যুক্তরাষ্ট্রের নেভাদা অঙ্গরাজ্যের পিরামিড লেকের পানিতে বিষাক্ত সায়ানোব্যাকটেরিয়ার অস্বাভাবিক উপস্থিতি দেখা গেছে। ২০২৪ সালের একটি স্যাটেলাইট ছবিতে হ্রদের পানিতে ঘন ও বিষাক্ত শ্যাওলার (অ্যালগাল ব্লুম) ঘূর্ণায়মান আস্তরণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গবেষকদের ধারণা, এই হ্রদে অন্তত ৯ হাজার বছর ধরে এই শ্যাওলা জন্ম নিচ্ছে। তবে এবারের দৃশ্যটি সাম্প্রতিক অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভয়াবহ।
রেনোর উত্তর-পূর্বে অবস্থিত পিরামিড লেকের আয়তন প্রায় ৪৫৩ বর্গকিলোমিটার। হ্রদটির দক্ষিণ অংশে পিরামিড আকৃতির একটি বড় পাথরের দ্বীপ রয়েছে, যার নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়েছে। এটি একটি এন্ডোরিইক হ্রদ। অর্থাৎ, একটি মাত্র নদী থেকে এতে পানি আসে, কিন্তু সেই পানি বের হওয়ার কোনো পথ নেই। পানি বাষ্পীভূত হয়ে যাওয়ার ফলে এর লবণাক্ততা সাধারণ হ্রদের চেয়ে অনেক বেশি। এর পানি কিছুটা ক্ষারীয়, যার পিএইচ মান প্রায় ৯।
সাধারণত সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং পানিতে পুষ্টির প্রাপ্যতা বাড়লে এখানে অ্যালগাল ব্লুম দেখা দেয়। নাসা আর্থ অবজারভেটরির তথ্যমতে, এখানে মূলত নোডুলারিয়া স্পুমিজেনা (Nodularia spumigena) নামের এক ধরনের নীলাভ-সবুজ সায়ানোব্যাকটেরিয়া জন্মে। অতিরিক্ত লবণাক্ত পানিতে এগুলো দ্রুত বংশবিস্তার করে। ২০২৪ সালের এই ঘটনাটি ছিল অত্যন্ত তীব্র। গত ১৫ অক্টোবর এই শ্যাওলার ঘনত্ব সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়, যা মহাকাশ থেকে তোলা ছবিতে ধরা পড়ে। তবে কেন এবার শ্যাওলার বিস্তার এত ব্যাপক হলো, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
এই ব্যাকটেরিয়া ‘নোডুলারিন’ নামে এক ধরনের বিষাক্ত পদার্থ তৈরি করতে পারে। এটি মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর লিভারকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। এ কারণে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ হ্রদের পানির কাছাকাছি পোষা প্রাণীদের না নেওয়ার জন্য কঠোর সতর্কবার্তা জারি করেছে।
ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস অনুযায়ী, পিরামিড লেক এক সময় প্রাগৈতিহাসিক ‘লেক লাহোন্টান’-এর অংশ ছিল। প্রায় ১২ হাজার বছর আগে শেষ বরফ যুগের শেষে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশাল লাহোন্টান হ্রদ শুকিয়ে যেতে শুরু করে। বর্তমানে পিরামিড লেক সেই বিশাল জলাশয়ের সর্ববৃহৎ অবশিষ্ট অংশ। হ্রদটিতে ক্যালসিয়াম কার্বনেটের তৈরি স্তম্ভের মতো বিশেষ কাঠামো দেখা যায়, যা কয়েক হাজার বছর আগে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার সময় তৈরি হয়েছিল।
১৯৯০ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, এই বিষাক্ত সায়ানোব্যাকটেরিয়া প্রাচীন লাহোন্টান হ্রদের সময় থেকেই এখানে ছিল এবং যুগের পর যুগ ধরে টিকে আছে। এ ছাড়া এই হ্রদে ‘কুই-উই’ নামের এক বিশেষ প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়, যা পৃথিবীর আর কোথাও নেই। বিপন্ন প্রজাতির এই মাছটি মূলত শ্যাওলা খেয়ে বেঁচে থাকে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই মাছগুলোও প্রাচীন লাহোন্টান হ্রদের বাস্তুসংস্থান থেকেই এখানে রয়ে গেছে।


