ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বরাদ্দে কেনা মালামাল বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। গরীব মাদরাসাছাত্রের নামে বরাদ্দ বাইসাইকেল জালিয়াতির মাধ্যমে নিজে স্বাক্ষর করে নাতিকে উপহার দিয়েছেন কোটচাঁদপুর উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা তাজুল ইসলাম।
বিষয়টি জানাজানি হলে জেলাজুড়ে তীব্র সমালোচনার ঝড় ওঠে। পরে স্থানীয় সংসদ সদস্য মতিয়ার রহমানের নির্দেশে বুধবার (১ জুন) সাইকেলটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে ফেরত দিতে বাধ্য হন তাজুল ইসলাম।
এডিপির ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বিশেষ বরাদ্দে বাইসাইকেল, ছাগল, স্প্রে মেশিন, সেলাই মেশিন, ফুটবল ও হুইল চেয়ারসহ বিভিন্ন সামগ্রী কেনা হয়।
সরকারি বরাদ্দে কেনা এসব সামগ্রী স্থানীয় জামায়াত ও বিএনপি নেতারা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেন।
কোটচাঁদপুর কামিল মাদরাসার সপ্তম শ্রেণির ছাত্র সাইমুন ইসলামের নামে একটি বাইসাইকেল বরাদ্দ করা হয়েছিল। কিন্তু সেই সাইকেল তাকে দেওয়া হয়নি। কোটচাঁদপুর উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা তাজুল ইসলাম নিজেই মাস্টাররোলে স্বাক্ষর করে বাইসাইকেলটি তার মেয়ের বাড়িতে পাঠিয়ে দেন।
সাইমুন জানায়, তার নামে বরাদ্দ হওয়া সাইকেলটি প্রথমে তাকে দেওয়া হয়নি। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয়দের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় শুরু হলে বুধবার দুপুরে সাইকেলটি তাদের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়।
জামায়াত আমিরের পাশাপাশি স্থানীয় বিএনপি নেতারাও সরকারি বরাদ্দের সাইকেল, সেলাই মেশিন ও স্প্রে মেশিন নিজেদের স্বজনদের মাঝে ভাগ বাটোয়ারা করে নিয়েছেন।
মাওলানা তাজুল ইসলাম দাবি করেন, সাইকেলটি তার প্রতিবেশী এক ছেলেকে দেওয়া হয়েছিল।
তবে পরে বক্তব্য বদলে তিনি বলেন, ‘তার ছেলে বেকার এবং আর্থিকসংকটে থাকায় সাইকেলটি তার নাতনি মারিয়াকে দেওয়া হয়েছিল।’
একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, ‘বরাদ্দের এসব সরকারি মালামাল স্থানীয় জামায়াত ও বিএনপি নেতারা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিয়েছেন।’
সাবেক পৌর মেয়র ও কোটচাঁদপুর উপজেলা বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন বুলবুল সিডল সরকারি মালামাল দলীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে ভাগাভাগি ও অনিয়মের বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘স্থানীয়দের মাঝে যা শোনা যাচ্ছে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। বিষয়টি খারাপ দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। প্রশাসনের উচিত দ্রুত তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া।’
তাজুল ইসলামের এমন কর্মকাণ্ডে দুঃখ প্রকাশ করে জামায়াত সমর্থক ও সাবেক মাদরাসাশিক্ষক শের আলী বলেন, ‘মাওলানা তাজুল ইসলাম একজন সচ্ছল মানুষ। তিনি কোটচাঁদপুরের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলেন। একজন দায়িত্বশীল মানুষের দরিদ্র ছাত্রের নামে বরাদ্দ করা এডিপির টাকায় কেনা বাইসাইকেল জালিয়াতি করে নেওয়া মোটেও ঠিক হয়নি।’
সাইকেল কেলেঙ্কারির বিষয়টি ঝিনাইদহ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মতিয়ার রহমানের নজরে আসলে তার নির্দেশে সাইকেলটি উপজেলা নির্বাহী অফিসে ফেরত আনা হয়।
কোটচাঁদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দীপা রানী ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘বাইসাইকেল বিতরণে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ ওঠেছিল। সাইকেলটি ফেরত আনা হয়েছে এবং এটি নতুন করে প্রকৃত উপকারভোগীর মাঝে বিতরণ করা হবে।’
তিনি আরও বলেন, এডিপির বরাদ্দে কেনা বাইসাইকেল ছাড়াও অন্যান্য সামগ্রী বিতরণে আর কোনো অনিয়ম হয়েছে কিনা, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মাহফুজুর রহমান/অদিতি/