চট্টগ্রামে জলবায়ু পরিবর্তন ও জনস্বাস্থ্য বিষয়ক বিভাগীয় কর্মশালায় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক) এর কড়া সমালোচনা করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৮ অক্টোবর) সকাল ১০টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত নগরীর জিইসি মোড়ে একটি রেস্টুরেন্টে অনুষ্ঠিত কর্মশালার মুক্ত আলোচনায় চট্টগ্রামের শীর্ষ এই দুই সরকারি সংস্থার কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনা করেন অংশীজনরা।
তারা বলেন, ‘চসিক ও চউক সবচেয়ে অপেশাদার সংস্থা। এ সংস্থা শহরের বাসিন্দাদের বসবাসের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। শুধু তাই নয় পরিবেশ রক্ষার বদলে এরা পরিবেশকে গলাটিপে হত্যা করছে। সেইসাথে অপরিকল্পিত শহরে রূপ দিয়েছে প্রাণ-প্রকৃতি আর পাহাড়ের শহর চট্টগ্রামকে।’
এই কর্মশালায় জলবায়ু পরিবর্তন রোধে ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে জনস্বাস্থ্যে ক্ষতিকর প্রভাব কমিয়ে আনতে করণীয় নিয়ে সামষ্টিক আলোচনা, গ্রুপ স্টাডি ও মুক্ত আলোচনা হয়।
কর্মশালায় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, গবেষক, পরিবেশবিদ, আবহাওয়াবিদ, পরিবেশকর্মী, স্বাস্থ্যকর্মী, সরকারি দায়িত্বশীল পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গ, চিকিৎসক, সাংবাদিক, সমাজকর্মী, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী, পরিবেশবাদী সংগঠনের নেতাসহ নানা শ্রেণিপেশার মানুষ অংশ নেন।
মুক্ত আলোচনায় অংশীজনরা বলেন, ‘চট্টগ্রাম শহরে ড্রেনে পড়ে মানুষ মারা যাচ্ছে। ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাচ্ছে। যানজট নিরসন হচ্ছে না। নির্বিচারে পাহাড় কাটা হচ্ছে। খাল-নদী-নালা দখল ও দূষণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সার্বিক পরিবেশকে ধ্বংস করা হচ্ছে। অথচ এসব সমস্যা সমাধান না করে শহরের যেটুকু প্রকৃতি বেঁচে আছে সেটুকুকেও হত্যা করা হচ্ছে। মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে এ শহরে। একটু স্বস্তির শ্বাস নেওয়ার জায়গা নেই। আজকে বিপ্লব উদ্যানের সব গাছপালা কেটে ফেলা হয়েছে। বাটালি হিলে নাকি টাওয়ার নির্মাণ করা হবে। টাইগারপাসের আমবাগান রোড়ে গাছপালা কাটার উদ্যোগ নিচ্ছে রেলওয়ে। বৈদ্যুতিক তারের জন্য গাছপালা কাটা হচ্ছে। শহরের সিআরবি, ওয়ার সিমেট্রির মতো জায়গাগুলোকে রক্ষাণাবেক্ষনের কোনো উদ্যোগ নেই। কোনো পরিকল্পনা নেই। কাজির দেউড়ি জিমনেসিয়াম এলাকায় কতগুলো সারি সারি রেস্টুরেন্ট করা হয়েছে। অথচ শহরের মানুষের অবসর কাটানোর মতো কোনো স্থান দিতে পারছে না তারা। ফ্লাইওভার, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নিচের জায়গাগুলোতে কোটি টাকা খরচ করে সবুজায়ন করা হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে সেখানে কিভাবে সবুজায়ন সম্ভব? ওই জায়গাগুলো শহরের যানজট নিরসনে পার্কিং স্পেস হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। একইসাথে জনস্বাস্থ্যের উপর জলবায়ু পরিবর্তনের যে প্রভাব তা নিয়েও কাজ করা হচ্ছে না। এসব নিয়ে কারও কোন চিন্তাও নেই।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মশালায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর শফিক হায়দারের সভাপতিত্বে ও বেলা চট্টগ্রামের সমন্বয়ক মুনীরা পারভীনের পরিচালনায় মূল আলোচনা করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের প্রফেসর অলক পাল।
মুক্ত আলোচনায় আরও বক্তব্য রাখেন, আবহাওয়া অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. সাদেকুল আলম, চসিকের সহকারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ড. রফিকুল ইসলাম, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েরর ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট সায়েন্সেস বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. কামাল হোসাইন, চবির সহকারী প্রক্টর ও ওশানোগ্রাফির প্রফেসর মো. রোকন উদ্দিন, চট্টগ্রাম সিভিল সার্জনের এমওসিএস ড. নওশাদ খান প্রমুখ।
এ আলোচনায় অংশ নেন নগর পরিকল্পনাবিদ জেরিনা হোসাইন, পরিকল্পিত চট্টগ্রামের আহ্বায়ক সুভাষ বড়ুয়া প্রমূখ।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রফেসর ড. অলক পাল।
প্রবন্ধে বলা হয়, ‘বিশ্ব ব্যাংকের প্রকাশ করা ‘কান্ট্রি ক্লাইমেট ও ডেভেলাপমেন্ট’ ২০২২ এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- বাংলাদেশে প্রতি বছর দূষণে প্রতি এক লাখ শিশুর মধ্যে ১৬৯ জন অকালে মারা যাচ্ছে। যার আর্থিক ক্ষতি ধরা হয়েছে চার লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে- জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি ৩০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়বে ফলে তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বর্ধিত ১২.৫ বিলিয়ন ডলারের প্রয়োজন হবে। এছাড়া ২০৫০ সালের মধ্যে শুধু বন্যার কারণে কৃষিখাতে জিডিপি কমবে এক-তৃতীয়াংশ এবং জাতীয়ভাবে ৬.৫ শতাংশ ফসলি জমি সংকুচিত হবে যা খাদ্য নিরাপত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। বৃষ্টিপাত ৪ শতাংশ বাড়লে উপকূলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ২৭ সেন্টিমিটার বাড়তে পারে ফলে সম্পদহানির পরিমাণ হবে ৩০ কোটি ডলারের সমপরিমান। উপরোক্ত সকল বিষয়গুলো মানবস্বাস্থ্যকে নানাভাবে প্রভাবিত করছে।’
ঢাকার আবহাওয়ার তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এখানে স্বাভাবিক আদ্রর্তা কমছে, তাপমাত্রা বাড়ছে এবং গ্রীষ্মের সময়গুলোতে অত্যাধিক বৃষ্টিপাত বাড়ছে। ফলে বায়ু, পানি ও কীট-পতঙ্গবাহিত রোগের প্রার্দুভাবও বাড়ছে। গত ৪৪ বছরের বাংলাদেশে ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে ফলশ্রুতিতে গ্রীষ্মকাল ও শীতকাল দীর্ঘতর হচ্ছে এবং বর্ষাকাল প্রসারিত হচ্ছে। এই পবিবর্তনের সাথে আমাদের স্বতন্ত্র ঋতুগুলোর পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে উঠছে এবং ২০৫০ সাল নাগাদ দেশের তাপমাত্রা ১.৪ ডিগ্রি বৃদ্ধির পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে।
ইউনিসেফ ২০১৯ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানব স্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
কর্মশালার মূল প্রবদ্ধে এসব সমস্যা সমাধানে যে করণীয় নির্ধারণ করা হয়েছে সেগুলো হলো-
১) শিল্প দূষণের মান নির্ধারণ করা, ইটভাটায় ও যানবাহনে গ্রিণ হাউজ গ্যাস কমানোর জন্য নির্গমন হ্রাসকারী প্রযুক্তি ব্যবহার করা।
২) জলবায়ু সংক্রান্ত প্যারিস নীতি অনুযায়ী তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি কমাতে জলবায়ু সংক্রান্ত জাতীয় আইন ও নীতিমালাকে শক্তিশালী করা।
৩) কার্বন প্রশমনের ক্ষেত্রে কৃষি, বন ও ভূমির সর্বোচ্চ ব্যবহারকে প্রাধান্য দেওয়া। তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও বায়ু দূষনজনিত রোগে পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মের উন্নয়ন এবং সেক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে প্রধান্য দেওয়া।
৪) শ্রম সুরক্ষা নীতি এবং এর প্রবিধানগুলো সংশোধন করা এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কর্মীদের পর্যাপ্ত নিশ্চয়তা প্রদান ও জলবায়ু সংবেদনশীল রোগগুলোর প্রাথমিক সর্তকতা এবং রোগ সনাক্ত করার নজরদারিমূলক ব্যবস্থা অর্ন্তভূক্ত করতে হবে এবং এক্ষেত্রে যথাযথ বিনিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে।
৫) স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা যাতে নতুন জলবায়ু সংবেদনশীল ও সংক্রামক রোগের প্রার্দুভাবকে প্রশমিত করতে পারে।
৬) জলবায়ুর প্রভাব বেশি এমন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো সনাক্ত করে খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির নিশ্চয়তা প্রদান, বিশুদ্ধ খাবার পানি, সবার জন্য স্যানিট্যাশন ব্যবস্থা এবং বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিশ্চিত করা।
৭) প্রার্দুভাব প্রশমন করতে টিকার ব্যবস্থা করা এবং ঝুঁকির লক্ষণ আগাম সর্তকতা হিসেবে ঘোষণা করা ও সে অনুযায়ী স্বাস্থ্য সুরক্ষার সরঞ্জাম মজুদ ও সরবারাহ করা।
৮) জলবায়ুর প্রভাব নিরুপনের জন্য সার্বজনীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিশ্চত করা যেমন- স্বাস্থ্যবিমা করা, স্মার্ট জলবায়ু ভিত্তিক কৃষি, শস্য বৈচিত্র্যকরণ, সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
৯) জাতীয় স্বাস্থ্য কর্মপরিকল্পনায় স্বাস্থ্য ঝুঁকির বিষয়গুলোকে একত্রীকরণ করা এবং ঝুঁকি হ্রাসের জন্য পরিস্থিতি পরিবর্তনের সাথে সাথে নতুন তথ্যগুলোকে যুক্ত করা।
১০) জনশিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রম পরিচালনা যেমন- উপযুক্ত কর্ম প্রশিক্ষণ ও তার মান উন্নয়ন করা।
১১) অভিযোজন ভিত্তিক বাসস্থানের ব্যবস্থা করা।
১২) দূর্যোগ পূর্ববর্তী ও পরবর্তী পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য জলবায়ু পরিবর্তনে স্বাস্থ্যের প্রভাব বিষয়ক প্রচার-প্রচারণা জোরদার করা এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশিকা প্রকাশ করা।
১৩) নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এক্ষেত্রে সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি ও অন্যান্য শক্তিকে কাজে লাগানো।
১৪) পানির উৎস সংরক্ষণ এবং উৎসগুলোকে দখল, দূষণের হাত হতে রক্ষা করতে আইনকে কঠোরভাবে প্রয়োগ করা।
১৫) স্বাস্থ্য, কৃষি, পরিবেশের সঠিক ব্যবস্থাপনা ও সঠিক নগর পরিকল্পনা থাকা।
১৬) জলবায়ু মোকাবেলায় পাবলিক-প্রাইভেট পাটনারশিপকে উৎসাহিত করা।
ইফতেখার/পপি/অমিয়/