চট্টগ্রামে গত দশ বছরে অর্ধেকে নেমেছে শুঁটকিপল্লি। মাছের সরবরাহ কম থাকা, শ্রমিকের মজুরি ও লবণের দাম বাড়ায় শুঁটকি তৈরিতে খরচ বেড়েছে। তবে উৎপাদন খরচ বাড়লেও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় লোকসানের কবলে পড়ে অনেক শুঁটকি ব্যবসায়ী ব্যবসা বন্ধ করে দিচ্ছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রামের নোমান কলেজ এলাকায় দশ বছর আগেও প্রায় ১৪০টির শুঁটকিপল্লি ছিল। এখন সেখানে ৩৫টি শুঁটকিপল্লি রয়েছে। এ ছাড়া কর্ণফুলীর দক্ষিণে ইছানগর, জুলধার আশপাশে ৬০ থেকে ৭০টির মতো শুঁটকিপল্লি ছিল। সেটা এখন ৩২টিতে নেমে এসেছে।
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী এলাকার শুঁটকিপল্লিগুলোর শ্রমিকরা জানান, এক সময় ৪০ থেকে ৪৫ প্রজাতির মাছ থেকে শুঁটকি বানানো হলেও এখন তা অনেক কমে এসেছে। বর্তমানে শুঁটকিপল্লিগুলোতে ফাইশ্যা, ছুরি, লইট্টা, মধুভাইস্যা, পোয়া মাছ, রূপচাঁদা, পোপা, বিভিন্ন প্রজাতির হাঙর মাছ, পাতা মাছসহ ১২ থেকে ১৫ প্রজাতির মাছ থেকে শুঁটকি তৈরি করা হচ্ছে।
জানা গেছে, সাগরে জেলেদের জালে প্রচুর মাছ ধরা পড়ছে। কিন্তু কাঁচা মাছে জেলেরা ভালো মুনাফা পাওয়ায় তারা শুঁটকিপল্লিতে মাছ কম সরবরাহ করছেন।
শুঁটকি উৎপাদকরা জানান, সপ্তাহে শনিবার, মঙ্গলবার বাজার বসে। আসাদগঞ্জ থেকে শুরু করে সারা দেশের ক্রেতারা সেখানে শুঁটকি কিনতে আসেন। ক্রেতা সিন্ডিকেট করে শুঁটকি কিনতে আসেন। তাই উৎপাদন খরচ বাড়লেও সে অনুপাতে লাভ হয় না। এক কেজি লইট্টা শুঁটকি বানাতে ছয় কেজি কাঁচা মাছ প্রয়োজন হয়।
প্রতিকেজি লইট্টা ১৫০ টাকা করে কিনতে হয়। সে হিসাবে ছয় কেজি লইট্টার দাম পড়ে ৯শ টাকা। তার ওপর প্রক্রিয়াজাতে খরচ লাগে আরও ৫০ টাকার মতো। সব মিলিয়ে এক হাজার টাকা খরচ পড়লেও সে টাকায় তো বিক্রি করা সম্ভব হয় না। তার ওপর শুঁটকি পচনশীল। বৈরী আবহাওয়া বা একটানা দুই-চার দিন বৃষ্টি থাকলে শুঁটকির গুণগত মান নষ্ট হয়ে যায়। ভালো দামে বিক্রি করা সম্ভব হয় না। এসব কারণে শুঁটকি উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছেন অনেকে।
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী এলাকার শুঁটকি উৎপাদনকারী আমির আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘শুঁটকির উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। মহিলা শ্রমিকদের আমরা তিন বছর আগে দিনে মজুরি দিতাম ১৫০ টাকা। গত বছর দিয়েছি ২৫০ টাকা। আর বর্তমানে দিতে হচ্ছে ৪০০ টাকা। অপরদিকে পুরুষ শ্রমিকদের তিন বছর আগে দিতাম ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। আর এখন দিতে হয় ৭০০ টাকা। এর পাশাপাশি লবণের দামও বেড়েছে। দুই বছর আগে প্রতিবস্তা (৭৪ কেজি) লবণ কিনতাম ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা দরে। আর এখন কিনতে হয় ১ হাজার ৫০ টাকা থেকে ১ হাজার ১০০ টাকায়। আগে শুঁটকি মাছের ব্যবসা করে জীবন গোছানোর সুযোগ ছিল। আর এখন জীবন-জীবিকা নির্বাহ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।’
অপরদিকে আসাদগঞ্জের আড়তদাররা জানান, দেশে উৎপাদিত শুঁটকি দিয়ে চাহিদা মেটানো সম্ভব হয় না। তাই আমদানি করতে হচ্ছে। আমাদের দেশে যদি শুঁটকির উৎপাদন বাড়ত তা হলে অন্যান্য দেশের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার প্রয়োজন হতো না। পাশাপাশি উৎপাদকরাও ভালো দাম পেতেন। সরকারের এ বিষয়ে নজর দেওয়া উচিত বলে মনে করছেন তারা।
চট্টগ্রামের আসাদগঞ্জ এলাকার শুঁটকি বিক্রেতা মো. নাছির আহমেদ বলেন, সাগরে প্রচুর মাছ আছে। কিন্তু শুঁটকি উৎপাদন করতে যে খরচ লাগে, বিক্রি করে সে টাকা পাওয়া যায় না। তাই মাছ বিক্রি করে বেশি লাভ পাওয়ায় শুঁটকির উৎপাদন কমে গেছে। তাই দামটাও আগের তুলনায় বেশি।
আসাদগঞ্জ শুঁটকি ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ওসমান হায়দার রানা বলেন, ‘চাহিদা মোতাবেক শুঁটকি বাজারে আসছে না। দশ বছর আগেও আসাদগঞ্জে শুঁটকির জন্য আমরা হাঁটতে পারতাম না। কিন্তু এখন কাঁচা মাছে লাভ বেশি। তাই শুঁটকি উৎপাদন কমে গেছে। এখন উল্টো আমদানি করে শুঁটকির চাহিদা মেটাতে হচ্ছে। আমাদের দোকানগুলোতে ৫০ ভাগ আমদানি করা শুঁটকি এবং ৫০ ভাগ দেশীয় শুঁটকি রয়েছে। বর্তমানে বেশির ভাগ শুঁটকি মায়ানমার, ভারত, পাকিস্তান ও দুবাই থেকে আমদানি করা হচ্ছে।’
চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শ্রীবাস চন্দ্র চন্দ খবরের কাগজকে বলেন, ‘আগে জেলেরা সাগর থেকে মাছ ধরে আনার সময় অনেক মাছ পচে যেত। তখন ওই মাছ দিয়ে শুঁটকি বানাতো। সময়ের সঙ্গে জেলেদের চিন্তা-ভাবনার পরিবর্তন হয়েছে। তারা এখন গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়ার সময় বরফ নিয়ে যান। ফলে মাছ পচে যাওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু লাভ বেশি হওয়ায় জেলেরা এখন মাছ বিক্রি করে দেন, এটা সত্য। তার উপর লবণের দামও বেড়েছে। ফলে শুঁটকির উৎপাদন কমে গেছে। শুঁটকির উৎপাদন বাড়াতে হলে উদ্যোক্তাদের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে শুঁটকি উৎপাদনের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এবিষয়ে সরকারের একটি প্রকল্প রয়েছে। আমরা শিগগিরই সেটা বাস্তবায়ন করব। তাহলে নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে। কেমিক্যাল প্রয়োগ ছাড়াই শুঁটকির উৎপাদনও বাড়বে। তখন রপ্তানিও বাড়বে বলে আমরা আশা করি।’