একের পর এক ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে ভারতের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) নয়াদিল্লির প্রধান বিক্ষোভস্থলে অবস্থানরত জেন-জি প্রজন্মের পাঁচজন আন্দোলনকারী তাদের এই আন্দোলনে যোগদানের কারণ জানিয়েছেন।
২০২৪ সালে পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে মোদি সরকারের জন্য এ আন্দোলন অন্যতম বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
‘দমিয়ে রাখা ক্ষোভ’
২১ বছর বয়সী মধু বলেন, চিকিৎসাবিজ্ঞান ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, যার ফলে ২০ লাখের বেশি পরীক্ষার্থীকে পুনরায় পরীক্ষা দিতে হয়, সেটিই আন্দোলনের সূচনা ঘটায়।
তিনি বলেন, ‘প্রশ্নপত্র ফাঁস ছিল স্ফুলিঙ্গ, আর সিজেপি মানুষকে প্রতিবাদের একটি প্ল্যাটফর্ম দিয়েছে।’
তার ভাষায়, ‘এখন এটি শুধু শিক্ষা নয়, বেকারত্ব থেকে শুরু করে এই সরকারের আমলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সংকটসহ নানা সমস্যা নিয়ে কথা বলার একটি মঞ্চে পরিণত হয়েছে।’
মধু মনে করেন, দীর্ঘদিনের দমিয়ে রাখা ক্ষোভই মানুষকে আন্দোলনে নামতে উদ্বুদ্ধ করেছে। অনেক দিন হলো সরকার আন্তরিকভাবে আমাদের সঙ্গে কথা বলেনি।’
প্রতিবাদস্থল পরিষ্কার করতে করতে তিনি বলেন, তার বাবা-মা তার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাই তিনি মুখে সার্জিক্যাল মাস্ক পরে শুধু নিজের প্রথম নাম ব্যবহার করছেন। কখনও কখনও নিজের ভয়কে জয় করতেই হয়।’
‘মন্ত্রীকে বরখাস্ত করুন’
২৩ বছর বয়সী আরোহি সিং উত্তরাঞ্চলের লখনউ থেকে রাতভর ট্রেনে চেপে দিল্লিতে এসেছেন। সঙ্গে একটি ব্যাগ, তবে ফেরার কোনো টিকিট নেই। আমার বাবা-মা বলেছেন, গিয়ে আমাদের উপস্থিতি জানান দাও।’
একটি বিউটি সেলুন পরিচালনাকারী আরোহি বলেন, ‘থাকার জায়গা নেই, কিন্তু সমস্যা নেই। অন্তত হাজারো মানুষের সঙ্গে আছি।’
তার পরিবারের জন্য এই আন্দোলন ব্যক্তিগতও বটে। তার ছোট বোন প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে পুনরায় মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা দিলেও এবার আর উত্তীর্ণ হতে পারেনি।
তিনি বলেন, ‘ওর প্রস্তুতির জন্য বাবা-মা কত টাকা খরচ করেছেন, আমি জানি। কিন্তু প্রশ্নপত্র ফাঁসের পর সে ভেঙে পড়েছিল।’
সরকার শিক্ষামন্ত্রীকে অপসারণে অনীহা দেখানোয় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘একদিকে দেশের মানুষ, অন্যদিকে একজন মন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী কেন তাকে বরখাস্ত করতে পারছেন না?’
‘জবাবদিহি চাই’
২৮ বছর বয়সী করপোরেট কর্মী সাহিল সোমবার থেকে প্রতিদিনই কর্মস্থলে অসুস্থতার কথা বলে বিক্ষোভে যোগ দিচ্ছেন।
বৃহস্পতিবার তিনি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শুভানুধ্যায়ীদের পাঠানো শত শত খাবার বিতরণের সমন্বয় করছিলেন।
তিনি বলেন, ‘আমি বুঝতে পারি, ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীরা কী পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাই আমি এখানে এসেছি।’
শুধু প্রথম নাম প্রকাশ করতে ইচ্ছুক সাহিল বলেন, ‘আমি জবাবদিহি দাবি করতে এসেছি।’ আন্দোলনটি এখন শিক্ষার্থীদের দাবির গণ্ডি ছাড়িয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশে পরিণত হয়েছে। শুরুটা ছিল শিক্ষা নিয়ে। এখন মানুষ নিজেদের বিভিন্ন সমস্যাও তুলে ধরছে।’
‘আশা’
মধ্যপ্রদেশের একটি ছোট শহর থেকে আসা ১৭ বছর বয়সী প্রকৌশল শিক্ষার্থী কুনাল সূর্যবংশী বলেন, এই আন্দোলন তাকে এমন মানুষের সঙ্গে থাকার সুযোগ করে দিয়েছে, যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস দেখাচ্ছেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা এমন একটি বৈষম্যপূর্ণ দেশে বাস করি, যেখানে প্রায় প্রতিটি প্রতিবাদই কঠোরভাবে দমন করা হয়।’ আমি এমন কিছুর অংশ হতে এসেছি, যা হয়তো পরিবর্তন আনবে।’
তিনি আপাতত দিল্লিতেই থাকার পরিকল্পনা করেছেন। দিনে বিক্ষোভস্থলে থাকবেন, আর রাতে কাছের একটি শিখ মন্দিরে আশ্রয় নেবেন।
তিনি বলেন, ‘সেখানে জায়গা না পেলে ফুটপাতে ঘুমাতেও আমার সমস্যা নেই।’ মুখের অর্ধেক অংশ রুমাল দিয়ে ঢেকে তিনি বলেন, ‘আমার সঙ্গে শুধু একটাই জিনিস আছে- আশা।’
‘ভেঙে পড়া’ ব্যবস্থা
পাঞ্জাবের আইন শিক্ষার্থী ২৪ বছর বয়সী যুবরাজ স্পাইডারম্যানের মুখোশ পরে এলেও নিজের ক্ষোভ লুকাতে পারেননি।
তিনি বলেন, ‘আমরা নজরদারিনির্ভর একটি রাষ্ট্রে বাস করছি। রাষ্ট্র আমাদের দেখছে, তাই ঝুঁকি নেওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু এখানে না এলে সেটাই হতো আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আফসোস।’
তার ভাষায়, ‘আমাদের প্রতিবাদ করতেই হবে। কারণ পুরো ব্যবস্থাই ভেঙে পড়েছে, আর কিছু বিষয় ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়েও বড়।’
যুবরাজ জানান, গত বছর তিনি যে সরকারি চাকরির পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন, সেটির প্রশ্নপত্রও ফাঁস হয়েছিল। বছরের পর বছর প্রস্তুতি নেওয়ার পর প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যায়। এরপর বলা হয়, পরের বার আবার চেষ্টা করুন। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এখানে অবশ্যই জবাবদিহি থাকতে হবে।’ সূত্র: এএফপি
নাঈম/