মানুষের পোষ মানানো প্রথম প্রাণী কুকুর। হাজার হাজার বছর ধরে এরা মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে। তবে এই পোষা প্রাণীর শরীরে এখনো তার বন্য পূর্বপুরুষের জিনগত বৈশিষ্ট্য কতটা অবশিষ্ট আছে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের কৌতূহলের শেষ নেই। সম্প্রতি এক যুগান্তকারী গবেষণায় বিজ্ঞানীরা কুকুরের প্রায় প্রতিটি প্রজাতির মধ্যে নেকড়ের ডিএনএর সুপ্ত উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন। অবাক করা বিষয় সবচেয়ে ছোট প্রজাতির কুকুর হিসেবে পরিচিত চিহুয়াহুয়ার শরীরেও এই বন্য জিনের উপস্থিতি মিলেছে।
এই গবেষণা কুকুর এবং নেকড়ের বিবর্তন ও সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিনের বৈজ্ঞানিক ধারণাকে নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
কুকুর ‘গ্রে উলফ’ প্রজাতি থেকে বিবর্তিত হয়েছে। তবে ঠিক কবে, কোথায় ও কতবার কুকুরকে পোষ মানানো হয়েছিল, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। প্রাচীন ডিএনএ প্রমাণ বলছে, ইউরেশিয়ার পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলে দুই দফায় কুকুরকে পোষ মানানো হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এই দুই দল মিশে যাওয়ার ফলে আজকের পৃথিবীর সব কুকুরের পূর্বপুরুষের উদ্ভব ঘটে।
শত শত আধুনিক ও প্রাচীন কুকুরের ডিএনএ বিশ্লেষণ করে ‘মলিকুলার ক্লক’ পদ্ধতিতে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, প্রায় ২০ থেকে ২২ হাজার বছর আগে কুকুর পোষ মানানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়। সেই সময় ইউরেশিয়া ও উত্তর আমেরিকার বিশাল অংশ বরফে ঢাকা ছিল। প্রত্নতাত্ত্বিক রেকর্ডে পাওয়া সবচেয়ে প্রাচীন কুকুরের জীবাশ্মটি জার্মানির বন-ওবারকাসেল শহরে পাওয়া গেছে, যা প্রায় ১৪ হাজার বছরের পুরোনো।
কুকুর ও নেকড়ের এই অভিন্ন ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও, বিজ্ঞানীরা এতদিন মনে করতেন যে এই দুই প্রজাতি খুব কম নিজেদের মধ্যে প্রজনন করেছে বা শংকর ছানার জন্ম দিয়েছে। তবে নতুন এই গবেষণা সেই ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানী ও আণবিক নৃতত্ত্ববিদদের সমন্বয়ে গঠিত একটি দল কুকুর-নেকড়ে শংকরায়ণ সত্যি বিরল ছিল কি না, তা নতুন করে খতিয়ে দেখতে চেয়েছেন।
গবেষকরা বলছেন, অন্যান্য গৃহপালিত প্রাণীর ক্ষেত্রে তাদের বন্য প্রতিপক্ষের সঙ্গে জিনগত মিশ্রণের (জিন ফ্লো) স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। যেমন- ১০ হাজার বছর আগে নিকট প্রাচ্যে শূকর পোষ মানানো হয়েছিল। তবে যখন প্রাচীন কৃষকরা তাদের ইউরোপে নিয়ে আসে, তখন তারা স্থানীয় বন্য শূকরের সঙ্গে অনেক বেশি শংকর প্রজনন করে। এতে তাদের কাছে প্রাচ্যের প্রায় সব ডিএনএ প্রতিস্থাপিত হয়ে যায়।
তবে নেকড়ে ও কুকুর একই এলাকায় বসবাস করা এবং অবাধে প্রজনন করতে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও, তাদের মধ্যে এমন মিশ্রণের অভাব বিজ্ঞানীদের কাছে আশ্চর্যজনক ছিল। এর একটি কারণ হতে পারে আচরণগত পার্থক্য। নেকড়েরা সাধারণত পারিবারিক দল কাঠামোতে বাস করে, অন্যদিকে কুকুর মানুষের ওপর নির্ভরশীল।
এ বিষয়টি তদন্ত করতে, গবেষকরা আগের প্রকাশিত ২ হাজার ৬৯৩টি জিনোম বিশ্লেষণ করেছেন। এর মধ্যে ছিল প্রায় ১ লাখ বছরের পুরোনো ১৪৬টি প্রাচীন কুকুর ও নেকড়ের নমুনা। তারা ১ হাজার ৮৭২টি আধুনিক কুকুরের জিনোমও পরীক্ষা করেছেন, যার মধ্যে গোল্ডেন রিট্রিভার, চিহুয়াহুয়া, ম্যালমুট এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের দুর্লভ প্রজাতিও ছিল। সবশেষে তারা প্রায় ৩০০টি ‘ভিলেজ ডগ’ বা গ্রামীণ কুকুরের জিনোম বিশ্লেষণ করেন। এই কুকুরগুলো পোষা নয়, তবে মানুষের পরিবেশের কাছাকাছি স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকে।
গবেষকরা কুকুরের মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ ও ওয়াই ক্রোমোজোম ধরে তাদের বিবর্তনীয় ইতিহাস অনুসন্ধান করেন। অত্যন্ত সংবেদনশীল কম্পিউটেশনাল পদ্ধতি ব্যবহার করে তারা এই প্রাণীগুলোর নিউক্লিয়ার জিনোম বিশ্লেষণ করেন।
ফলাফলে দেখা যায়, বেশির ভাগ কুকুরের জিনোমে বন্য নেকড়ের জিনের উপস্থিতি রয়েছে। একইভাবে প্রায় অর্ধেক বন্য নেকড়ের জিনোমে কুকুরের জিনের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
কুকুরের ক্রোমোজোমে নেকড়ের এই ডিএনএ খুব সামান্য পরিমাণে, প্রায় অদৃশ্যমান ছোট ছোট খণ্ড হিসেবে উপস্থিত। গবেষণায় দেখা যায়, নমুনা হিসেবে নেওয়া দুই-তৃতীয়াংশ প্রজাতিগত কুকুরের মধ্যেই নেকড়ের জিন রয়েছে, যা প্রায় ৮০০ প্রজন্ম আগে ঘটে যাওয়া শংকরায়ণের ফল।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, পশুপাল পাহারায় নিযুক্ত বড় আকারের ‘ওয়ার্কিং ডগ’-এর মধ্যে নেকড়ের জিনের পরিমাণ বেশি। তবে এই প্যাটার্নটিও সর্বজনীন নয়। যেমন- সেন্ট বার্নার্ডের মতো বিশাল আকারের কুকুরের মধ্যে নেকড়ের ডিএনএ একেবারে নেই। তবে সম্পূর্ণ বিপরীতভাবে ছোট আকারের চিহুয়াহুয়ার জিনোমের শূন্য দশমিক ২ শতাংশ নেকড়ের ডিএনএ।
গবেষণার সবচেয়ে আশ্চর্যজনক আবিষ্কারটি এসেছে গ্রামীণ কুকুর থেকে। বিজ্ঞানীরা পরীক্ষায় ব্যবহৃত প্রতিটি গ্রামীণ কুকুরের জিনোমে নেকড়ের ডিএনএর খণ্ডাংশ খুঁজে পেয়েছেন।
এই কুকুরগুলো স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করে এবং তাদের জীবন বেশ কঠিন। গবেষকরা দেখেছেন, এই কুকুরগুলোর শরীরে থাকা নেকড়ের ডিএনএর অংশগুলোয় ঘ্রাণশক্তি সম্পর্কিত জিন রয়েছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, নেকড়ে থেকে পাওয়া এই প্রখর ঘ্রাণশক্তি সম্ভবত এই মুক্ত কুকুরগুলোকে কঠোর ও প্রতিকূল পরিবেশে খাবার খুঁজে পেতে এবং টিকে থাকতে সহায়তা করেছে।
গবেষকরা স্পষ্ট করেছেন, সব কুকুরের ডিএনএ মূলত নেকড়ের ডিএনএ। কারণ নেকড়ে থেকে বিবর্তিত হয়েছে কুকুর। তবে এই গবেষণায় যে ক্ষুদ্র ডিএনএর কথা বলা হচ্ছে, তা সেই আদিম জিন পুল নয়। বরং এটি প্রমাণ করে, পোষ মানানোর প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার অনেক পরেও কুকুর ও নেকড়ে নিয়মিত প্রজনন করেছে।
বিষয়টি অনেকটা আধুনিক মানুষ ও নিয়ান্ডারথালের মতো। মানুষ ও নিয়ান্ডারথালের পূর্বপুরুষ এক হলেও, কয়েক হাজার প্রজন্ম আগে এই দুই প্রজাতি ইউরেশিয়ায় মিলিত হয়েছিল এবং তাদের মধ্যে প্রজনন ঘটেছিল। বেশির ভাগ আধুনিক মানুষের জিনোমে যেমন নিয়ান্ডারথালের ডিএনএর ছোট ছোট অংশ পাওয়া যায়, ঠিক সেভাবে কুকুরের জিনোমে নেকড়ের জিনের সন্ধান পাওয়া যায়।
এই গবেষণা প্রমাণ করে, কুকুর ও নেকড়ের মধ্যে শংকরায়ণ বিরল ছিল এই ধারণা সঠিক নয়। যদিও বিপন্ন প্রজাতির নেকড়েদের সংরক্ষণের ক্ষেত্রে কুকুরের সঙ্গে শংকরায়ণ একটি হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে এর একটি বিপরীত দিকও রয়েছে। নেকড়েরাও কুকুরের সঙ্গে মিশ্রণের মাধ্যমে পরিবর্তিত পরিবেশে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য জিনগত সুবিধা পেয়ে থাকতে পারে।
গবেষকরা বলেছেন, কুকুর মানুষের সঙ্গী হিসেবে বিবর্তিত হলেও, নেকড়েরা তাদের জন্য একটি ‘জেনেটিক লাইফলাইন’ বা জিনগত জীবনরেখা হিসেবে কাজ করেছে। যখন কুকুর প্রতিকূল জলবায়ু, খাবারের সন্ধান বা পশুপাল রক্ষার মতো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে, তখন তারা তাদের বিবর্তনীয় টিকে থাকার কিট হিসেবে নেকড়ে পূর্বপুরুষের জিনগত বৈশিষ্ট্যকে ব্যবহার করেছে। সূত্র: দ্য ইনডিপেনডেন্ট


