মহাকাশের রহস্য উন্মোচনে আবারও বড় সাফল্যের দেখা পেয়েছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। সংস্থাটির কিউরিওসিটি রোভার মঙ্গল গ্রহের বুকে এমন কিছু জৈব যৌগের সন্ধান পেয়েছে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। লাল গ্রহটিতে প্রাণের অস্তিত্ব ছিল কি না, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের গবেষণায় এ আবিষ্কার এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, মঙ্গলের বিষুবরেখার কাছে একটি শুকিয়ে যাওয়া হ্রদের তলদেশের শিলা পরীক্ষা করে সাতটি ভিন্ন ধরনের জৈব যৌগ শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি যৌগ এর আগে মঙ্গলে কখনো পাওয়া যায়নি। সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, এই পরীক্ষায় এমন একটি যৌগের উপস্থিতি পাওয়া গেছে যার গঠন অনেকটা আমাদের পরিচিত ডিএনএর উপাদানের মতো। ডিএনএ হলো সেই অণু যা পৃথিবীর সব জীবিত প্রাণীর জিনগত তথ্য বহন করে।
জৈব যৌগ মূলত কার্বন পরমাণু দিয়ে গঠিত অণু, যা পৃথিবীতে প্রাণের ভিত্তি হিসেবে পরিচিত। মঙ্গলে এ পর্যন্ত কয়েক ডজন জৈব যৌগ শনাক্ত করা হলেও বিজ্ঞানীরা এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলছেন না। গবেষকদের মতে, এ যৌগগুলো জৈবিক প্রক্রিয়া ছাড়াও প্রাকৃতিকভাবে বা রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি হতে পারে।
সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহের মতো মঙ্গলও প্রায় ৪৫০ কোটি বছর আগে গঠিত হয়েছিল। ইতিহাস বলছে, বর্তমানের শুষ্ক ও শীতল মরুভূমির মতো মঙ্গলের রূপ অতীতে এমন ছিল না। কয়েক শ কোটি বছর আগে মঙ্গলের পরিবেশ ছিল অনেক বেশি উষ্ণ এবং সেখানে পানির অস্তিত্ব ছিল। কিউরিওসিটি রোভার যে শিলাটি পরীক্ষা করেছে, সেটি প্রবাহিত পানির নিচে জমা হওয়া পলি থেকে তৈরি। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই শিলাটি অন্তত ৩৫০ কোটি বছরের পুরোনো।
ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং এ গবেষণার প্রধান লেখক অ্যামি উইলিয়ামস বলেন, ‘আমরা এখনই নিশ্চিত করে বলতে পারছি না যে মঙ্গলে প্রাণের অস্তিত্ব ছিল। তবে আমাদের এ আবিষ্কার প্রমাণ করে যে, পৃথিবীতে যখন প্রাণের বিকাশ ঘটছিল, ঠিক সেই সময়ে মঙ্গল গ্রহটিও বসবাসের উপযোগী ছিল।’ সম্প্রতি বিখ্যাত ‘নেচার কমিউনিকেশনস’ বিজ্ঞান সাময়িকীতে এই গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
২০১২ সালে মঙ্গলের গেইল ক্রেটার নামের একটি গহ্বরে অবতরণ করে কিউরিওসিটি। ২০২০ সালে গহ্বরটির ‘গ্লেন টরিডন’ নামক এলাকায় এই বিশেষ পরীক্ষাটি চালায় রোভারটি। এই অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে কাদামাটি বা ক্লে মিনারেল পাওয়া গেছে, যা সেখানে একসময় পানির উপস্থিতির প্রমাণ দেয়। অ্যামি উইলিয়ামস জানিয়েছেন, অন্যান্য খনিজের তুলনায় কাদামাটি জৈব অণুকে অনেক বেশি সময় ধরে সংরক্ষিত রাখতে সক্ষম।
এ পরীক্ষার জন্য কিউরিওসিটির ‘স্যাম্পল অ্যানালাইসিস অ্যাট মার্স’ (স্যাম) নামের একটি উন্নত যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। রোভারটি মঙ্গলের তলদেশের কঠিন শিলা (বেডরক) ড্রিল করে গুঁড়া সংগ্রহ করে। সেই গুঁড়াকে একটি রাসায়নিক মিশ্রণের মাধ্যমে ভেঙে ক্ষুদ্র অংশে পরিণত করা হয়, যাতে যন্ত্রটি সহজে তা শনাক্ত করতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, মঙ্গলের তেজস্ক্রিয় পরিবেশেও বড় ও জটিল জৈব পদার্থগুলো মাটির গভীরে সংরক্ষিত রয়েছে। নাসার বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, যদি মঙ্গলে কখনো অণুজীব থেকে থাকে, তবে পানির উৎসগুলো ছিল তাদের প্রধান আবাসস্থল। গত বছর নাসার আরেক রোভার ‘পারসিভারেন্স’ অন্য একটি গহ্বরে এমন কিছু শিলা খুঁজে পেয়েছিল, যা অণুজীবের রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে তৈরি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মঙ্গলের পরিবেশ কি আসলেই কখনো বসবাসের যোগ্য ছিল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কিউরিওসিটি রোভারের এই অভিযান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও বর্তমানে পাওয়া এই জৈব পদার্থগুলো উল্কাপাত বা অন্য কোনো ভূতাত্ত্বিক কারণেও তৈরি হতে পারে, তবে বিজ্ঞানীরা আশাবাদী। তাদের মতে, ভবিষ্যতে আরও উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে যখন মঙ্গলের শিলা পৃথিবীতে আনা সম্ভব হবে, তখনই চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হওয়া যাবে লাল গ্রহের প্রাণের রহস্য নিয়ে। বর্তমানের এই সাফল্য মহাকাশ বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় নিঃসন্দেহে এক বিশাল মাইলফলক।


