ঢাকা ৬ বৈশাখ ১৪৩১, শুক্রবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৪
Khaborer Kagoj

কোথাও ঘুরতে গেলে রোজা রাখতে হবে?

প্রকাশ: ০১ এপ্রিল ২০২৪, ১০:০০ পিএম
কোথাও ঘুরতে গেলে রোজা রাখতে হবে?
বিমানের ছবি। ইন্টারনেট

রোজা অবস্থায়ও অনেক মানুষকে নানা কারণে ঘুরতে যেতে হয়। ভ্রমণে থাকতে হয়। আগের তুলনায় এখন ভ্রমণ অনেকটা সহজ হয়েছে বটে; কিন্তু ভ্রমণে কষ্ট বা ক্লান্তি থাকেই। ঘুরতে গিয়ে বা ভ্রমণে থাকা অবস্থায় অনেকের পক্ষে রোজা রাখা কষ্টকর হয়ে পড়ে। এই কষ্ট থেকে বাঁচতে ভ্রমণে রোজা না রাখার অনুমতি আছে কি না, চলুন সে সম্পর্কে জেনে নিই—

প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম নারী-পুরুষের ওপর রোজা রাখা ফরজ। বিশেষ কিছু প্রয়োজনের কারণে রমজানে রোজা না রেখে অন্য সময়েও তা আদায়ের সুযোগ আছে। এই প্রয়োজনের অন্যতম একটি হলো ভ্রমণ বা সফর। মুসাফিরের জন্য ভ্রমণকালে রোজা না রাখার অনুমতি আছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমাদের মাঝে কেউ যদি অসুস্থ থাকে অথবা ভ্রমণে থাকে, সে রমজানের পর অন্য কোনো সময়ে কাজা করে নেবে। আল্লাহতায়ালা তোমাদের ওপর সহজ করতে চান। তিনি চান না তোমাদের ওপর কঠিন করতে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৫)

সফরে রোজা না রাখা বৈধ হওয়ার শর্ত হলো, সফরের দূরত্ব ৪৮ মাইল তথা ৭৮ কিলোমিটার হতে হবে। সফরে বা ভ্রমণে থাকা অবস্থায়ও যদি কোনো ব্যক্তি রোজা পালন করে, তবে তা-ই উত্তম। আর বেশি কষ্ট হলে বা ইচ্ছা করলে রোজা ছাড়তে পারবে; এই রোজা পরে সুবিধামতো নিকটতম সময়ে কাজা আদায় করে নিতে হবে। প্রিয় রাসুল (সা.) কোনো এক রমজানে রোজা অবস্থায় মক্কার পথে যাত্রা করলেন। কাদিদ নামের একটি স্থানে পৌঁছার পর তিনি রোজা ছেড়ে দিলে লোকেরা সবাই রোজা ছেড়ে দিলেন। (বুখারি, হাদিস: ১৮২০)

হানাফি মাজহাব মতে, সফর অবস্থায় নিয়ত করে রোজা রাখা শুরু করলে, তা ভাঙা জায়েজ নয়। কেউ ভেঙে ফেললে গুনাহগার হবে। তবে কাফফারা দিতে হবে না। শুধু কাজা করবে। (রাদ্দুল মুহতার, ২/৪৩১)

তাবেয়ি আসিম (রহ.) বলেন, আনাস (রা.)-কে সফরকালে রোজা রাখার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, ‘যে রোজা রাখবে না সে অবকাশ গ্রহণ করল। আর যে রোজা রাখল সে উত্তম কাজ করল।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা)

লেখক: শাইখুল হাদিস, সিরাজনগর মাদরাসা নরসিংদী; সদস্য, তানযীম ফতোয়া বোর্ড নরসিংদী

 

শাওয়ালের ছয় রোজা

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৪, ০৯:০০ এএম
শাওয়ালের ছয় রোজা
ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত আরবিতে শাওয়াল লেখা ছবি

শাওয়াল হিজরি বর্ষের দশম মাস। পবিত্র ঈদুল ফিতরের মধ্য দিয়ে এই মাসের সূচনা হয়। এ মাসে ছয়টি রোজা পালনের কথা হাদিসে এসেছে। নির্দিষ্ট কোনো দিন কিংবা তারিখের বাধ্যবাধকতা ছাড়া রমজানের রোজা রাখার পর শাওয়াল মাসজুড়ে ছয়টি রোজা রাখলে সারা বছর রোজা রাখার সওয়াব অর্জিত হয়।


শাওয়ালের ছয় রোজা প্রসঙ্গে হাদিসে সুসংবাদ বর্ণিত হয়েছে। সাহাবি আবু আইয়ুব আনসারি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রমজানের সব রোজা রাখার পর শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজা রাখল, সে সারা বছর রোজা রাখার সওয়াব অর্জন করল।’ (মুসলিম, ১১৬৪; তিরমিজি, ৭৫৯; আবু দাউদ, ২৪৩৩)


হাদিসের বর্ণনামতে, যে ব্যক্তি রমজানের রোজা যথাযথ আদায়ের পর শাওয়াল মাসে ধারাবাহিক বা বিচ্ছিন্নভাবে ছয়টি রোজা রাখে, সে সারা বছর রোজা পালনের সওয়াব পাবে। আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে বান্দাকে অল্পের বিনিময়ে বিপুলসংখ্যক সওয়াব অর্জনের এটি নিশ্চয়ই সুবর্ণ সুযোগ।
কোরআনের সুরা আনয়ামে আল্লাহ বলেছেন, ‘প্রতিটি ভালো কাজের প্রতিদান দশগুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়া হয়।’ (আয়াত, ১৬০)। এ ছাড়াও হাদিস থেকে জানা যায়, প্রতিটি রোজার বিনিময় দশগুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়। 


অতএব পুরো রমজানে ৩০টি রোজার সওয়াব দশগুণ বেড়ে ১০ মাস বা ৩০০ দিনের সমান হয়। এরপর শাওয়ালের ছয় রোজার দশগুণ ৬০টি রোজা—যা দুই মাসের সমান সওয়াব অর্জিত হয়। এভাবে রমজানে সবগুলো রোজা পূর্ণ করার পর শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজা রাখলে খুব সহজে সারা বছর রোজা রাখার সমান সওয়াব পাওয়া যায়। 


রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে এ ছয় রোজা রাখতেন এবং সাহাবিদেরও নির্দেশ দিতেন। সর্বাধিক হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবি আবু হুরায়রা (রা.) থেকেও এ ধরনের হাদিস বর্ণিত হয়েছে। (আবু দাউদ, ২৪৩৩) অন্য সাহাবিদের মধ্যে জাবের (রা.), সাওবান (রা.) এবং ইবনে উমর (রা.) থেকেও এ বিষয়ে হাদিস বর্ণিত হয়েছে।


সাধারণত রমজান মাসজুড়ে রোজা রাখার সময় অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমাদের কিছু ভুল-ত্রুটি হয়ে যায়। কিয়ামতের মাঠে এসব ভুলের কারণে যেন রোজার সওয়াবে কোনো অপূর্ণতা না থাকে, সেজন্য শাওয়ালের ছয় রোজা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। হাদিস থেকে জানা যায়, বিচারের দিন ওজনের পাল্লায় ফরজ ইবাদত যদি অসম্পূর্ণ হয়ে পড়ে, তখন মহান আল্লাহ ওই ব্যক্তির নফল ইবাদত থাকলে সেখান থেকে নিয়ে তা পূর্ণ করার জন্য ফেরেশতাদের আদেশ দেবেন। 


বিখ্যাত হাদিসবিশারদ ইবনুল কাইয়ুম (রহ.) এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজার মধ্যে বিশেষ রহস্য রয়েছে। এই ছয়টি রোজা রমজানের রোজার পরিপূরক। রমজানের রোজায় যেসব ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়ে থাকে, শাওয়ালের এই ছয় রোজা সেগুলো দূর করে। ব্যাপারটি যেন ফরজ নামাজের পর সুন্নত ও নফল নামাজের মতো এবং নামাজে ভুল হলে সাজদায়ে সাহু দেওয়ার মতো।’


উল্লেখ্য, শাওয়াল মাসের এ ছয় রোজা পুরুষ ও নারীর জন্য সুন্নত। পুরো শাওয়াল মাসের যে কোনো ছয় দিনে এসব রোজা রাখা যায়। কেউ চাইলে মাসের শুরুতে রাখতে পারে, আবার মাসের মধ্যভাগে বা শেষভাগেও রাখতে পারে। এমনকি একাধারে ছয় দিন অথবা মাঝে বিরতি দিয়ে মোট ছয়টি রোজা রাখা যেতে পারে। 


হাদিস শাস্ত্রের বিখ্যাত ইমাম ইবনুল মুবারক (রহ.) বলেন, ‘প্রতি মাসে তিন দিন রোজা পালনের মতো শাওয়াল মাসের ছয় রোজাও মুস্তাহাব। কোনো কোনো হাদিসে এই রোজা রমজানের পরপরই রাখার কথা এসেছে।’ এ জন্য তিনি এই ছয়টি রোজা শাওয়াল মাসের শুরুর দিকে পালন করা বেশি পছন্দনীয় মনে করতেন।


সাধারণত পার্থিব কেনাকাটার বেলায় আমরা যেভাবে বিশেষ অফারের প্রতি আকর্ষণ বোধ করি এবং এ ধরনের সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি, একইভাবে আখেরাতের অপার্থিব পুণ্যের বেলায়ও মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের জন্য যেসব বিশেষ সুযোগ রয়েছে এবং যেগুলোর 
মাধ্যমে আমরা সীমিত কয়েক দিনের বিনিময়ে সারা বছরের জন্য পুণ্যবান হতে পারি—সেগুলোর প্রতি আমাদের যত্নবান হওয়া উচিত। শত কর্মব্যস্ততার মধ্যেও আল্লাহর অনুগ্রহ অর্জন করার প্রতি বিশেষভাবে সচেতন থাকার মাধ্যমে একজন প্রকৃত ঈমানদার নিজের সর্বময় সাফল্য সুনিশ্চিত করতে পারেন। 

লেখক : অনুবাদক ও গবেষক

 

ইবলিস জিন না ফেরেশতা?

প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৪, ০৬:৪৫ পিএম
ইবলিস জিন না ফেরেশতা?
আরবিতে 'ইবলিস' লেখা ছবি। ইন্টারনেট

মানুষ সৃষ্টির আগে আল্লাহর সৃষ্টিতে ছিল ফেরেশতা ও জিন। ইবলিস আগুনের তৈরি। থাকত ফেরেশতাদের সঙ্গে। একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি করত। এই ইবলিস জিন নাকি ফেরেশতা—এ নিয়ে অনেকেই দ্বিধায় পড়ে যান। তাদের জন্য এ লেখা কাজে দেবে। 

আল্লাহতায়ালা বলেন, “আর যখন আমি ফেরেশতাদের বললাম, ‘আদমকে সেজদা করো’; তখন ইবলিস ছাড়া সবাই সেজদা করল। সে দম্ভভরে প্রত্যাখ্যান করল। ফলে সে কাফেরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ৩৪)

কোরআনের এই বর্ণনা থেকে কারও কারও মনে প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক যে, ইবলিসকে কেন ফেরেশতাদের সঙ্গে সেজদা করতে আদেশ করা হলো? ইবলিস কি তাহলে ফেরেশতাদের দলভুক্ত?

ইবলিস জিনদের একজন, তার মৌলিক উপাদান আগুন। ইমাম রাজি (রহ.) তিনটি দলিল উপস্থাপন করে বলেছেন, ‘ইবলিসের জিন প্রমাণিত হওয়ার জন্য এই দলিলগুলো যথেষ্ট।’ (আত-তাফসিরুল কাবির, ফখরুদ্দিন রাজি, খণ্ড: ২ পৃষ্ঠা: ৪২৯-৩০) 

এক. ইবলিসকে সৃষ্টি করা হয়েছে আগুন থেকে। কোরআনে এসেছে, ইবলিস বলেছে, ‘আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন আগুন থেকে আর তাকে (আদমকে) সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ১২)

কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘তিনি (আল্লাহতায়ালা) জিনজাতিকে সৃষ্টি করেছেন ধোঁয়াহীন আগুন থেকে।’ (সুরা রহমান, আয়াত: ১৫)

আল্লাহ আগুন থেকে জিনদের সৃষ্টি করেছেন। ফেরেশতাদের সৃষ্টির মৌলিক উপাদান আলো, তাই ইবলিস ফেরেশতাদের অন্তর্ভুক্ত নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ফেরেশতাদের সৃষ্টি করা হয়েছে নুর বা আলো থেকে। জিনদের সৃষ্টি করা হয়েছে ধোঁয়াহীন আগুন থেকে। আর আদম-সৃষ্টির বিবরণ তোমাদের কাছে বলা হয়েছে।’ (মুসলিম, হাদিস: ২৯৯৬)

দুই. ইবলিসের ছেলেমেয়ে আছে, সে বংশবিস্তার করে। ফেরেশতারা এসব বিষয় থেকে মুক্ত। তাদের স্ত্রী-সন্তান নেই। তাদের মধ্যে নেই নারী-পুরুষের বিভাজনও। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা কি তাকে (ইবলিসকে) এবং তার বংশধরকে আমার পরিবর্তে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করছ?’ (সুরা কাহফ, আয়াত: ৫০)

তিন. ফেরেশতারা আল্লাহর সব আদেশ মেনে চলে। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘তারা (ফেরেশতারা) কখনোই আল্লাহর আদেশ অমান্য করে না; বরং যেই কাজে তাদের নিয়োজিত করা হয়েছে, সর্বদা সেই কাজই করে।’ (সুরা তাহরিম, আয়াত: ৬)

মানব সৃষ্টির আগে ফেরেশতারাই ছিল সৃষ্টির সেরা। আল্লাহতায়ালা সেই ফেরেশতাদের যখন আদেশ করলেন আদমকে সেজদা করতে, তখন তাদের থেকে নিম্নস্তরের জিনও সেই হুকুমের অন্তর্ভুক্ত হবে এটাই স্বাভাবিক। আল্লাহতায়ালা আদমকে সৃষ্টির আগেই ফেরেশতাদের আদেশ দিয়ে রেখেছিলেন। আল্লাহ বলেন, ‘সুতরাং আমি যখন আদমের সৃষ্টি সম্পন্ন করব এবং তার মধ্যে রুহ ফুঁকে দেব, তখন তোমরা তার সামনে সেজদায় পড়ে যেও।’ (সুরা সাদ, আয়াত: ৭২) 

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহতায়ালা জান্নাতে আদমের প্রতিকৃতি তৈরি করার পর নির্দিষ্ট একটি সময় পর্যন্ত রেখে দেন। তখন ইবলিস আদমের মাটির প্রতিকৃতির চারপাশ ঘুরে ঘুরে যখন দেখল এর মধ্যে ফাঁকা আছে। সে বুঝতে পেরেছিল এটা এমন এক সৃষ্টি, যারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।’ (মুসলিম, হাদিস: ২৬১১)

বোঝা গেল সকল ঘটনা ঘটছিল ইবলিসের উপস্থিতিতেই। তাছাড়া যখন আদমের রুহ ফুৎকার দেওয়ার পর সৃষ্টিজগতের সব জ্ঞান দিয়ে সব সৃষ্টিকুলের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করলেন এবং ফেরেশতাদের সেজদার আদেশ দিলেন, তখন ইবলিস সেই মজলিসেই উপস্থিত ছিল। তাই ইবলিস ফেরেশতা না হলেও সে ওই আদেশের অন্তর্ভুক্ত হবে। 

আবার আল্লাহ যখন ইবলিসকে পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন, ‘(হে ইবলিস) আমি আদেশ করার পরও কীসে তোমাকে সেজদা থেকে বিরত রাখল।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ১২)

উত্তরে সে এটা বলেনি যে, হে আল্লাহ আপনি তো আমাকে আদেশ করেননি, বরং ইবলিস বলেছিল, ‘আমি তার (আদমের) চেয়ে উত্তম; আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন আগুন থেকে আর তাকে (আদমকে) সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ১২)

এই কথা থেকেও প্রমাণ হয় স্বয়ং ইবলিসও বুঝেছিল আদমকে সেজদার আদেশে সেও অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ কোরআনে অধিকাংশ স্থানে ইবলিসকে ‘শয়তান’ বলে সম্বোধন করেছেন। শয়তান শব্দটি দিয়ে কট্টরভাবে অবাধ্য হওয়াকে বোঝায়। 

লেখক: আলেম, গবেষক ও সাংবাদিক

সুরা ইখলাস পড়ার গুরুত্ব ও ফজিলত

প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৪, ০৯:৫৪ এএম
সুরা ইখলাস পড়ার গুরুত্ব ও ফজিলত
সুরা ইখলাস। ইন্টারনেট

ইসলাম কল্যাণের ধর্ম। ইসলাম মানুষের জন্য সবকিছু সহজ করে দিয়েছে, কঠিন কিছু রাখেনি। অল্প আমলে রেখেছে অধিক সওয়াব। সহজ আমলের সওয়াব বড় করে দিয়েছে। কোরআনের ছোট্ট সুরা ইখলাস। খুব বেশি আয়ান এতে নেই। কিন্তু এর ফজিলত অনেক বেশি। আবু সাইদ খুদরি (রা.) বলেন, “রাসুল (সা.) তাঁর সাহাবিদের উদ্দেশে বলেন, ‘তোমাদের কেউ কি এক রাতে কোরআনের এক-তৃতীয়াংশ তেলাওয়াত করা দুঃসাধ্য মনে করো?’ এ প্রশ্ন তাদের জন্য কঠিন ছিল। তারা বলল, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আমাদের মধ্যে কার সাধ্য আছে এমনটি করার?’ তিনি বললেন, ‘কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ’, অর্থাৎ সুরা ইখলাস কোরআনুল কারিমের এক-তৃতীয়াংশ।” (বুখারি, হাদিস: ৪৭২৭) 

রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহতায়ালা কোরআনকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন। এর পর ‘কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ’-কে করেছেন কোরআনের ভাগসমূহের একটি।’ (মুসলিম, হাদিস: ৮১১) 

কত সহজ একটি আমল! ছোট্ট একটি সুরা। তেলাওয়াত করতে এক মিনিটও লাগে না। ছোট্ট এই সুরা কোরআনের তিন ভাগের এক ভাগ, কথাটি শুনে সাহাবিরা বিস্মিত হবেন; তা জানতেন রাসুল (সা.)। তিনি একবার বলেছেন, “তোমরা জমায়েত হও, আমি তোমাদের সামনে কোরআনের এক-তৃতীয়াংশ পাঠ করব। ফলে যাদের পক্ষে সম্ভব তারা জমায়েত হলো। এরপর রাসুল (সা.) বের হয়ে এলেন এবং তেলাওয়াত করে আবার ঘরে গেলেন।’ তখন আমাদের একজন অন্যজনকে বলতে লাগল, ‘মনে হয় আসমান থেকে (এখনই) কোনো সংবাদ এসেছে আর সে জন্যই তিনি ঘরে প্রবেশ করেছেন।’ পরে রাসুল (সা.) বের হয়ে এসে বললেন, আমি তোমাদের বলেছিলাম যে, ‘তোমাদের সামনে কোরআনের এক-তৃতীয়াংশ পাঠ করব। শোনো, সুরা ইখলাস কোরআনের এক-তৃতীয়াংশের সমান।” (মুসলিম, হাদিস: ৮১২) 

সাহাবিরা সুরা ইখলাসের গুরুত্ব বুঝলেন। তারা এটি বেশি করে পাঠ করতেন। আবু সাইদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, “এক ব্যক্তি অপর ব্যক্তিকে ‘কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ’ পড়তে শুনলেন। সে বারবার তা মুখে উচ্চারণ করছিল। (তিনি মনে করলেন এভাবে বারবার পাঠ করা যথেষ্ট নয়) পরদিন সকালে তিনি রাসুল (সা.)-এর কাছে এসে বিষয়টি খুলে বললেন। তখন রাসুল (সা.) বললেন, ‘সে সত্তার শপথ, যার হাতে আমার জীবন। এ সুরা হচ্ছে সমগ্র কোরআনের এক-তৃতীয়াংশের সমান।” (বুখারি, হাদিস: ৪৭২৬) 

সুরাটি অসামান্য মূল্যবান হওয়ার অন্যতম কারণ হলো, এই সুরায় আল্লাহর গুণ বর্ণনা করা হয়েছে। আয়েশা (রা.) বলেন, “রাসুল (সা.) এক সাহাবিকে একটি মুজাহিদ দলের প্রধান করে জিহাদে পাঠালেন। নামাজে তিনি যখন তার সাথিদের ইমামতি করতেন, তখন সুরা ইখলাস দিয়ে নামাজ শেষ করতেন। মুজাহিদরা সেই অভিযান থেকে ফিরে রাসুল (সা.)-এর খেদমতে বিষয়টি আলোচনা করলে তিনি বললেন, ‘তাকেই জিজ্ঞাসা করো কেন সে এই কাজ করেছে।’ এরপর তারা তাকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি উত্তর দিলেন, এ সুরায় আল্লাহতায়ালার গুণাবলি রয়েছে। আর তাই এ সুরা তেলাওয়াত আমার বড় পছন্দ।’ তখন রাসুল (সা.) বললেন, ‘তাকে জানিয়ে দাও, আল্লাহতায়ালাও তাকে পছন্দ করেন।” (বুখারি, হাদিস: ৪৭২৬)

লেখক: আলেম ও সাংবাদিক

ইবলিস কে?

প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল ২০২৪, ০৬:৪৫ পিএম
ইবলিস কে?
ইংরেজিতে ‌'ইবলিস' লেখা ছবি। ইন্টারনেট

মানুষ সৃষ্টির আগে আল্লাহর সৃষ্টিতে ফেরেশতা ও জিন ছিল। ইবলিস ও ফেরেশতাদের উদ্দেশ্যে আল্লাহতায়ালা বলেন, “যখন আমি ফেরেশতাদের আদেশ করলাম, ‘আদমকে সেজদা করো’; সবাই সেজদা করল, কিন্তু ইবলিস দম্ভভরে প্রত্যাখ্যান করল; ফলে সে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হলো।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ৩৪)

কে এই ইবলিস? যে মহান আল্লাহর হুকুম অমান্য করল। আল্লাহ তার পরিচয় দিয়ে বলেছেন, ‘সে ছিল জিনদের একজন।’ (সুরা কাহফ, আয়াত: ৫০) 

ইবলিস ছিল জিন জাতির সদস্য। আগুনে তৈরি। থাকত ফেরেশতাদের সঙ্গে। একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি করত। জিনদের আদি পিতা সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘ইবলিস জিনজাতির পিতা।’ (আল-মুজামুল আওসাত, তাবরানি: ৬১৭৪) 

ইবলিসকে কোরআন ও হাদিসের অধিকাংশ স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে শয়তান বলে। তবে কখনো কখনো তার অনুসারী মানুষ ও জিনদেরও শয়তান বলা হয়েছে। ইবলিসের আসল নাম ছিল ‘আজাজিল’। অহংকার ও সীমালঙ্ঘন করে আল্লাহর আদেশ অমান্য করায় সে আল্লাহতায়ালার দয়া ও রহমত থেকে বঞ্চিত হয়ে চিরদিনের জন্য অভিশপ্ত হয়ে যায়। তাই তাকে ইবলিস নাম দেওয়া হয়। কারণ অধিকাংশ মুসলিম ভাষাবিদের মতে, ইবলিস শব্দটি আরবি। আল-ইবলাস শব্দ থেকে এর উৎপত্তি; অর্থ নিরাশা, ভ্রষ্টতা, গোমরাহি। (লিসানুল আরব, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৩৪৩) 

অমুসলিম ভাষাবিদরা মনে করেন, ইবলিস গ্রিক শব্দ ডিয়াবুলুস থেকে এসেছে। এই শব্দ থেকেই ফরাসি ভাষায় Diable এবং ইংরেজিতে Devil শব্দের উৎপত্তি। গ্রিক ভাষায় এর মৌলিক অর্থ কুৎসা রটনাকারী, বিশ্বাসঘাতক। ইবলিস শব্দটি কোরআনে ১১ বার এসেছে। অহংকার ও আদম (আ.)-কে সেজদা না করার বিষয়ে এসেছে ৯ বার।

ইবলিসের আরও কিছু উপনাম আছে, হারিস, আবু লুবাইনা, আবু মুররা, আবু কুরদুস, নায়িল, আবুল জান। ইবলিস আল্লাহ ও ফেরেশতাদের কথা গোপনে শুনতে গেলে, ফেরেশতারা আগুনের গোলা নিক্ষেপ করে তাকে বিতাড়িত করে দেয়। ইবরাহিম (আ.) মিনা প্রান্তরে ইবলিসকে প্রতিহত করতে পাথর নিক্ষেপ করেছিলেন, এই জন্য তাকে রজিম বা প্রস্তরনিক্ষিপ্ত বা বিতাড়িত শয়তান বলা হয়। 

প্রখ্যাত তাবেয়ি ইবনে ইসহাক (রহ.) ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, “পাপে লিপ্ত হওয়ার আগে ইবলিস শয়তানের নাম ছিল ‘আজাজিল’। সে ছিল পৃথিবীর বাসিন্দা। অধ্যবসায় ও জ্ঞানের দিক থেকে সেই ছিল সবার সেরা।” (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ১৪২)

লেখক: আলেম, গবেষক ও সাংবাদিক

দুর্গন্ধ নিয়ে মসজিদে না আসা সুন্নত

প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল ২০২৪, ০৯:৪৮ এএম
দুর্গন্ধ নিয়ে মসজিদে না আসা সুন্নত
শারজাহ মসজিদ, সংযুক্ত আরব আমিরাত। ইন্টারনেট

মসজিদ আল্লাহর ঘর। পৃথিবীতে আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় জায়গা মসজিদ। রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় গিয়ে প্রথমে মসজিদ তৈরি করেন। মুসলমানরা যেখানে যান, সেখানে মসজিদ গড়ে তোলেন। মসজিদই মুসলমানদের ইবাদতের কেন্দ্রস্থল। সব সময় মসজিদের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর রাখা মুমিনের বৈশিষ্ট্য। রাসুলুল্লাহ (সা.)ও সব সময় মসজিদ পরিচ্ছন্ন রাখতে সচেষ্ট থাকতেন। সব মুসলমান যেন মসজিদে সমবেত হয়ে জামাতে নামাজ আদায় করে, সেদিকে গুরুত্বারোপ করতেন তিনি। তাই যারা দুর্গন্ধ বহন করে, গা থেকে দুর্গন্ধ দূর না হওয়া পর্যন্ত তাদের তিনি মসজিদে আসতে বারণ করতেন। কারণ সব মুসল্লির একাগ্রতা নষ্ট করার চেয়ে একজন মুসল্লির জামাত ছুটে যাওয়াই শ্রেয়। দুর্গন্ধ আসে বিশেষ কিছু খাবার খাওয়ার কারণে। এ তালিকায় সবার আগে থাকবে পেঁয়াজ, দুর্গন্ধ তৈরি করা পেঁয়াজজাতীয় সবজি ও রসুন।

জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “কেউ যদি এ জাতীয় গাছ থেকে খায়—তিনি রসুন বুঝিয়েছেন—সে যেন আমাদের মসজিদে না আসে।’ (আতা রহ. বলেন) ‘আমি জাবের (রা.)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, রাসুল (সা.) এর দ্বারা কী বুঝিয়েছেন?’ জাবের (রা.) বললেন, ‘আমার ধারণা, রাসুল এর দ্বারা কাঁচা রসুন বুঝিয়েছেন।’’ (বুখারি, হাদিস: ৮৫৪) 

আরেক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে এইসব রসুনের তরকারি খাবে (কখনো বলেছেন) যে পেঁয়াজ, রসুন ও কুররাস (গন্ধে ও স্বাদে পেঁয়াজজাতীয় সবজিবিশেষ) খাবে, সে যেন আমাদের মসজিদের কাছে না আসে। কেননা আদমসন্তান যা দ্বারা কষ্ট পায়, ফেরেশতারাও তা দ্বারা কষ্ট পান।’ (মুসলিম, হাদিস: ৫৬৩)

শেষোক্ত বর্ণনায় এ জাতীয় সবজি খেয়ে মসজিদে আসতে নিষেধ করার পেছনে একটি নতুন তথ্য দিয়েছেন রাসুল (সা.)। আর তা হলো, ফেরেশতাদের কষ্ট পাওয়া। কারণ মানুষের মতো তারাও এ রকম দুর্গন্ধের কারণে কষ্ট পান। তবে এ কথা বলে খাবারগুলো খাওয়া হারাম করার উদ্দেশ্য নয় রাসুল (সা.)-এর। বরং নিঃসন্দেহে এগুলো হালাল খাদ্য।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “খাইবার বিজয়ের পর আমরা তখনো ফিরে আসতে পারিনি। এদিকে আমরা রাসুল (সা.)-এর সঙ্গীসাথিরা রসুন ইত্যাদি সবজি খেতে শুরু করলাম। সবাই ভীষণ ক্ষুধার্ত ছিল। আমরা খুব খেলাম। তারপর মসজিদে গেলাম। রাসুল (সা.) গন্ধ পেয়ে বললেন, ‘যে ব্যক্তি এই দুর্গন্ধযুক্ত উদ্ভিদ থেকে কিছু খাবে, সে যেন আমাদের মসজিদের কাছে না আসে। লোকেরা বলতে লাগল, ‘(রসুন) হারাম হয়ে গেছে, হারাম হয়ে গেছে। এ খবর রাসুল (সা.)-এর কাছে পৌঁছলে তিনি বললেন, ‘হে লোকসকল, আল্লাহ আমার জন্য যা হালাল করেছেন, আমি তা হারাম করতে পারি না। কিন্তু এটি এমন এক উদ্ভিদ, যার গন্ধ আমার অপছন্দ।’’ (মুসলিম, হাদিস: ৫৬৫) 

দুর্গন্ধ বয়ে বেড়ালে মসজিদে আসা যাবে না। দুর্গন্ধ চলে গেলে পরে মসজিদে আসবে। কুররা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যদি খেতেই হয়, তবে তোমরা তা রান্না করে দুর্গন্ধ দূর করে খাবে। বর্ণনাকারী বলেন, তা হলো রসুন ও পেঁয়াজ।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৩৮২৭)। কারণ, রান্না করলে দুর্গন্ধ প্রায় চলে যায়। সুতরাং মসজিদে কাঁচা পেঁয়াজ, রসুন ইত্যাদি দুর্গন্ধজাতীয় জিনিস না খেয়ে যাওয়া উত্তম। 

লেখক: আলেম ও সাংবাদিক