ: ০১ মে ২০২৪, ০৩:১৭ পিএম
গণহত্যার সাক্ষী ভাড়াউড়া বধ্যভূমি
শ্রীমঙ্গলের ভাড়াউড়া বধ্যভূমি। ছবি: খবরের কাগজ

‘১৯৭১ সালের ১ মে অর্থাৎ মে দিবস। শনিবার সকাল, দেশে তখন পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে চলছে স্বাধীনতা সংগ্রাম। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে দেশজুড়ে। শ্রীমঙ্গল শহরও বাদ যায়নি সেই নারকীয় বর্বরতা থেকে, এখানেও ঘাঁটি গাড়ে হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা।

শ্রীমঙ্গল চা বাগান অধ্যুষিত হওয়ায় এদিকেই বেশি নজর ছিল পাকবাহিনী ও তাদের দোসরদের। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তখন বন্ধ ছিল চা বাগানের সব কার্যক্রম।

এর মধ্যেই সকাল ১০টার দিকে শহরতলীর আউট সিগন্যালের দিক থেকে ভাড়াউড়া চা বাগানের দক্ষিণ দিকে প্রবেশ করে ৫-৬ জন পাক সেনা, তাদের সঙ্গে ছিল এলাকার দফাদার (গ্রাম পুলিশ)। তারা এসেই বাগানের সব পুরুষকে একটি স্থানে মিলিত হতে বলে। পাক সেনারা আমাদের সঙ্গে কথা বলবে বলে জানায়। গ্রাম পুলিশরা জোর করে বাগানের পশ্চিম দিকের একটি স্থানে সবাইকে জড়ো করে। চা শ্রমিকরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই ব্রাশফায়ার করে পাক সেনারা। গুলি থামলে বাগানের অন্যরাসহ আমরা সেখানে যাই, গিয়ে দেখি পুরো এলাকা রক্তে লাল হয়ে আছে। একজনের ওপর আরেকজনের লাশ, আমার বাবাও ছিলেন সেই লাশের কাতারে। আমি আর মা মিলে বাবাকে লাশের স্তূপ থেকে টেনে বের করি। তখনো তিনি বেঁচে ছিলেন। কোনো রকমে তাকে বাড়িতে নিয়ে আসি। বাড়িতে নিয়ে আসার পর তিনি মারা যান। সেদিন আমার বাবার সঙ্গে আরও প্রায় ৫০ জন চা-শ্রমিক নিহত হন এই ভাড়াউড়া বধ্যভূমিতে।

আজও যখন এই বধ্যভূমির সামনে দিয়ে যখন যাই তখন একাত্তরের সেই রক্তাক্ত স্মৃতিগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কত লাশ! কত রক্তের সাক্ষী এই বধ্যভূমি, একটি স্বাধীন দেশমাতৃকার আশায় কত ত্যাগ আমাদের স্বীকার করতে হয়েছে।’

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের ভাড়াউড়া বধ্যভূমির সামনে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলছিলেন ভাড়াউড়া চা বাগানের বাসিন্দা ভানু হাজরা।


১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভানু হাজরা ১৩ বছর বয়সী কিশোরী। আজো চোখের সামনে দগদগে সেইসব স্মৃতি ভেসে উঠে তার।

তিনি বলেন, ‘সেদিন চা বাগানের প্রবেশপথে আরও দুইজনকে গুলি করে হত্যা করেছিল পাক সেনারা, কিন্তু বাগানের কেউ সেটা আগে জানতে পারেনি। আগে জানতে পারলে মাত্র ৫-৬ জন পাকিস্তানি সেনা একসঙ্গে এতগুলো নিরপরাধ শ্রমিককে মারতে পারতো না।’

ভাড়াউড়া বধ্যভূমিতে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে শহিদদের স্মৃতির রক্ষার্থে নির্মাণ করা হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ, পাশেই একটি নামফলকে লেখা আছে শহিদ চা-শ্রমিকদের নাম।

সেদিন পাকবাহিনীর গুলিতে মারা যান- হুসেনিয়া হাজরা, মাংগুয়া হাজরা, ফাগু হাজরা, হিংরাজ হাজরা, কৃষ্ণ হাজরা, চিনিলাল হাজরা, শরজুয়া হাজরা, টিমা হাজরা, শানিচড়া হাজরা, মহারাজ হাজরা, নুনু লাল হাজরা, নকুলা হাজরা, রামলাল হাজারা, জগো হাজরা, বিশ্বম্বর হাজরা, হিরচুয়া হাজরা, শিবমুরা হাজরা, জুহিয়া হাজরা, চুন্মি হাজরা, অমৃত হাজরা, বিরবলি হাজরা, রামদেও হাজরা, হরপুয়া হাজরা, জোচনা হাজরা, রাজকুমার মাল, হরিকুমার হাজরা, রামছুরক হাজরা, গুরুয়া হাজরা, ফেরচুয়া গৌড় , রামকৃষ্ণ গৌড়, রামচরন গৌড়, গবিনা গৌড়, ইন্দ্র ভূঁইয়া, চৈতু ভূইয়া, আগ্না ভূঁইয়া, ডমরুচান্দ তুরিয়া, মাংরা তুরিয়া, ব্রজ নারায়ন গোয়ালা, হোল্লা গোয়ালা, রামলাল মাল, খুদিরাম হাজরা, রাজকুমার মাল, ডুকুয়া তেলি, গংগা বারই, জগদেও কাহার, গংগা কুর্মী, সম মাঝি, কালাচান্দ ঘাটুয়ার, সুখনন্দন রিকিয়াসন, বকই রেলী, শিব মুন্ডা।

আহত হয়েছিলেন কেদার লাল হাজরা, গোলাপ চান্দ হাজরা, রামদাড়ী হাজরা, জুবায়ের হাজরা, চিনিয়া হাজরা, কর্মা হাজরা, ডিকুয়া হাজরা, কাইলা হাজরা, বাংসিং তুরিয়াসহ অনেকে।

শ্রীমঙ্গল ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক কবি ও লেখক দ্বীপেন্দ্র ভট্টাচার্যের লেখা ‘ফিরে দেখা’ বইয়ে এই বধ্যভূমিতে চা-শ্রমিকদের নির্মমভাবে হত্যার ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে।

সেখানে তিনি লিখেছেন, পাকবাহিনীর শ্রীমঙ্গল দখল, ১৯৭১ সালের ২৭ এপ্রিল পাক বিমান বাহিনী শ্রীমঙ্গলে শেলিং করে। পরে ৩০ এপ্রিল দুপুর ১১টা-১২টার দিকে পাক বিমানবাহিনী শ্রীমঙ্গলে প্রবেশ করে। ২৭ এপ্রিলের শেলিং এ শ্রীমঙ্গলের দুইজন নিহত ও একজন আহত হন। নিহত দুইজনের একজন গৌরাঙ্গ মল্লিক ও অপরজন বাসাবাড়িতে কাজ করার এক নারী। ৩০ এপ্রিল শ্রীমঙ্গলে আস্তানা করার পর প্রবেশের পরদিন পহেলা মে পাকবাহিনী তাদের তাণ্ডবলীলা শুরু করে। শহরের পার্শ্ববর্তী ভাড়াউড়া চা বাগানে বহু চা-শ্রমিককে একসঙ্গে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করে। এ নির্মম হত্যাকাণ্ড স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে শ্রীমঙ্গলের এক মর্মান্তিক ঘটনা।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক ও ভাড়াউড়া বধ্যভূমিতে নিহত হওয়া ফাগু হাজরার ছেলে বিজয় হাজরা বলেন, ‘ওইদিনের ঘটনার পর সব লাশ একসঙ্গে জড়ো করে মাটিচাপা দেওয়া হয় এবং আমরা চা বাগান ছেড়ে প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে যাই। মুক্তিযুদ্ধের পর মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের কর্মকর্তারা এসে এখানের মাটি খুঁড়ে মাথার খুলি গণনা করেন।’

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘চা-শ্রমিকদের ওপর পাক হানাদার বাহিনীর এই নির্মম গণহত্যাকাণ্ডের জায়গাটি এক প্রকার অবহেলিতই বলা চলে। এখানে যারা মারা গিয়েছিলেন তাদের নাম উল্লেখ করে আমি নিজ উদ্যোগে এখানে একটি নামফলক করেছি। সরকারের কাছে আবেদন এই বধ্যভূমির মর্মান্তিক ঘটনা তুলে ধরে এখানে একটি ভাস্কর্য করে দেওয়া হোক। যাতে এই প্রজন্মের সবাই জানতে পারে আমরা সেদিন কতটুকু নির্মমতার শিকার হয়েছিলাম পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দ্বারা।’

হৃদয় শুভ/ইসরাত চৈতী/

ঐতিহাসিক তেলিয়াপাড়া দিবস ৪ এপ্রিল

প্রকাশ: ০৪ এপ্রিল ২০২৪, ০৩:০৩ পিএম
ঐতিহাসিক তেলিয়াপাড়া দিবস ৪ এপ্রিল
তেলিয়াপাড়া চা বাগানের ম্যানেজার বাংলোর পাশে নির্মিত বুলেট আকৃতির মুক্তিযুদ্ধের প্রথম স্মৃতিসৌধ। ছবি: খবরের কাগজ

আজ ৪ এপ্রিল, ঐতিহাসিক তেলিয়াপাড়া দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার তেলিয়াপাড়া চা বাগান ম্যানেজার বাংলোতে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

এ বৈঠকেই দেশকে স্বাধীন করার শপথ ও রণকৌশল তৈরি হয়। এ বৈঠকেই অস্ত্রের জোগান ও আন্তর্জাতিক সমর্থনসহ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনকে ভাগ করা হয় ১১টি সেক্টর ও তিনটি ব্রিগেডে। 

ওই দিনের বৈঠকে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ঊর্ধ্বতন ২৭ সেনা কর্মকর্তার মধ্যে উপস্থিত ছিলেন- মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক আতাউল গণি ওসমানী, তৎকালীন মেজর সি আর দত্ত, মেজর জিয়াউর রহামন, কর্নেল এম এ রব, রব্বানী, ক্যাপ্টেন নাসিম, আব্দুল মতিন, মেজর খালেদ মোশাররফ, কমান্ডেন্ট মানিক চৌধুরী, ভারতের ব্রিগেডিয়ার শুভ্রমানিয়ম ও মেজর কে এম শফিউল্লাহ প্রমুখ।

শপথগ্রহণের পর এম এ জি ওসমানী নিজের পিস্তল থেকে ফাঁকা গুলি ছুড়ে যুদ্ধের আনুষ্ঠানিকতা করেন।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শহিদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে তেলিয়াপাড়া চা বাগানের ম্যানেজার বাংলোর পাশে নির্মিত হয় বুলেট আকৃতির মুক্তিযুদ্ধের প্রথম স্মৃতিসৌধ। ১৯৭৫ সালের জুন মাসে এ স্মৃতিসৌধের উদ্বোধন করেন সেনাপ্রধান (অব.) মেজর জেনারেল শফিউল্লাহ বীর উত্তম।

দীর্ঘদিন ধরে ওই স্থানটিকে সংরক্ষণ ও চা বাগান বাংলোতে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন মুক্তিযোদ্ধা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। এমনকি ২০১১ সালের ৭ মে মুক্তিযোদ্ধাদের এক সমাবেশে সেখানে ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়। কিন্তু এখনো এই প্রকল্প আলোর মুখ না দেখায় হতাশ মুক্তিযোদ্ধারা।

এ ব্যাপারে বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা রফিক বলেন, ‘তেলিয়াপাড়া চা বাগান বাংলো মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম ঐতিহাসিক স্থান। এখান থেকে মূলত মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়। কিন্তু স্বাধীনতার এত বছর পরও ওই স্থানটিকে সংরক্ষণ করা হয়নি। বিষয়টি আমাদের জন্য খুবই দুঃখজনক বিষয়।’

পরিবেশ ও সংস্কৃতিকর্মী তোফাজ্জল সোহেল বলেন, ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তেলিয়াপাড়া চা বাগানের বাংলোটি একটি অন্যতম ঐতিহাসিক স্থান। কিন্তু দুঃখের বিষয়, স্বাধীনতার পর ৫৩ বছর পেরিয়ে গেলেও বাংলোটিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেনি কোনো স্মৃতি জাদুঘর।’

তিনি বলেন, ‘ওই সময়ে বাংলোতে ব্যবহৃত আসবাবপত্র, ফাইলপত্র এবং অন্যান্য সামগ্রী যথাযথ সংরক্ষণ/ সংগ্রহ করে তেলিয়াপাড়া বাংলোটিকে এখনো মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি জাদুঘরে পরিণত করা সম্ভব। এর মাধ্যমে আগামী প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের এক গৌরবতম ইতিহাস সম্পর্কে জানার সুযোগ পাবে।’

কাজল সরকার/ইসরাত চৈতী/অমিয়/

হোমনা মুক্ত দিবস ২৩ ডিসেম্বর

প্রকাশ: ২৩ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৩:৩৬ পিএম
হোমনা মুক্ত দিবস ২৩ ডিসেম্বর
ছবি-খবরের কাগজ

আজ ২৩ ডিসেম্বর, কুমিল্লা জেলার হোমনা উপজেলা মুক্ত দিবস। ১৬ ডিসেম্বর যখন সারা দেশ বিজয়ের আনন্দে উদ্বেলিত তখনো শক্রমুক্ত হতে পারেনি হোমনাবাসী। ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত উপজেলার ঘাগুটিয়া গ্রামে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে তুমুল যুদ্ধে লিপ্ত হন এই অঞ্চলের মানুষ। অবশেষে ১৯৭১ সালের ২৩ ডিসেম্বর বাঞ্ছারামপুর, দাউদকান্দি, মুরাদনগর ও কুমিল্লার ময়নামতি ক্যান্টনমেন্ট থেকে মুক্তিযোদ্ধা ও যৌথ বাহিনীর ট্যাংক আক্রমণের পর সম্পূর্ণরূপে শক্রমুক্ত হয় ঘাগুটিয়া গ্রাম তথা কুমিল্লার হোমনা থানা। 

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ঘাগুটিয়া গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা সোবহান মিয়া জানান, বিজয়ের প্রাক্কালে ১৪ ডিসেম্বর সকালে সূর্যোদয়ের সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর ক্যাম্প থেকে লঞ্চযোগে পালিয়ে যাচ্ছিল পাকিস্তানি শতাধিক সেনার একটি দল। পালিয়ে হোমনার ঘাগুটিয়া লঞ্চঘাটের অদূরে আসা মাত্রই বাঞ্ছারামপুর ও হোমনার মুক্তিসেনারা একযোগে আক্রমণ করে। নিরুপায় হয়ে ঘাগুটিয়া পাকা মসজিদে আশ্রয় নেয়। 

পাকিস্তানি বাহিনী গ্রামে ঢুকেই মসজিদের পাশে দারোগা সিদ্দিকুর রহমান ও ভূঁইয়া বাড়িসহ আশপাশের ৪০-৫০টি বাড়িতে আগুন দেয় এবং উপর্যুপরি গুলি চালায়।

এ সময় ঘাগুটিয়া ও ভবানীপুর গ্রামের অধিবাসীরা বাড়িঘর, সহায় সম্পত্তির মায়া ত্যাগ করে পার্শ্ববর্তী মাধবপুর, রামপুর ও নালাদক্ষিণ গ্রামে আশ্রয় নেয়। 

এ খবর মুরাদনগর ও দাউদকান্দির মুক্তিসেনাদের কাছে পৌঁছালে শতাধিক মুক্তিসেনা ঘাগুটিয়া যুদ্ধে অংশ নেয়। পরে ময়নামতি ক্যান্টনমেন্ট থেকে ট্যাংক নিয়ে আসা মিত্র বাহিনীর সহায়তায় ঘাগুটিয়া মুক্ত হয়।

ঘাগুটিয়া যুদ্ধে দুজন মুক্তিযোদ্ধাসহ গ্রামের ২০ নারী-পুরুষ শহিদ হন এবং শতাধিক গ্রামবাসী ও এফএফ কমান্ডার আব্দুল আউয়ালসহ অনেক মুক্তিযোদ্ধা আহত হন। পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে শহিদরা হলেন- সৈয়দ আলী প্রধান, কিসমত আলী প্রধান, আছমত আলী প্রধান, ছন্দু মিয়া, লাল মিয়া (লালা), দেওয়ান আলী ভূঁইয়া, জবা মিয়া, আমজত আলী হাজি (ভবানীপুর), কাশেম মিয়া (কাছম), খোরশেদ পাগলা, আইয়ুবের নেছা, মনজুরের নেছা, কালা মিয়া প্রধানের মা, হাওয়া, লালু মিয়া, গোলবরের নেছা, জাবেদ আলী, মুক্তিযোদ্ধা আলেক মিয়া, মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান মতি।

ঘাগুটিয়া গ্রামে ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতা ইতিহাসের কালের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে ঘাগুটিয়া জামে মসজিদটি। পরবর্তী সময়ে ঐতিহাসিক মসজিদ ও স্কুলের পাশে গণকবরটি চিহ্নিত করে তা সংস্কার করা হয়েছে। 

এদিকে প্রতি বছরের মতো এবারও ২৩ ডিসেম্বর হোমনা মুক্ত দিবস উপলক্ষে উপজেলা প্রশাসন ও মুক্তিযোদ্ধাদের সমন্বয়ে ব্যাপক কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুমন দে বলেন, ‘দিবসটি উপলক্ষে শনিবার উপজেলা চত্বর থেকে র‌্যালি এবং ঘাগুটিয়ায় আলোচনা সভা ও মিলাদের আয়োজন করা হয়েছে।’

ইসরাত/অমিয়/

এখনো থামেনি বীরাঙ্গনাদের কান্না

প্রকাশ: ২০ ডিসেম্বর ২০২৩, ০২:৫৩ পিএম
এখনো থামেনি বীরাঙ্গনাদের কান্না
ছবি-সংগৃহীত

‘ভাদ্র মাসে বড় একটি নৌকায় করে জগন্নাথপুর গ্রামের প্রায় এক শর ওপরে মানুষ অন্য এক জায়গায় (সম্ভবত বাল্লা এলাকায়) যাচ্ছিলেন। এ সময় পথে আমাদের নৌকা আটকায় পাকিস্তানি মিলিটারিরা। প্রথমে তারা নৌকার মাঝিকে গুলি করে মেরে ফেলে। পরে আমার স্বামী নরেশ দাশকে গুলি করে। একপর্যায়ে পাকিস্তানি মিলিটারি আমাদের নৌকায় উঠে আরও বেশ কয়েকজনকে মেরে ফেলে। এ সময় আমার কোল থেকে ৮ মাসের ছেলেসন্তানকে কেড়ে নিয়ে নদীতে ফেলে দেয় হানাদার বাহিনী।

‘এভাবেই জীবনের দুর্বিষহ সেই দিনের কথা মনে করেন হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার বাল্লা-জগন্নাথপুর গ্রামের মেয়ে লক্ষ্মীপ্রিয়া বৈষ্ণবী। অথচ বিজয়ের ৫৩ বছরেও বীরাঙ্গনা হিসেবে স্বীকৃতি মেলেনি তার।’ 

‘কুড়িগ্রাম সদরের বেলগাছা ইউনিয়নের আছমা বেগম। যাকে পাকসেনারা একবার নির্যাতন করে ছেড়ে দেয়। তারা চলে গেলে দেখতে পান তার বাম পায়ের কেনি আঙুল ছিঁড়ে যাওয়ার মতো। রক্ত ঝরছে টপটপ করে! সেখান থেকে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। পাশের এক বাড়িতে গিয়ে কাপড় সেলাইয়ের সুঁই নিয়ে পাটের আঁশ দিয়ে পায়ের আঙুল সেলাই করে আবার পথচলা শুরু করেন তিনি। কিন্তু পথে সেনারা ধাওয়া করে ধরে নিয়ে গিয়ে আবারও নির্যাতন করে। সেখান থেকে শুরু পাকিস্তানি সেনাদের ধারাবাহিক নির্যাতন। যার পুরোটা এখন আর বলতে চান না তিনি।’ তবে খবরের কাগজকে প্রশ্ন করেন, ‘এসব বলে কী হবে? এই খাতায় নাম দিয়ে এখন পরিবার, সমাজে হয়েছি ঘৃণার পাত্র। আবেদনের ১৪ বছরেও বীরাঙ্গনার তালিকায় নাম ওঠেনি তার। পান না সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধা।’

মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৮ বছর বয়স ছিল ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার ছনধারা ইউনিয়নের লাউয়ারী গ্রামের মেয়ে শহর বানু। এ সময় আব্দুল খালেক নামে তার ৭ বছরের এক সন্তান ছিল তার। যুদ্ধ শুরু হয়েছে। একদিন গ্রামে প্রবেশ করে পাকিস্তানি বাহিনী। চারদিকে ছোটাছুটি করতে থাকে লোকজন। তবে শহর বানু ঘর থেকে বের হওয়ার আগেই চারপাশ ঘিরে ফেলে হানাদার বাহিনী। এ সময় পাশবিক নির্যাতন করা হয় তাকে। এরপর থেকে শহর বানুকে অনেকে বাঁকা চোখে দেখতে শুরু করেন। আর এ কলঙ্কের বোঝা নিয়েই আজও চলছেন তিনি।  বলেন, ‌‘মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি নির্যাতিত হয়েছি। বয়সের ভারে এখন কোনো অফিসে গিয়ে যোগাযোগ করার মতো শক্তি আমার নেই। জীবনের এই শেষবেলায় বীরাঙ্গনা হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি চাই।’

বলা হয় মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষের শহিদ হওয়া ও লাখ লাখ নারীর সম্ভ্রম বিসর্জনের বিনিময়ে এসেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। যদিও এ নিয়ে উঠেছিল বিতর্ক। কিন্তু একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২২ অক্টোবর ২০২১ সালে এক রায়ে বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষের শহিদ  হওয়া ও লাখ লাখ নারীর সম্ভ্রম বিসর্জন প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস। এই ইতিহাস মুক্তিযুদ্ধের পবিত্র আবেগ ও গৌরবের মধ্যে মিশে আছে।’ এখানে সংখ্যা উল্লেখ না থাকলেও লাখ লাখ নারীর সম্ভ্রম বিসর্জনের কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে সর্বশেষ ২০২১ সালের তথ্য অনুযায়ী সরকারের গেজেট আকারে প্রকাশ করা বীরাঙ্গনাদের সংখ্যা ৪৩৮ জন।

অন্যদিকে ‘মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমের (এমআইএস) গেজেটভুক্ত বীরাঙ্গনার সংখ্যা হালনাগাদ নয়। সরকারি তালিকায় এখন পর্যন্ত মোট বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ৪৪৮ হলেও লিপিবদ্ধ করা হয়েছে ৪০২ জনের নাম। এর মধ্যে ৮৯ জন বীরাঙ্গনারই নামে রয়েছে বানানসহ বিভিন্ন ধরনের ভুল। পিতা বা স্বামীর নামের ক্ষেত্রে বানান ও পদবির ভুল, এমনকি ভিন্ন ভিন্ন নাম রয়েছে ২০৭ জনের। বিভিন্ন আমলাতান্ত্রিক জটিলতার সঙ্গে এমন তথ্যগত ভুল বীরাঙ্গনাদের অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে বিড়ম্বনা তৈরি করছে।’

এমন তথ্য উঠে এসেছে গত বছরের ১৬ জুন ট্র্যান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবির) ‘বীরাঙ্গনাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও অধিকার: সুশাসনের চ্যালেঞ্জ এবং উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে।

কিন্তু তাহলে প্রশ্ন ওঠে বাকি বীরাঙ্গনাদের কী হলো? কোথায় আছেন? কেমন আছেন তারা? এখনো দেশের আনাচে-কানাচে অনেক বীরাঙ্গনার কান্না শোনা যায় স্বীকৃতি না পাওয়ার কষ্টে। একটি বাংলাদেশের জন্ম দিতে লক্ষ্মীপ্রিয়া, আছমা বেগম, শহর বানুর মতো ত্যাগ স্বীকার করেছেন অনেক নারী। তবে স্বীকৃতি মেলেনি এখনো।

এ বিষয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘স্বাধীনতার এত বছর পরে এসে সরকারিভাবে বীরাঙ্গনাদের স্বীকৃতি আমাদের জন্য অনেক আনন্দের ছিল। কিন্তু এ ক্ষেত্রে প্রত্যাশার তুলনায় এখন অনেক বেশি অপ্রাপ্তি রয়েছে। জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলা হলেও, তুলনামূলক কম আলোচিত প্রসঙ্গ হচ্ছে বীরাঙ্গনাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও অধিকার।’

বীরাঙ্গনাদের চিহ্নিত করা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সুযোগ-সুবিধা প্রদানের পুরো প্রক্রিয়ায় নানা ঘাটতির বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে, যখন আমরা কাজ করতে গিয়েছি তখন। এর মধ্যে বীরাঙ্গনাদের আবেদন নিষ্পত্তির সময়সীমা নির্ধারণ না থাকা, পরিকল্পনাহীনতা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি, অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে রয়েছে স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক-সাংস্কৃতিক নেতিবাচক মনোভাব। পাশাপাশি এখন একটি বড় সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, যেখানে বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি পেতে হলে টাকা দিতে হবে একটি মহলকে। এ ছাড়া বীরাঙ্গনাদের পরিবারও অনেক সময় সহযোগিতা করছে না তাদের পরিচয় প্রকাশে। আবার যেসব পরিবার সহযোগিতা করছে তারা ওই বীরাঙ্গনার প্রাপ্য সুবিধা নিজেরা ভোগ করছেন বলেও অভিযোগ আছে।    

এ ছাড়া বীরাঙ্গনাদের নিয়ে কাজ করছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নারীপক্ষ। সরকারি তালিকার বাইরে এ পর্যন্ত ৯৯ জনের তালিকা করেছিল প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যে মারা গেছেন ১৬ জন। আর ৫১ জনকে মাসিক ভাতা দেওয়া হচ্ছে নারীপক্ষের পক্ষ থেকে। আর তাদের তালিকায় থাকা ৩২ জনের নাম উঠেছে সরকারি তালিকায়।

কেন বীরাঙ্গনারা দ্রুত তালিকাভুক্ত হচ্ছে না জানতে চাইলে নারীপক্ষের সদস্য নাজনীন সুলতানা রত্না খবরের কাগজকে বলেন, ‘মাঠপর্যায়ে বীরাঙ্গনাদের সঙ্গে আমরা কাজ করতে গেলে অনেকেই অভিযোগ করেন সরকারের পক্ষে কেউ এসে তাদের খোঁজ নেয়নি। আবার অনেকের ভ্যারিফিকেশন হয়েছে কিন্তু এখনো গেজেটে  নাম আসেনি। অনেকে আবার আবেদন করে রেখেছেন কিন্তু তার পরে আর কিছুই এগোয়নি। কারও কারও অভিযোগ আছে, একটি চক্র তাদের কাছে তালিকায় নাম তুলে দেওয়ার জন্য টাকা চেয়েছেন। টাকা না দেওয়ায় কাজ আটকে আছে। যে বীরাঙ্গনাদের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমরা আজ স্বাধীনতা পেয়েছি, স্বাধীন দেশে বাস করছি তাদের কী এমন অবহেলায় থাকার কথা? এ প্রশ্ন করে নাজনীন সুলতানা রত্না বলেন, বীরাঙ্গনাদের তাদের প্রাপ্য মর্যাদা দেওয়া উচিত। একজন মুক্তিযোদ্ধা যে সম্মান, সুযোগ-সুবিধা নিয়ে বেঁচে আছেন বীরাঙ্গনাদেরও সে মর্যাদা যত দ্রুত সম্ভব দেওয়া উচিত। কারণ তাদের বয়স হয়েছে। অনেকে তো মারাও গেছেন। কিন্তু যারা বেঁচে আছেন তাদের মধ্যে অনেকে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অনেকে ভিক্ষাও করছেন। 

এ সমস্যার সমাধান কী জানতে চাইলে নাজনীন সুলতানা রত্না বলেন, সরকারের সদিচ্ছা প্রয়োজন। কাজগুলোকে দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে। যেন তারা বেঁচে থাকতে থাকতে অন্তত স্বীকৃতি পান। একটু ভালোভাবে মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে পারেন। 

এ সমস্যা সমাধানের বিষয়ে ইফতেখারুজ্জামান খবরের কাগজকে বলেন, ‘বীরাঙ্গনারা যে বীর, সে বিষয়টি বেশি বেশি প্রচার করা দরকার। এ জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে উদ্যোগ নেওয়া দরকার। পাশাপাশি তাদের তালিকায় আনার জন্য কাজ করার সরকারি সংস্থা জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলকে (জামুকা) আরও তৎপর হতে হবে। কাজটি দ্রুত করার ব্যবস্থা করতে হবে। যারা সিন্ডিকেট করে বীরাঙ্গনাদের তালিকায় আনার জন্য অর্থ নিচ্ছেন ও কার্যক্রমটি দীর্ঘ করছেন তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিরও ব্যবস্থা করতে হবে।’

মৌলভীবাজারে ‘স্থানীয় শহীদ দিবস’ আজ

প্রকাশ: ২০ ডিসেম্বর ২০২৩, ১০:০৭ এএম
মৌলভীবাজারে ‘স্থানীয় শহীদ দিবস’ আজ
মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চবিদ্যালয় মাঠে স্মৃতিসৌধ ও শহীদ মিনার। ছবি-সংগৃহীত

আজ ২০ ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালের এই দিনে সারাদেশ যখন বিজয়ের আনন্দে ভাসছিল, তখন মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে রহস্যজনকভাবে মাইন বিস্ফোরণে মারা যান অর্ধশতাধিক ঘরে ফেরা মুক্তিযোদ্ধা। এই দিনে মৌলভীবাজারে রচিত হয় এক কালো অধ্যায়। দিনটি স্থানীয় শহীদ দিবস হিসেবে পালন করেন জেলাবাসী।

মাইন বিস্ফোরণে বেঁচে যাওয়া সাবেক জেলা কমান্ডার জামাল উদ্দিন বলেন, ‘দেশ স্বাধীনের মাত্র চার দিন পর যুদ্ধজয়ী মুক্তিযোদ্ধারা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে জড়ো হন। তখন তারা একে একে নিজেদের ঘরে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এদিকে বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানি বাহিনীর ফেলে যাওয়া ও পুঁতে রাখা মাইন এবং গ্রেনেড উদ্ধার করে বিদ্যালয়ের এক পাশে রাখা হয়। সেদিন ক্যাম্পে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধারা যখন দুপুরের খাবারের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন হঠাৎ বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে শহর। রহস্যজনকভাবে পরপর বেশ কয়েকটি মাইন বিস্ফোরণ ঘটে। ক্যাম্পে অবস্থানরত অর্ধশতাধিক মুক্তিযোদ্ধার দেহ ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে এদিকে-সেদিক ছিটকে পড়ে।’  

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে জানা যায়, সেদিন উপস্থিত মুক্তিযোদ্ধাদের দেহ বিচ্ছিন্ন হয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়লে অজানা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের এলাকায়। এক পলকেই তছনছ হয়ে যায় পুরো এলাকা। মুক্ত দেশে নিশ্চিত ঘরে ফেরার পূর্বমুহূর্তে তারা হয়ে গেলেন কেবলই স্মৃতি। স্বাধীন দেশে নিজেদের বাড়িতে ফেরা হলো না মুক্তিযোদ্ধাদের। এলাকাবাসী ছিন্নভিন্ন মুক্তিযোদ্ধাদের দেহভস্ম একত্র করে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের দক্ষিণ-পূর্ব অংশে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাশে সমাধিস্থ করেন।

জানা গেছে, এই ক্যাম্পের অধিকাংশই ছিলেন গেরিলা বাহিনীর সদস্য। তবে কী কারণে বিস্ফোরণ ঘটেছিল এবং কতজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়েছিলেন তা এখনো অজানাই রয়ে গেছে। 

পরবর্তী সময়ে জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল ক্যাম্পে অবস্থানরতদের কিছু নাম উদ্ধার করে একটি তালিকা তৈরি করা হয়। পরে মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে স্মৃতিসৌধ ও শহীদ মিনারের মধ্যখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়।

২০ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে মৌলভীবাজারের মাইন বিস্ফোরণে যাদের নাম পাওয়া গেছে স্মৃতিস্তম্ভটিতে তাদের নাম লিখা আছে। তারা হলেন- সুলেমান মিয়া, রহিম বক্স খোকা, ইয়ানূর আলী, আছকর আলী, জহির মিয়া, ইব্রাহিম আলী, আব্দুল আজিজ, প্রদীপ চন্দ্র দাস, শিশির রঞ্জন দেব, সত্যেন্দ্র দাস, অরুণ দত্ত, দিলীপ দেব, সনাতন সিংহ, নন্দলাল বাউরী, সমীর চন্দ্র সোম, কাজল পাল, হিমাংশু কর, জিতেশ চন্দ্র দেব, আব্দুল আলী, নূরুল ইসলাম, মোস্তফা কামাল, আশুতোষ দেব, তরণী দেব ও নরেশ চন্দ্র ধর।

প্রতিবছর ২০ ডিসেম্বরের দিনটি ‘স্থানীয় শহীদ দিবস’ হিসেবে পালন করে জেলার বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও জেলা প্রশাসন।

পুলক পুরকায়স্থ/ইসরাত/অমিয়/