মানবদেহ কোটি কোটি বছরের বিবর্তনের এক জটিল ফসল। পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে প্রতিটি প্রজাতি প্রয়োজনীয় বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, নির্দিষ্ট কিছু অঙ্গ কেন আজকের রূপ পেয়েছে, তার অনেক উত্তর অজানা।
যেমন, মানুষের কেন ‘থুতনি’ আছে? আবার শরীরের ওজনের অনুপাতে মানুষের শুক্রাশয় গরিলার চেয়ে তিন গুণ বড়, অথচ শিম্পাঞ্জির মাত্র পাঁচ ভাগের এক ভাগ কেন?
‘দ্য ট্রি অব লাইফ’ নামের একটি নতুন বইতে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে। বিবর্তনের ‘ট্রি অব লাইফ’ তত্ত্বে দেখা যায়, কীভাবে একটি প্রজাতি বিভিন্ন শাখার মধ্য দিয়ে আজকের অবস্থানে এসেছে। যেমন, মানুষ প্রাইমেট হওয়ার আগে স্তন্যপায়ী ছিল। স্তন্যপায়ী হওয়ার আগে ছিল মেরুদণ্ডী প্রাণী।
প্রতিটি ধাপে বোঝা যায়, কোন অঙ্গ কখন আবির্ভূত হয়েছে। যেমন, দেহ ও অন্ত্র অবশ্যই মেরুদণ্ড এবং হাত-পায়ের আগে এসেছে। একই ভাবে, স্তন এবং চুল (স্তন্যপায়ী) এসেছে নখের আগে।
যেভাবে রহস্যের সমাধান খোঁজেন বিজ্ঞানীরা
বিজ্ঞানীরা একটি বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহার করে কোনো অঙ্গ কেন বিবর্তিত হলো, তার উত্তর খোঁজেন। এই পদ্ধতিটি ‘কনভারজেন্ট ইভোলিউশন’ বা ‘অভিসারী বিবর্তন’ নামে পরিচিত।
তবে এই পদ্ধতি কেবল তখনই কাজ করে, যখন কোনো নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য ‘ট্রি অব লাইফ’-এর একাধিক শাখায় স্বাধীনভাবে বিবর্তিত হয়। অভিসারী বিবর্তনকে এক ধরনের ‘প্রাকৃতিক পরীক্ষা’ হিসেবে দেখা হয়। যখন দুটি ভিন্ন প্রজাতি একই ধরনের পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে একই রকম সমাধান বিবর্তিত করে, তখন বিজ্ঞানীরা সেই বৈশিষ্ট্যের কার্যকারিতা সম্পর্কে নিশ্চিত হন।
প্রাইমেটদের শুক্রাশয়ের আকারের ভিন্নতা এই অভিসারী বিবর্তনের একটি ধ্রুপদী উদাহরণ। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, অ্যাবিসিনিয়ান কালো-সাদা কলোবাস বানর এবং বোনেট মাকাক বানরের আকার প্রায় একই হলেও শুক্রাশয়ের আকারে বিশাল তফাত। কলোবাসের শুক্রাশয়ের ওজন মাত্র ৩ গ্রাম, অন্যদিকে মাকাকের ৪৮ গ্রাম।
এর কারণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা স্পার্ম কম্পিটিশন তত্ত্বকে দাঁড় করিয়েছেন। কলোবাস বানর একটি ‘হারেম’ বা একাধিক নারী সঙ্গীর দলকে নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে প্রজননে তার কোনো প্রতিযোগী থাকে না।
অন্যদিকে, মাকাক বানররা বড় মিশ্র দলে বাস করে, যেখানে একটি নারী বানর একাধিক পুরুষের সঙ্গে মিলিত হয়। ফলে প্রজননের সফলতা নির্ভর করে কার শুক্রাণু বেশি শক্তিশালী, তার ওপর। যে পুরুষের শুক্রাশয় যত বড়, সে তত বেশি শুক্রাণু উৎপাদন করতে পারে এবং তার জিন পরবর্তী প্রজন্মে যাওয়ার সম্ভাবনা তত বেশি থাকে।
বিজ্ঞানীরা স্তন্যপায়ী প্রাণীদের অন্যান্য শাখাতেও একই প্রবণতা দেখেছেন। যেখানে প্রজাতি বহুগামী (শিম্পাঞ্জি), সেখানে শুক্রাশয় বড়। আর যেখানে একগামী বা হারেম পদ্ধতি (গরিলা), সেখানে শুক্রাশয় ছোট। মানুষের শুক্রাশয়ের আকার এই দুই চরম অবস্থার মাঝামাঝি, যা মানব প্রজনন আচরণের বিবর্তন নিয়েও নানা ইঙ্গিত দেয়।
থুতনির অমীমাংসিত রহস্য
শুক্রাশয়ের আকারের রহস্যের সমাধান মিললেও মানুষের থুতনির ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা এমন কোনো সমাধানে পৌঁছাতে পারেননি। থুতনির উদ্দেশ্য কী, তা নিয়ে একাধিক তত্ত্ব প্রচলিত আছে।
কেউ মনে করেন, এটি শিকার বা লড়াইয়ের সময় চোয়ালকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করত। অন্য ধারণা মতে, এটি মুখের সৌন্দর্য বা যৌন আকর্ষণের জন্য বিকশিত হয়েছে। আবার এমনও তত্ত্ব রয়েছে যে, রান্না করা নরম খাবার খাওয়ায় মানুষের চোয়াল ছোট হয়ে গেছে এবং থুতনি সেই পরিবর্তনের ফলে মুখে থেকে যাওয়া একটি অকার্যকর অংশ মাত্র।
এগুলো সবই বিশ্বাসযোগ্য তত্ত্ব। কিন্তু মূল সমস্যা হলো থুতনি ‘Homo sapiens’ বা আধুনিক মানুষের একটি সম্পূর্ণ অনন্য বৈশিষ্ট্য। স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে আর কোনো প্রজাতির থুতনি নেই। এমনকি আমাদের নিকটতম বিলুপ্ত আত্মীয়, নিয়ান্ডারথালদেরও স্পষ্ট থুতনি ছিল না।
যেহেতু থুতনি কেবল একবারই বিবর্তিত হয়েছে, তাই এখানে ‘অভিসারী বিবর্তন’ পদ্ধতি প্রয়োগ করার সুযোগ নেই। অন্য কোনো প্রজাতির সঙ্গে তুলনা করে এর কার্যকারিতা পরীক্ষা করা সম্ভব নয়। ফলে থুতনির বিবর্তনের একাধিক সম্ভাব্য ব্যাখ্যা থাকলেও, সেগুলোকে বৈজ্ঞানিকভাবে নিশ্চিত করার কোনো উপায় আপাতত বিজ্ঞানীদের হাতে নেই। সূত্র: দ্য ইনডিপেনডেন্ট


