প্রায় ৪০ হাজার বছর আগের কথা। সাইবেরিয়ার তুষার ঢাকা প্রান্তরে হয়তো কোনো এক গুহায় সিংহের ধাওয়া খেয়ে পালাচ্ছিল ‘ইউকা’ নামের এক উলি ম্যামথ। মৃত্যুর ঠিক আগমুহূর্তে তার শরীরে কী ঘটছিল, এত বছর পর তা জানা গেল আরএনএ বিশ্লেষণের মাধ্যমে। বিজ্ঞানীরা ইউকার দেহ থেকে যে আরএনএ সিকোয়েন্স উদ্ধার করেছেন, তা এখন পর্যন্ত পাওয়া বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন।
চলতি মাসের ১৪ তারিখে বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সেল’-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা এই তথ্য জানিয়েছেন। এর আগে প্রাচীনতম আরএনএ সিকোয়েন্সটি ছিল ১৪ হাজার বছরের পুরোনো এক প্লাইস্টোসিন নেকড়ের। স্টকহোম ইউনিভার্সিটির জীববিজ্ঞানী লাভ ডালেন বলেন, ‘নতুন এই গবেষণা প্রমাণ করে, আমাদের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি সময় ধরে প্রাচীন আরএনএ টিকে থাকতে পারে।’
ইউকার দেহাবশেষ পরীক্ষা করে গবেষকরা তার পেছনের পায়ে আঁচড়ের দাগ পেয়েছেন। তবে তার পেশির টিস্যু বা কলা বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা আণবিক পর্যায়ে তীব্র চাপের (স্ট্রেস) লক্ষণ খুঁজে পেয়েছেন। আরএনএ অণুগুলোর বিশ্লেষণ ইঙ্গিত দেয়, মৃত্যুর আগে ম্যামথটির পেশিগুলো পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। সম্ভবত কোনো হিংস্র প্রাণীর হাত থেকে বাঁচতে প্রাণপণ চেষ্টা করেছিল ম্যামথটি।
বরফ-যুগের প্রাণীদের নিয়ে গবেষণায় সাধারণত ডিএনএ বিশ্লেষণের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়। বিজ্ঞানী ডালেন বলেন, ‘ডিএনএ দীর্ঘস্থায়ী হলেও মৃত্যুর পরপর আরএনএ দ্রুত নষ্ট হয়ে যায় বলে ধারণা করা হতো। তাই আগে কেউ এটি নিয়ে সেভাবে চেষ্টা করেননি।’ তবে ইউকার ক্ষেত্রে সাইবেরিয়ার পারমাফ্রস্টের হিমশীতল পরিবেশ তার দেহকে প্রাকৃতিকভাবে মমি করে রেখেছিল, যার ফলে এই আরএনএ টিকে গেছে।
কোপেনহেগেন ইউনিভার্সিটির জিনতত্ত্ববিদ এমিলিও মারমোল-সানচেজ বিষয়টিকে সহজ করে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন, ‘ডিএনএ যদি হয় প্রাণীদেহ গঠনের পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা বা ব্লুপ্রিন্ট, তবে আরএনএ হলো সেই ঠিকাদার, যে কোষগুলোকে বলে ঠিক কখন কী তৈরি করতে হবে।’
অর্থাৎ আরএনএ বিশ্লেষণের মাধ্যমে গবেষকরা একটি নির্দিষ্ট সময়ে, যেমন- মৃত্যুর মুহূর্তে কোষের কার্যকলাপ, টিস্যুর ধরন ও প্রাণীর স্বাস্থ্যের অবস্থা সম্পর্কে তথ্য পেতে পারেন।
মারমোল-সানচেজ ও ডালেনসহ গবেষক দলটি মোট ১০টি উলি ম্যামথের টিস্যু নিয়ে কাজ করেছেন। এর মধ্যে ইউকার নমুনাটি থেকে সবচেয়ে বেশি জৈবিক তথ্য পাওয়া গেছে। গবেষণায় তাঁরা ‘মাইক্রোআরএনএ’ নামক বিশেষ অণুর সন্ধান পেয়েছেন। হাতি ও ম্যামথের জিনগত ব্লুপ্রিন্ট প্রায় একই রকম হওয়া সত্ত্বেও কেন তারা আলাদা, তা বুঝতে এই মাইক্রোআরএনএ ভূমিকা রাখবে।
গবেষকরা বলছেন, এই গবেষণাটি প্রাচীন আরএনএ নিয়ে কাজের ক্ষেত্রে একটি রোডম্যাপ হিসেবে কাজ করবে। এক সময় পৃথিবীর বুকে দাপিয়ে বেড়ানো বিলুপ্ত এসব প্রাণীর জীবন ও মৃত্যু সম্পর্কে অজানা তথ্য উন্মোচনে এটি নতুন দিগন্ত খুলে দিল।
/আবরার জাহিন


