রাশিয়া এমন এক অভিনব মহাকাশ স্টেশন তৈরির পরিকল্পনা করেছে, যেখানে নভোচারীরা ভেসে না থেকে স্বাভাবিকভাবে বাস ও কাজ করতে পারবেন। ‘২০০১: এ স্পেস ওডিসি’ সিনেমায় জনপ্রিয় হওয়া এই ধারণাকে বাস্তবে রূপ দিতে রাশিয়া ইতোমধ্যে একটি অ্যান্টি-গ্র্যাভিটি স্পেস স্টেশনের নকশার পেটেন্ট নিয়েছে।
রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত রকেট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এনার্জিয়া একটি ঘূর্ণায়মান মহাকাশ স্টেশনের নকশা জমা দিয়েছে, যা প্রতি মিনিটে পাঁচবার ঘুরবে। এর ফলে সৃষ্ট কেন্দ্রাতিগ বল পৃথিবীর প্রায় ৫০ শতাংশ মাধ্যাকর্ষণের অনুভূতি দেবে।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (আইএসএস)-এর মতো কক্ষপথে থাকা স্টেশনগুলোতে নভোচারীরা প্রায় শূন্য মাধ্যাকর্ষণে থাকেন। মহাকাশযানটি পৃথিবীর চারদিকে অবিরাম পতনের অবস্থায় থাকায় তারা ভেসে বেড়ান। তবে দীর্ঘদিন এমন কম মাধ্যাকর্ষণে বসবাস মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর—হাড় ও পেশির ক্ষয়, হৃদযন্ত্রের দুর্বলতা, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার পরিবর্তন, এমনকি দৃষ্টিশক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক সমস্যাও দেখা দেয়।
এই স্বাস্থ্যঝুঁকি কাটিয়ে উঠতে বহু দশক ধরেই কৃত্রিম মাধ্যাকর্ষণের ধারণা নিয়ে ভাবনা চলছিল, তবে এতদিন তা ছিল বিজ্ঞান কল্পকাহিনির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। রাশিয়ার নতুন এই নকশা সেই কল্পনাকে বাস্তবের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে।
রুশ ফেডারেশনের বৌদ্ধিক সম্পত্তি দপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত পেটেন্ট নথিতে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত এই উদ্ভাবনের উদ্দেশ্য হলো কৃত্রিম মাধ্যাকর্ষণযুক্ত মহাকাশ ব্যবস্থার নকশা উন্নত করে ক্রুদের নিরাপত্তা বৃদ্ধি করা।
পাখার মতো দেখতে এই স্টেশনের কেন্দ্রে থাকবে একটি ঘূর্ণায়মান মডিউল, যার সঙ্গে যুক্ত থাকবে বসবাসযোগ্য ‘বাহু’ বা স্পোক। এই বাহুগুলো ঘুরতে থাকলে বাইরের দিকে এক ধরনের চাপ তৈরি হবে, যা নভোচারীদের মেঝেতে দাঁড়িয়ে থাকার অনুভূতি দেবে।
প্রতিটি বসবাসযোগ্য বাহুর দৈর্ঘ্য হতে হবে প্রায় ৪০ মিটার (১৩১ ফুট), যাতে প্রয়োজনীয় ঘূর্ণন ব্যাসার্ধ তৈরি হয় এবং কাঙ্ক্ষিত মাধ্যাকর্ষণ পাওয়া যায়।
পেটেন্ট অনুযায়ী, এই কৃত্রিম মাধ্যাকর্ষণযুক্ত মহাকাশ ব্যবস্থায় থাকবে একটি অক্ষীয় মডিউল, স্থির ও ঘূর্ণায়মান অংশ, সিল করা নমনীয় সংযোগ ব্যবস্থা, বসবাসযোগ্য মডিউল, ঘূর্ণনযন্ত্র ও বিদ্যুৎ উৎস।
চাঁদের পৃষ্ঠে পৃথিবীর মাত্র এক-ষষ্ঠাংশ মাধ্যাকর্ষণ রয়েছে। নতুন স্টেশনে এর চেয়ে অনেক বেশি মাধ্যাকর্ষণ তৈরি হবে, ফলে নভোচারীরা হেঁটে কাজ করতে পারবেন, যদিও সেটি পৃথিবীর তুলনায় কিছুটা হালকা অনুভূত হবে।
এই স্টেশন নির্মাণে একাধিক উৎক্ষেপণ ও কক্ষপথে জোড়া লাগানোর প্রয়োজন হবে। নকশা অনুযায়ী, ভেতর থেকে বাইরে দিকে ধাপে ধাপে বসবাসযোগ্য মডিউল যুক্ত করা হবে। তবে ঘূর্ণায়মান স্টেশনে নতুন অংশ সংযুক্ত করা বেশ জটিল হতে পারে বলেও পেটেন্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইএসএসের মেয়াদ ২০৩০ সালে শেষ হওয়ার পথে, ঠিক সেই সময়েই এই পরিকল্পনার খবর সামনে এলো। রাশিয়া ইতোমধ্যে নিজস্ব রাশিয়ান অরবিটাল স্পেস স্টেশন (ROSS) নিয়ে কাজ করছে এবং আইএসএস থেকে তাদের অংশ আলাদা করে ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে। অন্যদিকে আইএসএসের বাকি অংশ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে পুড়ে যাওয়ার কথা।
এদিকে নাসা ও ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা চাঁদের কক্ষপথে লুনার গেটওয়ে নির্মাণের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা ভবিষ্যতে চাঁদের পৃষ্ঠে অভিযানের সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করবে।
ঘূর্ণায়মান রিং-আকৃতির স্পেস স্টেশনের ধারণা প্রথম দেন রুশ বিজ্ঞানী কনস্তানতিন সিওলকভস্কি। পরে জার্মান-আমেরিকান বিজ্ঞানী ভার্নার ফন ব্রাউন এ ধারণাকে জনপ্রিয় করেন। ১৯৭৫ সালে নাসা ও স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় যৌথভাবে ‘স্ট্যানফোর্ড টোরাস’ নামে এমন একটি বিশাল স্টেশনের নকশা প্রস্তাব করেছিল, যেখানে প্রায় ১০ হাজার মানুষ স্থায়ীভাবে বসবাস করতে পারতেন।
২০১১ সালে নাসা ‘নটিলাস-এক্স’ নামের আরেকটি ঘূর্ণায়মান স্পেস স্টেশন প্রকল্প শুরু করলেও বাজেট সংকটে তা বাতিল হয়।
রাশিয়ার এই নতুন নকশা অনেকটাই যুক্তরাষ্ট্রের স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান ভাস্ট-এর পরিকল্পিত ‘হ্যাভেন’ নামের ঘূর্ণায়মান স্পেস স্টেশনের মতো। প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে পরীক্ষামূলক যন্ত্রপাতি নিয়ে একটি ছোট মহাকাশযান উৎক্ষেপণ করেছে এবং ২০২৬ সাল থেকে মডিউল পাঠানোর আশা করছে— যদিও এই ধারণা বাস্তবে কতটা সফল হবে, তা এখনও নিশ্চিত নয়। সূত্র: ইয়াহু
মেহেদী/


