কুড়িগ্রামের চিলমারীর কাঁচকোল এলাকায় ব্রহ্মপুত্র নদের ডান তীররক্ষা বাঁধে এক মাসে চার দফায় ধস দেখা দিয়েছে। ৪৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বাঁধের বিভিন্ন অংশ ভেঙে পড়ায় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন বাঁধের ওপর বসবাসকারী মানুষ। জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
গত সোমবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে বাঁধের প্রায় ৩০ মিটার অংশ ধসে পড়ে। রাতে মসজিদের মাইকে বিষয়টি জানিয়ে এলাকাবাসীকে ডাকা হয়। পরে স্থানীয়রা জড়ো হয়ে বাঁধের ওপর থাকা পাউবোর বালুভর্তি জিও ব্যাগ ভাঙন এলাকায় ফেলে তা রোধের চেষ্টা করেন। এতে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে ভাঙন। মঙ্গলবার সকাল থেকে আবারও জিও ব্যাগ ডাম্পিং শুরু করে পাউবো।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার দুপুরে একই এলাকায় প্রায় ৬০ মিটার বাঁধ ধসে যায়। চলতি জুলাই মাসে বাঁধটির ৪ স্থানে অন্তত ২০০ মিটার ধসে গেছে। এ ছাড়া অনেক জায়গায় ধসের উপক্রম হয়েছে। ফলে এক দশক না যেতেই ৪৪৮ কোটি টাকার বাঁধটি টিকবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন এলাকাবাসী। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন পাউবোও।
বাঁধ ধসে পড়ায় ঝুঁকিতে পড়েছে বাঁধের ওপর বসবাসকারী হাজারও মানুষের বসতভিটা, বাঁধসংলগ্ন বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, কয়েকটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন ও মসজিদ। বাঁধের পশ্চিম পাশে থাকা কয়েক হাজার একর সমতল আবাদি জমি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও করছেন স্থানীয়রা।
পাউবো জানায়, চিলমারী উপজেলার রানীগঞ্জ ইউনিয়নের কাঁচকোল এলাকায় ২০১৬ সালে ৪৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে বাঁধটি নির্মাণ করা হয়। ২০১৮ সালের বন্যায় প্রথম বাঁধের একটি অংশ ধসে যায়। এর পর থেকে বর্ষা এলেই বিভিন্ন স্থানে ধসে দেখা দেয়। চলতি মাসে চারটি স্থানে ২০০ মিটারের বেশি ধসে গেছে। সব মিলিয়ে দেড় কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ছোট-বড় অন্তত ১০টি স্থানে ধস দেখা যাচ্ছে।
মঙ্গলবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বাঁধের ওপর জিও ব্যাগে বালু ভরার কাজ চলছে। বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে পাউবোর কাজ দেখা গেছে। পাউবো জানায়, ভাঙন ঠেকাতে চার দফায় ২৪ হাজার জিও ব্যাগ বরাদ্দ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১৪ হাজার জিও ব্যাগ ডাম্পিং করা হয়েছে। বাকি ব্যাগ ডাম্পিংয়ের কাজ চলছে।
তবে স্থানীয়রা বলছেন, এভাবে জিও ব্যাগে ভাঙন আটকানো সম্ভব নয়। প্রতিদিনই নতুন নতুন জায়গায় বাঁধ ধসে যাচ্ছে। তারা পুরো বাঁধ সংস্কারের পাশাপাশি কয়েকটি টি-বাঁধ নির্মাণের দাবি জানান।
বাঁধের বাসিন্দা ফরজ উদ্দিন ডেসকা ব্যাপারী বলেন, ‘কাল সন্ধ্যায় মুহূর্তের মধ্যে বাঁধ ভাঙা শুরু হয়। ততক্ষণে তো সবাই চলে গেছে। পরে পাশের মসজিদের মাইকে সবাইকে বলি, সবাই আসেন। এখানে বালুভর্তি ৭০০ জিও ব্যাগ ছিল। সবাই মিলে সেগুলো ফেলে দেই। তার পর কিছুটা রক্ষা হয়। সকালবেলা ওয়াপদার লোকজন এসে আবার বস্তা ফেলে।
ওই এলাকার সৈয়দ আলী বলেন, ‘যে বস্তা ফেলছে তা দিয়ে কিছু সময় টেকা যাবে। পরে শুকনো মৌসুমে কাজ না করলে এসব করে টেকা সম্ভব নয়। বাঁধ না টিকলে এ এলাকা টিকবে না। চিলমারী উপজেলা শহরও বন্যায় ভাসবে।
ভাঙন এলাকায় কাজ করা ঠিকাদার প্রতিনিধি সর্দার মজিবর রহমান বলেন, নদীর প্রবল স্রোতের কারণে ফেলা জিও ব্যাগ কোথায় যাচ্ছে, তারও হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। ছোট পরিসরে জিও ব্যাগ দিয়ে ভাঙন ঠেকানো সম্ভব নয়। এক সঙ্গে অন্তত এক লাখ জিও ব্যাগ বরাদ্দ এবং এই এলাকায় তিনটি টি-বাঁধ নির্মাণ করা হলে নদীর স্রোত তীর থেকে সরে যাবে। ফলে ভাঙনও কমে আসবে।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, ‘নদের পূর্ব তীরে নতুন করে বড় ধরনের চর সৃষ্টি হয়েছে। ফলে স্রোত পশ্চিম তীরে বাঁধ ঘেঁষে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বাড়ার ফলে স্রোতও বেড়ে গেছে। এ কারণে বাঁধ ভাঙছে বারবার। তিনি বলেন, চলতি মাসে চারটি স্থানে ধসে গেছে। সেখানে ২৪ হাজার জিও ব্যাগ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মঙ্গলবার পর্যন্ত ১৪ হাজার বালুভর্তি জিও ব্যাগ ডাম্পিং করা হয়েছে। কাজ চলমান রয়েছে। দু-একদিনের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে।
টি-বাঁধ বা স্থায়ী প্রকল্পের বিষয়ে তিনি বলেন, পুরো বাঁধ সংস্কারে একটি প্রকল্প পাঠানো হয়েছিল। সেটি অনুমোদন হয়নি। নতুন প্রকল্প পাঠানো হবে। অনুমোদন হলে বরাদ্দ নিয়ে কাজ করা হবে।