অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের বয়স এক মাস হলো। এর মধ্যেই গুজবের ফাঁদে পড়েছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং তথ্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম। সম্প্রতি বিডি প্যানোরোমা নামের একটি ওয়েবসাইটে ‘কোটায় চাকুরি পেলেন উপদেষ্টা নাহিদের বোন ফাতেমা তাসনিম’ শীর্ষক শিরোনামে প্রকাশিত একটি সংবাদ ইন্টারনেটে ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। কিন্তু এই নিউজটি যে ভুয়া তা খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছে ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার।
গত ৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত কথিত এই সংবাদে এক নারীর ছবি ব্যবহার করে তার নাম ফাতিমা তাসনিম উল্লেখ করে দাবি করা হয়, ‘তথ্য ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা, কোটা আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামের বড় বোন ফাতেমা তাসনিমকে চাকুরি পেয়েছেন বিশেষ বিবেচনায়।
ফাতেমা তাসনিমকে কানাডাস্থ বাংলাদেশ মিশনের পাবলিক রিলেশন অফিসার হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। মূলত তাকে কানাডাস্থ বাংলাদেশ মিশনে সম্প্রতি চাকুরিচ্যুত মিথিলা ফারজানার স্থানে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ৩ বছরের মেয়াদে ফাতেমা তাসনিম এই চাকুরি পেয়েছেন। তাকে আগামী ১ অক্টোবর কানাডায় জয়েন করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়।
ফাতেমা তাসনিম জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংলিশে অনার্স ও মাস্টার্স করে মগবাজারে একটি কোচিং সেন্টারে পড়াতেন। এদিকে বিশেষ বিবেচনায় এই নিয়োগে ফাতেমা তাসনিম তার স্বামী আরিফ সোহেলসহ কানাডা যেতে পারবেন বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। এই নিয়োগপত্রে ফাতেমা তাসনিম টরন্টোতে বাংলাদেশ মিশনের ভাড়া করা বাসা, ড্রাইভারসহ গাড়ি ছাড়াও প্রতিমাসে ৬ হাজার কানাডিয়ান ডলার বেতন পাবেন।’
রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, যে নারীর ছবি ব্যবহার করে আলোচিত দাবিটি প্রচার করা হয়েছে তিনি উপদেষ্টা নাহিদের বোন নন এবং তিনি কোনো সরকারি চাকরিও পাননি। আসলে তিনি গণঅধিকার পরিষদের নেত্রী এবং নাহিদের রাজনৈতিক সহকর্মী। এই দুজনের মধ্যে আত্মীয়তার কোনো সম্পর্ক নেই।
রিউমর স্ক্যানার বিডি প্যানোরোমা ওয়েবসাইটি বিশ্লেষণ করে দেখেছে, সাইটটিতে মাত্র চারটি নিউজ বিদ্যমান। এর ডোমেইন ২০২৩ সালের ৩ আগস্ট রেজিস্ট্রেশন করা হয়। তবে সাইটটির অস্তিত্ব পাওয়া যায় ২০১৫ সাল থেকে৷ সে সময় থেকেই নিয়মিত এই সাইটে মনগড়া সংবাদ প্রকাশ করা হচ্ছে। সেগুলো পরে আবার সরিয়েও নেওয়া হয়। সে বছরই একই নামে একটি ফেসবুক পেজও খোলা হয়। পেজটি বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে একজন এবং যুক্তরাজ্য থেকে দুইজন অপারেট করছেন।
প্রকাশিত ওই সংবাদে কথিত তথ্যের বিপরীতে কোনো সূত্র বা প্রজ্ঞাপনের বিষয়ে উল্লেখ করা হয়নি। নিয়োগ দেওয়ার এখতিয়ার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের। তবে এই সংবাদে সে বিষয়ে কোনো উল্লেখ নেই। উল্টো দাবি করা হচ্ছে, ফাতিমাকে কানাডায় যোগ দিতে নির্দেশনা দিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এই ওয়েবসাইট এবং এর ফেসবুক পেজের কন্টেন্ট বিশ্লেষণে রিউমর স্ক্যানারের কাছে এটিকে ভুঁইফোঁড় সাইট বলে প্রতীয়মান হয়েছে।
রিউমর স্ক্যানার পরবর্তীতে কথিত সংবাদে উল্লিখিত তথ্যগুলো যাচাই করে। ফাতেমা রিউমর স্ক্যানারকে জানান, এটা পুরোটাই একটা ভুয়া নিউজ। এর সঙ্গে বাস্তবে কোনো সত্যতা নেই।
পড়াশোনা প্রসঙ্গে ফাতিমা রিউমর স্ক্যানারকে বলেন, ‘আমি এই ইউনিভার্সিটি (জগন্নাথ) থেকে পড়াশোনা করিনি। সবকিছুই অসত্য ও মিথ্যা।’
তাছাড়া, জাতীয় দৈনিক প্রথম আলোকে উপদেষ্টা নাহিদ জানিয়েছেন, ‘ফাতিমা তাসনিম নামের এই নারী আমার পরিবারের কেউ নন। তার সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগও নেই।’
পরবর্তী অনুসন্ধানে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ফাতিমার কথিত এই নিয়োগের বিষয়ে কোনো প্রজ্ঞাপন দিয়েছে কিনা তা জানতে মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের সংশ্লিষ্ট শাখায় সম্প্রতি এমন কোনো প্রজ্ঞাপনের তথ্য মেলেনি। কানাডার অটোয়া হাইকমিশনের ডেপুটি হাইকমিশনার দেওয়ান হোসনে আইয়ুব রিউমর স্ক্যানারকে বলেছেন, তারাও এ বিষয়ে কিছু জানেন না।
অর্থাৎ, বিডি প্যানোরোমার সাইটে গণপরিষদ নেত্রী ফাতিমা তাসনিমের ছবি ব্যবহার করে তাকে উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামের বোন বলে দাবি করা হলেও আদতে তাদের মধ্যে কোনো আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই। ফাতিমা কানাডার বাংলাদেশ মিশনে চাকুরিও পাননি। এমনকি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়েও তিনি পড়াশোনা করেননি।
তবে ফাতিমা তাসনিম নামে নাহিদের একজন বড় বোন থাকার দাবি পাওয়া যাচ্ছে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপির বরাতে হওয়া সংবাদে। গত ২৬ জুলাই বিবিসি সংস্থাটির বরাত দিয়ে জানায়, কোটা সংস্কার আন্দোলনের তিন সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ ও আবু বকর মজুমদারকে সাদা পোশাকে ছয়জন তুলে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ করেছেন নাহিদের বড় বোন ফাতেমা তাসনিম।
এ বিষয়ে সেসময় দেশি-বিদেশি একাধিক গণমাধ্যমেই সংবাদ প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে ডয়চে ভেলে বাংলা, দ্য ডেইলি স্টার, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, আমার বার্তা রয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে অধিকতর অনুসন্ধানে আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে ফাতিমাকে বক্তব্য দিতে দেখা যায়। বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই নারীই গণঅধিকার পরিষদের নেত্রী ফাতিমা তাসনিম।
ফাতিমা তাসনিম এ বিষয়ে রিউমর স্ক্যানারকে বলেন, ২১ জুলাই যখন নাহিদকে মেরে পূর্বাচলে ফেলে রেখে যাওয়া হয় তখন তাকে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে নাহিদের বড় বোনের পরিচয় দিয়ে ভর্তি করান তিনি। তবে এ সময় নাহিদের স্ত্রীও সঙ্গে ছিলেন।
সব কিছু বিশ্লেষন করে দেখা যায়, গণঅধিকার পরিষদের নেত্রী ফাতিমা তাসনিম ও উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামকে জড়িয়ে প্রচারিত সংবাদটি সম্পূর্ণ গুজব।
অমিয়/