কথায় আছে ‘নামে নামে জমে টানে’। এ ক্ষেত্রে জমে টানেনি, কারন কোথাও একটু ভুল ছিল। এই ভুলেই বিতর্ক বা বিভ্রাট সৃষ্টি হয়েছে। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কাজে এমন একজন মানুষকে নিয়োজিত করা হয়েছে যার নাম নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে তুমুল ঝড়। দেখা যায় নামের একটা অংশ অর্থাৎ ‘রাজ’ ঠিকই আছে কিন্তু যত গণ্ডগোল ‘সফর’ আর ‘সরফ’ নিয়ে। বিষয়টি নিয়ে বিশ্লেষণ করেছে ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস গত ১১ সেপ্টেম্বর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে সংস্কারের মাধ্যমে জাতি হিসেবে নতুনভাবে যাত্রা শুরু করতে প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে ছয়টি কমিশন গঠন করার সিদ্ধান্তের কথা জানান। এর মধ্যে পুলিশ প্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে ‘সরফরাজ চৌধুরী’ কাজ করবেন বলে জানান তিনি।
তার ভাষণে দেওয়া এই তথ্যের পর দেশের অনেক গণমাধ্যমে সরফরাজ চৌধুরী নামে এক ব্যক্তির ছবি ব্যবহার করে খবরটি প্রচার করা হয়। আর এই ছবি প্রকাশের পরই শুরু হয় সমালোচনা।
যদিও প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে পাঠানো স্ক্রিপ্টে বা কার্যালয় সূত্রে সরফরাজ চৌধুরীর কোনো ছবি সরবরাহ করা হয়নি। গণমাধ্যমগুলোও সরফরাজ চৌধুরীর বিষয়ে বাড়তি কোনো তথ্য দেয়নি।
রিউমর স্ক্যানার যাচাই করে দেখেছে, এসব সংবাদমাধ্যমে ব্যবহৃত ছবিটি চট্টগ্রামের সাবেক সিভিল সার্জন ডা. সরফরাজ চৌধুরীর। তিনি ২০১৪ সালে চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জনের পাশাপাশি চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ওই সময়ে জেনারেল হাসপাতালের যন্ত্রপাতি কেনার দুর্নীতির অভিযোগে একটি মামলাও হয় তার বিরুদ্ধে। ২০২২ সালে তাকে এই মামলায় কারাবরণও করেন। পরে ২০২৩ সালে তিনি চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য মনোনীত হন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই বিষয়টি নিয়ে তাৎক্ষণিক সমালোচনাও হয়েছে।
এর পর বিষয়টি নিয়ে সরফরাজ চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলে রিউমর স্ক্যানার। তিনি ব্যক্তি পুলিশ প্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণের কোনো প্রস্তাব পেয়েছেন কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সবই আপনাদের দোয়া ভাই। আমি শুনেছি আমাকে এমন পদে নিয়োগ করা হয়েছে। আমি আমার সর্বোচ্চটা দিয়ে কাজ করব। আমার দুয়ার আপনাদের জন্যে সবসময় খোলা থাকবে।’
তাকে কোনো অফিসিয়াল বার্তা পাঠানো হয়েছে কি না? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘না, এমন কিছু আমি এখনো পাইনি। তবে আপনাদের মাধ্যমে জানতে পারছি যে আমাকে নিয়োগ করা হয়েছে।’
এরই মধ্যে আরেকটি গণমাধ্যমের সূত্রে রিউমর স্ক্যানার জানতে পারে, পুলিশ প্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন সফর রাজ হোসেন।
খেয়াল করলে দেখা যায়, ‘সরফরাজ’ না লিখে ‘সফর রাজ’ লিখেছে ওই গণমাধ্যমটি। তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব বলেও তাদের প্রতিবেদনে জানানো হয়।

পরে বিষয়টি নিয়ে আরও গভীরে যায় রিউমর স্ক্যানার। এর সত্যতাও পায়। সফর রাজ ২০০৩ সালের ১৪ অক্টোবর থেকে ২০০৫ সালের ২০ মার্চ পর্যন্ত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর ২০০৯ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ইউএসএআইডির উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন। এখন সফর রাজ ফেডারেল ইন্সুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের অডিট কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আছেন।
রিউমর স্ক্যানার টিম এ সংক্রান্ত সার্বিক বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করে মনে হয়েছে, প্রধান উপদেষ্টার ভাষণের স্ক্রিপ্টে সম্ভবত ভুলে ভিন্ন নাম এসেছে। কারণ সাবেক একজন সিভিল সার্জনের পুলিশ সংস্কারের দায়িত্ব পাওয়ার কথা নয়। তার চেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য হবে জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক একজন সচিবের এই দায়িত্ব পাওয়া।
বিষয়টি নিশ্চিত হতে রিউমর স্ক্যানার প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ মজুমদারের সঙ্গে কথা বলে। তাকে বিষয়টি জানানোর পর তিনি বলেন, ভুলবশত ভিন্ন নাম এসেছে। মূলত এই দায়িত্ব যিনি পাচ্ছেন তার নাম সফর রাজ হোসেন। পরবর্তীতে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে দেওয়া এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমেও এ বিষয়ে সংশোধনী পাঠানো হয়।
অর্থাৎ, প্রধান উপদেষ্টার ভাষণের জন্য তৈরি ভাষণের স্ক্রিপ্টে নামের বানান ভুল উল্লেখ করায় ড. ইউনূস ভুল বানানটি উচ্চারণ করেছেন। এর ফলে গণমাধ্যমেও ভুল ব্যক্তির ছবি এসেছে।
অমিয়/