প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। তবে এর একটি নেতিবাচক প্রভাব লক্ষ করা যাচ্ছে মানুষের কথা বলার অভ্যাসে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের কথা বলার পরিমাণ দিন দিন কমে যাচ্ছে। বর্তমানে একজন মানুষ প্রতিদিন গড়ে ৩৩৮টি শব্দ কম বলছেন। মৌখিক কথোপকথনের এই নিম্নমুখী প্রবণতা বিজ্ঞানীদের চিন্তায় ফেলে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি-কানসাস সিটি বিশ্ববিদ্যালয় ও অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানীরা যৌথভাবে এই গবেষণা পরিচালনা করেছেন। গবেষকরা ২০০৫ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৪ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, প্রতি বছর মানুষের কথা বলার হার আগের বছরের তুলনায় কমছে। একজন মানুষের বার্ষিক কথা বলার হিসাব করলে দেখা যায়, বছরে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার শব্দ কম উচ্চারিত হচ্ছে। এই বিপুল পরিমাণ শব্দের ঘাটতি মানে হাজার হাজার মানবিক মিথস্ক্রিয়া হারিয়ে যাওয়া।
গবেষণাটির প্রধান লেখক ড. ভ্যালেরিয়া ফাইফার বলেন, ‘দৈনন্দিন আচরণের এই ছোট পরিবর্তনগুলো দীর্ঘমেয়াদে বড় প্রভাব ফেলে। বছরের পর বছর কথা বলার পরিমাণ কমতে থাকলে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের ধরন বদলে যেতে পারে।’
তথ্যমতে, ২০০৫ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে সামগ্রিকভাবে মানুষের কথা বলা ২৮ শতাংশ কমেছে। বিজ্ঞানীরা যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং অস্ট্রেলিয়ার প্রায় ২ হাজার মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অডিও রেকর্ড বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। অংশগ্রহণকারীদের বয়স ছিল ১০ থেকে ৯৪ বছর।
গবেষণায় কেন কথা বলার পরিমাণ কমছে তার সুনির্দিষ্ট কারণ বলা না হলেও একটি বিশেষ সময়ের দিকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। ২০০৫ থেকে ২০১৯ সালের এই সময়কালটি মূলত সোশ্যাল মিডিয়া, খুদে বার্তা এবং ই-মেইলের উত্থানের সময়। গবেষকদের ধারণা, আগে যে আলাপগুলো সরাসরি কথা বলার মাধ্যমে হতো, তা এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে টাইপিংয়ের মাধ্যমে হচ্ছে। তবে টাইপ করা কথা আর সরাসরি কণ্ঠস্বরের আলাপের সামাজিক সুফল কি একই রকম? ড. ফাইফারের মতে, এটি এখনো বড় একটি প্রশ্ন।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ২৫ বছর বা তার কম বয়সী তরুণ প্রজন্মের মধ্যে কথা বলার হার হ্রাসের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। প্রযুক্তি ও স্মার্টফোনের ওপর অত্যধিক নির্ভরশীলতা এর প্রধান কারণ। মানুষ ২ লাখ বছর ধরে মৌখিক ভাষার ওপর নির্ভর করে সামাজিক বন্ধন টিকিয়ে রেখেছে। এখন ডিজিটাল যোগাযোগের এই পরিবর্তন মানুষের একাকিত্ব, মানসিক স্বাস্থ্য এবং সুস্থতার ওপর কোনো সামাজিক মূল্য বা নেতিবাচক প্রভাব ফেলে কি না, তা নিয়ে আরও বিস্তারিত গবেষণার প্রয়োজন বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা। সরাসরি কথা বলা কমে যাওয়া মানে একে অপরের সঙ্গে আবেগের আদান-প্রদান কমিয়ে দেওয়া, যা দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।


