একটি লাল মোরগের রক্ত। দুটি লুঙ্গি এবং একটি গামছা। তাবিজ-কবজ লিখতে মেশকো জাফরান কালি। এমনই কয়েকটি জিনিসের লিস্ট ধরিয়ে দিলেন ওয়াজেদ ফকিরের কাছে তদবির নিতে আসা চম্পা বেগমকে।
তখনকার সময়ে এক তোলা জাফরানের দাম ছিল ১ হাজার ৭০০ টাকা। চম্পা বেগম জিনিসপত্রের তাগাদা পেয়ে লুঙ্গি আর গামছা কিনে বিরস বদনে ফিরে এলেন। তিনি লাল মোরগের দেখা পাননি।
তদবির নিতে আসা চম্পা বেগম সারা বাজার ঘুরেছেন একটি লাল মোরগের জন্য। কিন্তু না। বাজারের অলিগলিতে ঘুরেও লাল মোরগের দেখা তিনি পাননি। তাই তো বিরস মুখে তিনি ফিরে এসেছেন। তদবির নিতে আসা চম্পা আসল মেশকো জাফরান চিনবেন না বলে ওয়াজেদ ফকির নিজেই কিনে দেবেন বলেছেন। তাকে শুধু ১ হাজার ৭০০ টাকা পরিশোধ করলেই হবে।
ওয়াজেদ ফকির মিরাপাড়া এলাকার নামকরা একজন ফকির। বাঁশ ঝাড়ের নিচে একটি ঝুপড়ি ঘরে বসে তিনি মানুষের বিভিন্ন আধ্যাত্মিক চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। তার জলসা ঘরে সব সময়ই জমজমাট একটা ভাব থাকে। তার কিছু সাঙ্গপাঙ্গ রয়েছে। তারাই মজমা মিলায়। আর ওয়াজেদ ফকির লাল কালিতে তাবিজ-কবজ লিখে থাকেন। তার কবিরাজি করার জন্য তাবিজ-কবজের নকশা আঁকা বই রয়েছে। তিনি কোনো ধরনের পড়াশোনা করেননি। নকশাই তার একমাত্র সম্বল। যেকোনো রোগেরই তিনি চিকিৎসা দিয়ে থাকেন।
মাঝে মাঝে কেউ যদি ভালো হাদিয়া দিতে পারে তার জন্য তিনি জিন হাজির করে থাকেন। তার কাছ থেকে রোগের বর্ণনা শুনে চিকিৎসা দেন। তবে তিনি এবার তার প্রতারণার কৌশল একটু আলাদা করেছেন। গ্রাম থেকে তার বাবা এসেছেন। তাকে ইরি ধানের ব্লক করার জন্য টাকা দিতে হবে। লুঙ্গি-গামছা দিতে হবে। আর তাকে পোলাও-মাংস খাওয়াতে হবে। তাই তদবির নিতে আসা চম্পা বেগমকে লাল মোরগ, লুঙ্গি আর গামছা আনতে বলেছেন। আর কালির জন্য যে ১ হাজার ৭০০ টাকা দিতে বলেছেন তাকে। সেই টাকার কালি তিনি কিনবেন না। তিনি কিনে আনবেন ১০ টাকার লাল রং। বাকি টাকা তিনি মেরে দিয়ে তার বাবাকে ইরির ব্লক করতে দিয়ে দেবেন। কিন্তু যখনই তদবিরকারী চম্পা বেগম বাজারে লাল মোরগের দেখা পাননি তখন আবার তাকে বললেন, মোরগের গায়ে একটু লাল রং হলেই হবে। এভাবেই ওয়াজেদ ফকিরের প্রতারণা চলছিল অবলীলায়।
তবে তিনি যে চম্পা বেগমের কাছ থেকে এত কিছু আদায় করলেন এখন তার কী হবে? তিনি কি ফল পাবেন? এখানেও ওয়াজেদ ফকিরের বড় ধরনের তেলেসমাতি রয়েছে। এত এত টাকা তার গাঁট থেকে খসালেন। আর ওয়াজেদ ফকিরের কোনো তদবির কাজে লাগবে না তা তো হতে পারে না। তদবিরকারী চম্পা বেগম ছিলেন একটি চাতাল কলের শ্রমিক। সেখানকার তাগড়া জোয়ান একজন পুরুষ চম্পা বেগমের মনে ধরেছে। যে করেই হোক সে জোয়ানকে চম্পা বেগমের চা-ই চাই। তাই তো তাকে তাবিজ করে বশ করানোর জন্য ওয়াজেদ ফকিরের দরবারে হাজির হয়েছেন। তার জমানো অনেকগুলো টাকা তিনি খরচের জন্য দ্বিধা করেননি। ওয়াজেদ ফকির চম্পা বেগমকে একটি তাবিজ আর কিছু পড়া পানি দিয়ে বললেন এটি আপনি একটি গাছে বাঁধবেন। যেখানে বাতাস চলাচল করে ঠিক সেখানে। বাতাসে তাবিজ নড়বে আর সে তাগড়া জোয়ানের মনও আপনার জন্য ব্যাকুল হবে। আর পানি পড়া তার আশপাশে ছিটিয়ে দিতে বলেছেন।
এবার ওয়াজেদ ফকিরের তো কেরামতি দেখানোর পালা। তিনি তার আস্তানার একজনকে ডেকে আনতে বললেন। তিনি হলেন, বিউটি রাইস মিলের জমির। জমিরকে ডেকে আনা হলো। জমির কিছুই বুঝে উঠতে পারছেন না। এসে চুপচাপ বসে আছে। ওয়াজেদ ফকিরের বুদ্ধিমতেই সে তাগড়া জোয়ান জমিরকে ডেকে আনা হলো। তাকে যে চম্পা বেগমের মনে ধরেছে সেসব ঘটনা খুলে বলল। তবে এত দিন চম্পা বেগমের কাছ থেকে ইশারা-ইঙ্গিত পেলে সে কখনোই ভয়ে তাকে পেতে চাননি জমির। তা ছাড়া তার সংসার রয়েছে। সেখানে স্ত্রী-বাচ্চা রয়েছে। কিন্তু চম্পার এমনভাবে চাওয়াকে তিনি ফেলেও দিতে পারেননি। তাই তিনি চম্পা বেগমের সঙ্গে ভাব লীলায় জড়িয়ে পড়লেন।
ওয়াজেদ ফকিরের তাবিজের কেরামতি এভাবেই ফলল। চম্পা খুশির চোটে ফকিরের দরবারে মিষ্টি নিয়ে এসে হাজির হলো। ফকির তখন জিন নামাচ্ছেন। অন্য একজনের জন্য। ফকির আওড়াচ্ছেন দেও কাটি, বাতাস কাটি, কাইটা করলাম খান খান, আমার কথা যদি না শুনোস, কামরুক কামাক্ষার মাথা খাস। ওয়াজেদ ফকির অবসর হলে তাকে মিষ্টির বাক্স দিয়ে তৃপ্তির একটা হাসি দিলেন চম্পা বেগম। তার তাবিজ-কবজে কাজ হয়েছে। তাই তো তিনি ওয়াজেদ ফকিরের জন্য মিষ্টি নিয়ে এসেছেন। এভাবেই ওয়াজেদ ফকির তার প্রতারণার লীলা অকপটে চালিয়ে যাচ্ছেন।
প্রকৃতি কোনো প্রতারককে কখনোই গ্রহণ করেন না। ওয়াজেদ ফকিরকেও না। একে একে ওয়াজেদ ফকির নির্বংশ হতে শুরু করল। প্রথমে মারা গেল একটি ছেলে। পরে একটা মেয়ে। তার পরের বছর শেষ মেয়েটিও মারা গেল। তিনি একা হয়ে পড়লেন। তার অপকর্ম যতক্ষণে তিনি বুঝলেন তখন আর কিছুই করার ছিল না। তার সবই শেষ হলো। এভাবেই একজন ওয়াজেদ ফকির ভিটেবাড়ি ছাড়া হয়ে একেবারে কপর্দকহীন হয়ে পড়লেন। প্রকৃতি তার আপন মহিমায় প্রতিশোধ নিলেন।
চম্পা বেগমরা হয়তো সমাজে এভাবেই অসংগতি ডেকে আনবেন একজন ওয়াজেদ ফকিরের মাধ্যমে। আর গভীর নিশ্বাস ফেলবে সে তাগড়া জোয়ান জমিরের ঘরের নিরীহ স্ত্রী আর সন্তানরা।
মিরাপাড়া, রিকাবীবাজার, মুন্সীগঞ্জ
তারেক
.jpg)
.jpg)