ঘন কুয়াশার কারণে খুলনায় গত কয়েক দিন ধরে কনকনে শীত অনুভূত হচ্ছে। বৈরী আবহাওয়ায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। সেই সঙ্গে শিশু ও বয়স্করা শীতজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। শিশুদের জ্বর, ডায়রিয়া, সর্দি-কাশি, নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্ট দেখা দিয়েছে। বয়স্করা আক্রান্ত হচ্ছেন জ্বর, কাশি, ডায়রিয়াসহ শ্বাসতন্ত্রের নানা ধরনের সংক্রমণে।
চিকিৎসকরা বলছেন, অতিরিক্ত ঠাণ্ডায় শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়ছে। ফলে বিভিন্ন হাসপাতাল-ক্লিনিকে রোগীর চাপ বেড়েছে। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার হার প্রায় দ্বিগুণ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খুলনা শিশু হাসপাতালে ডিসেম্বর মাসে শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে ১ হাজার ৩৮২ শিশু ভর্তি হয়েছে। বহির্বিভাগে চিকিৎসাসেবা নিয়েছে আরও ১৩ হাজার ৪৮২ জন। ৬ জানুয়ারি এক দিনে হাসপাতালে নতুন শিশু রোগী ভর্তি হয় ৪৫ জন। একই দিন বহির্বিভাগ থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন ১৮৩ জন।
খুলনা শিশু হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা সাত মাস বয়সী তাবাসসুমের বাবা মো. ইলিয়াস ফকির জানান, গত তিন দিন ধরে তার সন্তান জ্বরে আক্রান্ত। শ্বাস নেওয়ার সময় বুকের মধ্যে শব্দ হয়। হাসপাতালে আনার পর পরীক্ষা-নিরীক্ষায় নিউমোনিয়া ধরা পড়ে। অন্য ওষুধের সঙ্গে প্রতিদিন তিনবার নেবুলাইজার দেওয়া হচ্ছে। এখন অবস্থা আগের থেকে কিছুটা ভালো।
অন্যদিকে জ্বর, ডায়রিয়ায় আক্রান্ত ১১ মাসের শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করেছেন খুলনার ডুমুরিয়ার ইদ্রিস সানা। তিনি বলেন, ‘কয়েক দিন ধরে জ্বর, ডায়রিয়ায় বেশ কষ্ট পাচ্ছে। শুধু আমার সন্তান নয়, আশপাশের বাসার অনেক বাচ্চাই এখন ঠাণ্ডা-জ্বরে আক্রান্ত।’
টানা ছয় দিন ধরে জ্বর, কাশি, সর্দিতে আক্রান্ত নগরীর হাজি ইসমাইল রোডের বাসিন্দা ইব্রাহিম হোসেন (৬২)। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বাড়িতে রেখেই ১২ ঘণ্টা পরপর তাকে অ্যান্টিবায়োটিক ইনজেকশন দেওয়া হচ্ছে। ইব্রাহিম হোসেনের ছেলে
রবিউল হোসেন জানান, হাসপাতালে রোগীর ভিড়ে সংক্রমিত হওয়ার ভয়ে তাকে বাড়িতে রেখেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
খুলনার বেসরকারি গাজী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আশিকুর রহমান জানান, গত দুই সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন গড়ে ২৫০-২৮০ জন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসছেন। তাদের মধ্যে অধিকাংশই শীতজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত।
খুলনা আবহাওয়া অফিস বলছে, কয়েক দিন ধরে খুলনায় শীত জেঁকে বসেছে। জেলার তাপমাত্রা ১১ থেকে ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে। এ অবস্থা থাকবে আরও বেশ কয়েক দিন।
খুলনা আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মিজানুর রহমান জানান, ৬ জানুয়ারি খুলনায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আগের দিন ৫ জানুয়ারি তাপমাত্রা ছিল ১২.৭ ডিগ্রি। আগামী কয়েক দিন তাপমাত্রা একই অবস্থায় থাকবে।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, চলতি বছর হঠাৎ করে শীত বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতালগুলোতে ঠাণ্ডাজনিত রোগীর সংখ্যা দুই থেকে তিন গুণ বেড়ে গেছে। আক্রান্ত অনেক শিশুকে হাসপাতালে দেরি করে আনা হচ্ছে। রোগাক্রান্ত হওয়ার পর অভিভাবকরা শিশুদের শুরুতে স্থানীয় ফার্মেসির ওষুধ খাওয়াচ্ছেন। এতে শারীরিক জটিলতা বাড়ছে। দুই বছরের কম শিশুদের ব্রংকিউলাইটিস এবং দুই বছরের বেশি বয়সী শিশুদের নিউমোনিয়া দেখা দিচ্ছে।
খুলনা শিশু হাসপাতালের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. কামরুজ্জামান জানান, যাদের অ্যাজমা আছে, শীতে তা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে এই সময়টাতে যেন শিশুরা পর্যাপ্ত পানি পান করে। বড়দের যদি জ্বর, সর্দি, কাশি হয়, তাহলে তারা যেন বাসায় মাস্ক ব্যবহার করেন। খেয়াল রাখতে হবে, তারা যখন হাঁচি, কাশি দেবেন তাদের মাধ্যমে যেন শিশুরা সংক্রমিত না হয়।
তিনি বলেন, ছয় মাসের বেশি বয়সের শিশুদের ফল, মধু পানি, ফলের রস খাওয়াতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে অতিরিক্ত ঠাণ্ডা যেন না লাগে। আবার ঘেমেও যেন না যায়। সকালে কিছুক্ষণ রোদে রাখতে হবে। তবে বাতাস যেন না লাগে।
খুলনা গাজী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের রেজিস্ট্রার ডা. শরীফ আশরাফুল হাবিব বলেন, শীতের সময় শিশুরা ডায়রিয়ায় বেশি আক্রান্ত হয়। শীতে শিশুদের সাধারণ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। এ ক্ষেত্রে তারা সাধারণত ভাইরাসজনিত রোগে বেশি আক্রান্ত হয়।