চাঁদ জয়ের স্বপ্নে বিভোর মানবজাতির জন্য এক নতুন ইতিহাস রচিত হলো। দীর্ঘ ৫৪ বছর পর চাঁদের দেশে মানুষের পদধ্বনি আবার জোরালো হয়ে উঠেছে। গত ১ এপ্রিল ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে নাসার ‘আর্টেমিস ২’ মিশন সফলভাবে উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল এই রোমাঞ্চকর যাত্রা। ১৯৭২ সালের অ্যাপোলো ১৭ মিশনের পর এটি প্রথম মানববাহী চন্দ্রাভিযান। গতকাল প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ১০ দিনের এই ঐতিহাসিক সফর শেষে পৃথিবীতে ফেরার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন চার সাহসী নভোচারী।
মানুষের রেকর্ড দূরত্ব অতিক্রম
আর্টেমিস ২ মিশনটি গত ৬ এপ্রিল এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছায়। মহাকাশযান ওরিয়ন পৃথিবী থেকে ২ লাখ ৫২ হাজার ৭৫৬ মাইল (প্রায় ৪ লাখ ৬ হাজার ৭৭ কিলোমিটার) দূরত্ব অতিক্রম করেছে। এর মাধ্যমে ভেঙে গেছে ১৯৭০ সালে অ্যাপোলো ১৩ মিশনের গড়া ৫৬ বছরের পুরোনো রেকর্ড। পৃথিবী থেকে মানুষের সবচেয়ে বেশি দূরে যাওয়ার এই নতুন কীর্তি মহাকাশ বিজ্ঞানে এক নতুন মাইলফলক। চাঁদ থেকে মাত্র ৪ হাজার ৬৭ মাইল ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় নভোচারীরা সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছেন চাঁদের ‘ডার্ক সাইড’ বা উল্টো পিঠ। সেখান থেকে তারা উচ্চমানের অসংখ্য ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করেছেন, যা আগে কখনো সম্ভব হয়নি।
মহাকাশ থেকে সূর্যগ্রহণের সাক্ষী
মিশন চলাকালে নভোচারীরা কিছু বিরল ঘটনার সাক্ষী হয়েছেন। চাঁদের উল্টো পিঠে অবস্থান করার সময় তারা একটি পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখার সুযোগ পান। পৃথিবী থেকে যা দেখা অসম্ভব, সেই সূর্যের উজ্জ্বল ‘করোনা’ মহাকাশযান থেকে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছিল তাদের চোখে।
জ্বালামুখের নামকরণ
আবেগের একটি বড় জায়গা জুড়ে ছিল চাঁদের দুটি নামহীন জ্বালামুখ বা ক্রেটারের নামকরণ। নভোচারীদের প্রস্তাবে একটির নাম রাখা হয়েছে তাদের মহাকাশযানের নামানুসারে ‘ইন্টিগ্রিটি’। অন্য ক্রেটারটির নাম দেওয়া হয়েছে কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যানের প্রয়াত স্ত্রী ক্যারল ওয়াইজম্যানের স্মরণে ‘ক্যারল’।
প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা
১০ দিনের এই দীর্ঘ সফরে সবকিছু যে মসৃণ ছিল, তা নয়। মিশনের শুরুর দিকে ওরিয়ন মহাকাশযানের টয়লেট এবং বর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থায় কিছু যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিয়েছিল। ফিল্টারে রাসায়নিক বিক্রিয়ার কারণে বর্জ্য নিষ্কাশন সাময়িকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। তবে পৃথিবীতে থাকা গ্রাউন্ড কন্ট্রোল টিমের সার্বক্ষণিক নির্দেশনায় নভোচারীরা নিজেরা সেই সমস্যা সমাধান করেন। এছাড়া প্রপালশন সিস্টেমে হিলিয়াম গ্যাসের চাপ নিয়ে সামান্য উদ্বেগ তৈরি হলেও ব্যাকআপ সিস্টেমের সহায়তায় তা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করার মাধ্যমে ওরিয়ন মহাকাশযানের সক্ষমতা ও নভোচারীদের উপস্থিত বুদ্ধির চূড়ান্ত পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে।
মিশনের চার সাহসী নভোচারী
এই মিশনে অংশ নেওয়া চার নভোচারীর প্রত্যেকে ইতিহাসের অংশ হয়েছেন। মিশনের নেতৃত্বে রয়েছেন কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান। পাইলট হিসেবে আছেন ভিক্টর গ্লোভার, যিনি চাঁদের অভিযানে যাওয়া প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি। মিশন স্পেশালিস্ট হিসেবে ক্রিস্টিনা কচ প্রথম নারী হিসেবে চাঁদের কক্ষপথে পৌঁছানোর গৌরব অর্জন করেছেন। তাদের সঙ্গে আছেন কানাডীয় মহাকাশ সংস্থার জেরেমি হ্যানসেন।
ম্যানুয়াল পাইলটিং ও স্যুটেবিলিটি টেস্ট
চতুর্থ ও পঞ্চম দিনে তারা ওরিয়ন মহাকাশযানটি ম্যানুয়াল পাইলটিং বা হাতে চালিয়ে পরীক্ষা করেছেন এবং তাদের নতুন ‘ওরিয়ন ক্রু সারভাইভাল সিস্টেম’ স্পেসস্যুটগুলোর কার্যকারিতা যাচাই করেছেন।
ফেরার প্রস্তুতি ও অবতরণ
৮ এপ্রিল থেকে শুরু হয়েছে পৃথিবীতে ফেরার চূড়ান্ত তোড়জোড়। ওরিয়ন ক্যাপসুলের ভেতরে থাকা ভারী বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম, ব্যায়ামের যন্ত্র এবং অন্যান্য আসবাবপত্র নির্দিষ্ট স্থানে শক্ত করে বেঁধে রাখা হচ্ছে। বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় তীব্র ঝাঁকুনিতে যাতে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে, সেজন্য এই সাবধানতা। পাইলট ভিক্টর গ্লোভার এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, তারা প্রচুর বৈজ্ঞানিক তথ্য ও দুর্লভ সব ছবি নিয়ে ফিরছেন।
১০ এপ্রিল ওরিয়ন ক্যাপসুলটি ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগো উপকূলে প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করবে। বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় প্রচণ্ড ঘর্ষণে মহাকাশযানটির বাইরের তাপমাত্রা প্রায় ২ হাজার ৮০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাবে। এরপর বিশাল প্যারাশুটের মাধ্যমে গতি কমিয়ে এটি সাগরে আছড়ে পড়বে, যাকে বলা হয় ‘স্প্ল্যাশডাউন’। মার্কিন নৌবাহিনীর একটি উদ্ধারকারী দল ইতোমধ্যে সেখানে অবস্থান নিয়েছে।
মহাকাশ গবেষণায় নতুন আশা
আর্টেমিস ২ মূলত একটি পরীক্ষামূলক মিশন। এর সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে ২০২৮ সালের মধ্যে আর্টেমিস ৩ মিশনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যেখানে মানুষ পুনরায় চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে পা রাখবে। গভীর মহাকাশ গবেষণা এবং ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহে মানব অভিযানের পথে এই মিশনটি একটি শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। সারা বিশ্বের বিজ্ঞানপ্রেমীরা এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন চার নভোচারীর নিরাপদে ঘরে ফেরার মুহূর্তটির জন্য। চন্দ্রবিজয় এখন আর কেবল কল্পনা নয়, বরং হাতের মুঠোয় আসা এক বাস্তব সত্য। সূত্র: নাসা


