বন থেকে বাগানে সহস্রবেলি । খবরের কাগজ
ঢাকা ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, মঙ্গলবার, ২১ মে ২০২৪

বন থেকে বাগানে সহস্রবেলি

প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২৪, ১১:৫০ এএম
বন থেকে বাগানে সহস্রবেলি
গাজীপুরের কালীগঞ্জের ফুলদি গ্রামে ফোটা সহস্রবেলি ফুল। ছবি: লেখক

ভাঁটফুল এ দেশের পথের পাশে প্রায়ই চোখে পড়ে। বসন্ত এলে ডালের মাথায় সুন্দর সাদা সুগন্ধি ফুল ফোটে। সহস্রবেলি গাছের পাতাও ভাঁটফুলের মতো। এ জন্য গ্রামে এ গাছকে বলা হয় চন্দনা ভাঁট, অন্য নাম হাজারী বেলি ও রাজবেলি। 

তবে ফুলগুলো ভাঁটফুলের মতো না, ওর ফুল দেখতে অনেকটা বেলি ফুলের মতো। একটি থোকায় বেলি ফুলের মতো এ রকম অনেক ফুল থাকে বলেই ওর বাংলা নাম রাখা হয়েছে সহস্রবেলি। সহস্র কেন হলো তা অবশ্য বোঝা গেল না। কেননা, শতাধিক ফুল একটি মঞ্জরিতে থাকলেও তার সংখ্যা কখনোই হাজার পার হবে না। ইংরেজি নাম গ্লোরি বোয়ার, উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Clerodendrum chinense. 

গাছটার জন্ম চীনে। গাছটা এ দেশে এসেছে নেপাল ও হিমালয়ের পূর্বাঞ্চল থেকে। তবে এখন তা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশেই চোখে পড়ে। চীন, ভারতের আসাম ও আন্দামান নিকোবর, মালয়েশিয়া প্রভৃতি দেশে এ গাছ জন্মাতে দেখা যায়। এমনকি ফিজি, পূর্ব আফ্রিকা, ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ ও ফ্লোরিডাতেও এ গাছ আছে। এ দেশে কক্সবাজার, ঠাকুরগাঁও ও দিনাজপুরের বাঁশবনগুলোর মধ্যে এ ফুলগাছটিকে দেখেছি বুনো আগাছার মতো জন্মাতে।

অযত্নে লালিত সেসব গাছের ফুলগুলোর চেহারা অবশ্য লালিত গাছগুলোর ফুলের চেয়ে কিছুটা ম্লান, আকারেও ফুলগুলো ছোট। পোকামাকড়ের উপদ্রব দেখা যায় ফুলগুলোর ভেতর, বিশেষ করে পিঁপড়ার। যেখানেই দেখেছি, দু-একটা গাছ না, বেশ খানিকটা জায়গায় ঝোপ করে রেখেছে গাছগুলো। ঢাকায় রমনা উদ্যান ও বলধা গার্ডেনেও এ গাছ আছে।

ভার্বেনেসি গোত্রের গুল্মপ্রকৃতির এ গাছ বাঁচে কয়েক বছর, না কাটলে গাছটি ৩ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। ছেঁটে ছেঁটে সুন্দর গড়নে রাখলে ডালপালা বেশি হয় ও ফুলও ভালো ফোটে। গাছের ডালপালা ও কাণ্ড চৌকোনাকার, আগার দিকটা রোমশ। পাতা পানপাতার মতো হলেও মখমল কোমল, নরম। পাতার ওপরের পিঠ সবুজ ও নিচের পিঠ ধূসর সবুজ। সাদা রঙের ফুলগুলোতে এক ধরনের গোলাপি দাগ বা ছোপ থাকে, যা ফুলগুলোকে আলাদা সৌন্দর্য দেয়। সুগন্ধ ভেসে আসে ফোটা ফুল থেকে। ফুল ফোটার প্রকৃত সময় এপ্রিল থেকে আগস্ট হলেও ডিসেম্বরেও এ ফুলের দেখা পেলাম।

অনেকেই এখন শখ করে এই বুনো গাছকে বাগানে লাগাচ্ছেন, নার্সারিতে এর চারাও মিলছে। কিন্তু একবার যদি জন্মানো যায়, তবে একে উচ্ছেদ করা কঠিন। এ গাছের শিকড় যতদূর পর্যন্ত মাটির তলা দিয়ে বয়ে যাবে, সেসব শিকড় থেকে সেখানেই এর চারা গজাবে। গিঁটসহ ডাল কেটে ভেজা মাটিতে পুঁতে দিলে তা থেকেও চারা জন্মে। কোনো কোনো দেশে একে আগ্রাসী আগাছা হিসেবে মনে করা হয়। 

গাছটি বিপন্ন না। তবে সব জায়গায় ভাঁটগাছের মতো চোখেও পড়ে না। গাছটির বেশ কিছু ঔষধি গুণ আছে বলে জানা যায়। চীনের কয়েকজন গবেষক গবেষণা করে দেখেছেন যে, এ গাছের নির্যাস বা রস ক্যানসার, উচ্চরক্তচাপ, ডায়রিয়া, হাইপোগ্লাইসেমিক বা ডায়াবেটিস প্রভৃতি অসুখের বিরুদ্ধে কার্যকর, স্মৃতিশক্তিও বাড়ায়। এ দেশে আদিবাসীদের কেউ কেউ গেঁটে বাতের ব্যথা হলে ও কাঁপুনি দিয়ে জ্বর এলে চন্দনা ভাঁটের পাতা গরম করে সেঁক দেন। 

পাখিবন্ধু ইনাম আল হক ও বইবন্ধু সৈয়দ জাকির হোসাইনের সঙ্গে এ বছর এক শীতের সকালে গিয়েছিলাম প্রকৃতিবন্ধু মাহবুবুর রহমানের প্রকৃতিবাড়িতে। গাজীপুরের কালীগঞ্জে ফুলদি গ্রামের সে বাড়িতে গিয়েই দেখা পেয়েছিলাম সহস্রবেলি ফুলের। সেখানে আরও দেখা পেলাম হংসলতা, হস্তীলতা, হিজল, পলাশ, চাঁপা, নাগচাঁপা, লতাপারুল, বিচিত্র হেলিকোনিয়া, শিউলি, রক্তকাঞ্চন, বুদ্ধ নারকেল, রুদ্রাক্ষ ইত্যাদি গাছের। 

দিন শেষে ফিরে এলাম ক্যামেলিয়া গাছটার অসংখ্য কুঁড়ি দেখার তৃপ্তি নিয়ে। শীত শেষে সেগুলো ফুটে আলোময় করবে ওখানকার প্রকৃতি আর মানুষের মন। আশা রইল, রবীন্দ্রনাথের সেই ক্যামেলিয়ার রূপ দেখতে আমরা আবার এক দিন হয়তো সেখানে যাব।

কাস্তেচরার চীন অভিযান

প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৪, ১১:১২ এএম
কাস্তেচরার চীন অভিযান
ছবি: লেখক

পাখিপ্রেমীদের জন্য সুখবর। বাংলাদেশে খয়রা-কাস্তেচরার সংখ্যা বাড়ছে। দুই দশক আগে এর সংখ্যাটা শূন্য ছিল, এখন কয়েক হাজার হয়েছে। আরও তাজা খবর হলো, সুদর্শন এই পাখি এবার হাজির হয়েছে হাইনান দ্বীপে। গত দুই সপ্তাহ ধরে চীনের স্বশাসিত এই দ্বীপে প্রথমবারের মতো খয়রা-কাস্তেচরার দেখা মিলেছে। 

গত ১১ মে বিশ্ব পরিযায়ী পাখি দিবসে হাইনানবাসীরা পেয়েছেন কাস্তেচরার চমকপ্রদ এ উপহার। তবে চীনে পাখি-দর্শকের চেয়ে পাখি-ভক্ষকের সংখ্যা বেশি। তাই হাইনান-প্রশাসক নবাগত এই পাখির জন্য ‘প্রথম-স্তরের নিরাপত্তা’ ঘোষণা করেছেন। বিশ্বে আর কোথাও খয়রা-কাস্তেচরার জন্য কখনো এই ঘোষণা দেওয়া হয়নি। 

বিশ্বে খয়রা-কাস্তেচরার প্রসার ঘটছে গত তিন শতাব্দী ধরে। তার আগে সম্ভবত এর নিবাস ছিল একমাত্র আফ্রিকা মহাদেশে। এ পাখি ইউরোপ মহাদেশের পর্তুগাল, স্পেন ও ফ্রান্সে বাস করছে গত ২০০ বছর ধরে এবং ইংল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড ও ইউরোপের শীতল উত্তরাঞ্চলে এর বিস্তৃতি ঘটেছে মাত্র ১৫ বছর আগে। 

আটলান্টিক মহাসাগর পার হয়ে খয়রা-কাস্তেচরা আমেরিকা গেছে মাত্র ১০০ বছর আগে। এই এক শ বছরে আমেরিকা মহাদেশদ্বয়ের পূর্ব উপকূল বরাবর এর বসতি দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে এবং ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এ পাখির বাড়বাড়ন্ত ঘটেছে সবচেয়ে বেশি।

অস্ট্রেলিয়ায় এ পাখি বাসা বাঁধছে ১৯৩০ থেকে। সম্ভবত তার আগেই এরা পশ্চিম ভারতে স্থায়ী বাসিন্দা হয়েছিল। শীতে বাংলাদেশেও এর আগমন ঘটত। কিন্তু বিশ শতকের শেষ দিকে এ দেশে এ পাখি আর দেখা যায়নি। গত দুই দশক ধরে আবার এদের দেখা মিলছে এবং সংখ্যাবৃদ্ধিও হচ্ছে। এই দুর্দিনে খুব কম পাখিই এভাবে সংখ্যাবৃদ্ধি করতে ও ছয়টি মহাদেশে ছড়িয়ে পড়তে পেরেছে। 

খয়রা-কাস্তেচরার এই সাফল্যের কারণ কী! প্রথম কারণ, এর আহারে বাছবিচার কম। পোকামাকড়, শামুক-ঝিনুক, কাঁকড়া-বিছা, সাপ-ব্যাঙ, কেঁচো-জোঁক সবই আছে তার খাবারের তালিকায়। আবার কাদায় আটকে থাকা বীজ-দানা খেতেও আপত্তি নেই। দ্বিতীয় কারণ, চরম যাযাবর এই পাখির ছানারা বাসা ছেড়ে যাওয়ার পরই দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে। কৃষ্ণসাগর এলাকায় রিং লাগিয়ে দেওয়া একটি ছানাকে সাহারা মরুভূমি পার হয়ে পূর্ব-আফ্রিকায় চলে যেতে দেখা গেছে। 

অনেকে অনুমান করেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে পোকামাকড়, কাঁকড়া-বিছা ইত্যাদির বাড়বাড়ন্ত হওয়ায় খয়রা-কাস্তেচরার মতো পাখিদের প্রসার ঘটছে। আমরা অনুমান করি যে সুদর্শন, সৌম্য ও প্রসন্ন এ পাখিটির জন্য মানুষের ভালোবাসাও এর সাফল্যের পিছনে রয়েছে। অভিজাত এই পাখির পশমি-খয়েরি মাথা ও গলা, উজ্জ্বল তামাটে ও ধাতব সবুজ ডানা এবং সজল কালো চোখ সহজেই লোকের দৃষ্টি কাড়ে।

মানুষের আহার্য হিসেবে এ পাখি যে বেশি আকর্ষণীয় নয়, সে কথাটাও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। আকারে বিশাল হলেও এর গায়ে মাংস খুবই কম। লম্বা পায়ের আঙুল থেকে দীর্ঘ চঞ্চুর প্রান্ত পর্যন্ত মাপলে পাখিটি দুই ফুট লম্বা; কিন্তু ওজন মাত্র আধা কেজি। পলকা দেহের এই পাখি তাই তিন ফুট পরিসরের দুটি ডানায় ভর করে সহজেই উড়ে পালায়, পার হয় মহাদেশ ও মহাসাগর। 

এখন আমরা শীতে বাইক্কা বিল, টাঙ্গুয়ার হাওড় ও ভোলার চরাঞ্চলে শত শত খয়রা-কাস্তেচরা দেখতে পাই। ভবিষ্যতে এ পাখি ভোলার চরাঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করলেও আমরা অবাক হব না। মাত্র ১৫ বছর আগে ইংল্যান্ডে পরিযায়ন করে এখন সেখানে এরা থিতু হয়েছে এবং লিঙ্কনশায়ারে বাসা করছে বলে সংবাদ এসেছে। 

পৃথিবীর ২৯ প্রজাতির কাস্তেচরার মাত্র তিনটিকে আমরা বাংলাদেশে দেখতে পাই। সবচেয়ে বেশি দেখি কালামাথা-কাস্তেচরা এবং সবচেয়ে কম কালা-কাস্তেচরা। তিন প্রজাতির কাস্তেচরাই এ দেশে থাকে শীতকালে। এখানে এরা স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করলে এবং বাসা বাঁধলে মন্দ কী! জোয়ার-ভাটায় প্লাবিত যেসব উপকূলীয় চরে মানুষের ঠাঁই নেই, সেখানেই তো সব কাস্তেচরাদের আনাগোনা। উষ্ণায়নের জোয়ারে তা তলিয়ে যাওয়ার আগে ওরাই থাকুক না ওখানে ছানাপোনা নিয়ে। 

রক্তক্ষরা ব্লিডিং হার্ট ফুল

প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৪, ১০:৩৯ এএম
রক্তক্ষরা ব্লিডিং হার্ট ফুল
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কার্জন হলের সামনে ফোটা ব্লিডিং হার্ট ফুল। ছবি: লেখক

বৈশাখের এক নম্র সকাল। রোদের তাত তখনো বাড়েনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের সামনের পথে হাঁটছি। চারদিকে তাকিয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছি কোথায় কোন গাছে আজ কী ফুল ফুটল। হঠাৎ পেয়ে গেলাম জাপানি হানিসাকল আর ব্লিডিং হার্ট গাছ। দুটোই লতানো। ভূশায়িত হয়ে কিছুটা মাথা তুলে গাছ দুটো আকাশ দেখার চেষ্টা করছে। 

আশপাশের বিশাল মেহগনি আর নাগলিঙ্গম গাছের ছায়ায় ওরা আচ্ছন্ন। সকাল বলে তবু তেরছা হয়ে একমুঠো রোদ্দুর এসে পড়েছে গাছগুলোর গায়ে। ছোট গাছের বড় গাছদের কাছ থেকে যেন এ গাছের চলছে করুণা ভিক্ষা- দাও আলো, দাও জীবন হে আমার বয়োজ্যেষ্ঠ। গাছগুলোকে দেখে বড় করুণা হলো। বেঁচে থাকার এক দুর্মর বাসনা নিয়ে ওরা টিকে আছে আসলে সেখানকার মালীদের যত্নে। এই যত্নটুকুর জন্যই হয়তো ওরা উজাড় করে ফুল ফোটাচ্ছে, আনন্দ দিচ্ছে মানুষকে।   

এত সব প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও সে গাছকে দেখে মনে হয়, ওদের যেন কোনো বেদনা নেই, কষ্ট নেই। কোনো পুষ্পপ্রেমিক হয়তো তাকে কোনো দিন দেয়নি কোনো ব্যথার ছোঁয়া। বরং তার লতানো শরীরে ঝুলে থাকা দুলের মতো গোছা গোছা ফুলের দিকে বাড়িয়ে দিয়েছি আদরের হাত। তবু সে যেন এক দুঃখী রাজকন্যা, তার বুক চিরে ঝরে রক্তের ফোঁটার মতো খুদে খুদে পাঁচ পাপড়ির রক্তলাল ফুল। এ জন্যই বোধ হয় ওর ইংরেজি নাম রাখা হয়েছে ব্লিডিং হার্ট। বাংলা কিরণময়ী নামটা ভারতীয়, তবে নামটা কিরণময়ী না হয়ে করুণাময়ী হলে মনে বেশি মানাত। 

বাংলাদেশে এর বাংলা নামকরণ করা হয়েছে হৃদয়হারা বা হৃদয়ক্ষরা। এর উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Clerodendrum thomsoniae, গোত্র ভার্বেনেসী। অর্থাৎ এ গাছ ভাঁটফুলের সহোদর। এ ফুলের এরূপ উদ্ভিদতাত্ত্বিক নামকরণের অনুরোধ করেন নাইজেরিয়ার এক মিশনারি চিকিৎসক রেভারেন্ড উইলিয়াম থমসন, তার প্রয়াত স্ত্রীর নামের সম্মানে, তাই এর নামাংশ দেওয়া হয় থমসনি, ক্লিরোডেনড্রাম গ্রিক শব্দের, যার অর্থ চান্স ট্রি। উনিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত এ ফুলের সৌন্দর্যের কারণে ইংরেজি নাম ছিল বিউটি বুশ। 

এটি আমাদের দেশের গাছ না, গাছের উৎপত্তিস্থল পশ্চিম আফ্রিকা। সত্যিই এমন অবিশ্বাস্য এ ফুলের গড়ন। এ ফুলটি আকৃতিতে লণ্ঠনের মতো। প্রতিটি ফুলের বৃতিগুলোর সুচালো ডগা ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে একটি লাল ফুল, ঝুলতে থাকে নিচমুখো হয়ে। ফুলের মধ্যে কখনোবা উঁকি দেয় সাদা রঙের পুংকেশর। সবুজ হৃৎপিণ্ডাকার পাতা, লতানো স্বভাব আর থোকাভরা ফুল সত্যি বিরল। তবে কেউ চাইলে লতার আগাগুলো ছেঁটে একে ঝোপ বানিয়ে রাখা যায়। 

সারা বছর সে ঝোপে কমবেশি ফুল হয়তো ফোটে। তবে গ্রীষ্ম-বর্ষায় ফোটে বেশি। এ গাছটি বাড়ির আঙিনায় হয়ে উঠতে পারে চিরদুঃখী এক স্বপ্নকুমারী। আর বর্ষাকালে ডাল কেটে কলম করে বাড়িয়ে নেওয়া যায় গাছ। এ দেশে এই লতানো স্বভাবের শোভাবর্ধক ফুলের গাছটা ইতোমধ্যেই বিভিন্ন বাগানে ছড়িয়ে পড়েছে, কেউ কেউ টবেও লাগিয়েছেন। নার্সারিতে এখন কয়েক জাতের ব্লিডিং হার্টের চারা পাওয়া যাচ্ছে। খুলনায় এক নার্সারিতে দেখেছি একটি বিচিত্র ব্লিডিং হার্টের গাছ। সে জাতের গাছের পাতা সবুজ ও সাদা রঙে চিত্রিত, কিন্তু ফুলের আকার ও রং একই। আর এক জাতের ব্লিডিং হার্টের গাছ দেখেছি, যার বৃতির রং হালকা বেগুনি।

ব্লিডিং হার্ট ভূশায়িত লতানে প্রকৃতির বহুবর্ষজীবী চিরসবুজ গাছ। ৪ মিটার পর্যন্ত গাছটি লম্বা হতে পারে। পাতা অবডিম্বাকার, সবুজ ও শিরাবিন্যাস স্পষ্ট। একটি ছড়ায় অনেক ফুল গুচ্ছাকারে ফোটে। আমরা ফুলের বোঁটার কাছে যে সাদাটে ঘিয়া রঙের ত্রিকোণাকার অঙ্গ দেখি, সেটা ফুলের বৃতি। পাঁচটি বৃতি আবদ্ধ করে রাখে ফুলের পাপড়িকে। ফুল ফুটলে লাল রঙের পাপড়ি নিয়ে বৃতির বাইরে এসে ঝুলতে থাকে ফুল। পাপড়িগুলোর মাঝখান থেকে বেরিয়ে আসে লম্বা চিকন সুতার মতো কেশরগুলো। সাধারণত গ্রীষ্মকালে বেশি ফুল ফোটে। তবে বছরের অন্য সময়েও কিছু কিছু ফুল ফুটতে দেখা যায়। 

পতঙ্গ দ্বারা ফুলের পরাগায়ন ঘটে, এরপর হয় ফল। ফলের রং প্রথমে থাকে সবুজ, পরে হয় লাল, শেষে কালো হয়ে ফেটে বীজ ছড়িয়ে পড়ে। একটি ফলে চারটি কালো রঙের বীজ থাকে। বীজ থেকেও চারা হয়। বেশি ও ভালো ফুল পেতে চাইলে এ গাছে পর্যাপ্ত পানি ও পরিমিত সার দিতে হবে। রোদ যেখানে পড়ে, সেখানে এ গাছ ভালো হয়।

মেছোবাঘ: বাঘ শুধু নামেই

প্রকাশ: ১২ মে ২০২৪, ১২:২৫ পিএম
মেছোবাঘ: বাঘ শুধু নামেই
মেছোবাঘ বাঘের মত দেখতে হলেও এরা বাঘ নয়। ছবি: সংগৃহীত

নাম মেছোবাঘ। দেখতে বাঘের মতো হলেও মূলত এটি বিড়ালগোত্রীয় প্রাণী। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মেছোবাঘ কম বেশি দেখা গেলেও হাওর অঞ্চলে এদের দেখা যায় বেশি। বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলে এই প্রাণীটির বিচরণ বেশি। বিভিন্ন অঞ্চলে মেছোবাঘ বিভিন্ন নামে পরিচিত। অনেক অঞ্চলে মেছোবিড়াল, ছোট বাঘ, বাঘরোল বা বাঘুইলা নামে এটি পরিচিত। এদের গায়ে ছোপ ছোপ দাগ থাকায় চিতাবাঘ বলেও ভুল করে থাকেন অনেকে।

মেছোবাঘ মাঝারি আকারের স্তন্যপায়ী প্রাণী। এটি দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পাওয়া যায়। মেছোবাঘের বৈজ্ঞানিক নাম Prionailurus viverrinus বা Felis viverrina। ইংরেজি নাম Fishing Cat। এরা নিশাচর। ব্রাজিল, কোস্টারিকা, বাংলাদেশ, ভারত, বলিভিয়া, কম্বোডিয়া, লাওস, শ্রীলঙ্কায় এরা স্থানীয়ভাবে বাঘরোল নামে পরিচিত। মেছোবাঘের আদি আবাসস্থল থাইল্যান্ড ও এল সালভাদরে।

বাংলাদেশে মেছোবাঘ সাধারণত জলাভূমি, নদীর প্রবাহ, অশ্বখুরাকৃতি হ্রদ, জলাভূমি এবং ম্যানগ্রোভে বাস করে। এদের উপস্থিতি সেখানকার জলাভূমির অবস্থার ভালো-মন্দ নির্ধারণে সাহায্য করে। এরা সাঁতারে পারদর্শী হওয়ায় এ ধরনের পরিবেশে সহজেই খাপ খাওয়াতে পারে।

মেছোবাঘের প্রধান খাবার মূলত মাছ। এ ছাড়া কাঁকড়া, শামুক, মুরগি, হাঁস, ছাগল, ভেড়াও এই প্রাণীর খাদ্য তালিকায় রয়েছে। মাছ ধরার জন্য মেছোবাঘ বা মেছোবিড়াল পানিতে নামে না। পানির ওপর কোনো গাছের ডালে বা পানির ওপর জেগে থাকা কোনো পাথরে বসে থাবা দিয়ে শিকার ধরে। তবে খুব খাদ্যাভাব দেখা দিলে মেছোবাঘ মানুষের ওপরও আক্রমণ করে থাকে। তবে এরা হিংস্র হলেও খুব ভীতু প্রকৃতির প্রাণী।

এরা আকারে গৃহপালিত বিড়ালের চেয়ে অনেকটা বড় হয়। শরীর ঘন, পুরু লোমে আবৃত। পুরুষ মেছোবিড়াল আকারে স্ত্রী মেছোবিড়ালের চেয়ে বড় হয়ে থাকে। এদের চেহারা ও গায়ের ডোরা অনেকটা বাঘের মত। মেছোবিড়াল লেজসহ লম্বায় সাড়ে তিন ফুটের মতো হয়ে থাকে। সামান্য হলুদ মেশানো ধূসর রঙের চামড়ায় মোটামুটি লম্বালম্বিভাবে কয়েক সারি গাঢ় হলুদ ডোরা থাকে। পেটের নিচের রং সাদাটে। এদের কান ছোট এবং গোলাকার হয়। চোখের পেছন থেকে গলার শেষ পর্যন্ত ৬ থেকে ৮টি কালো বর্ণের ডোরাকাটা দাগ থাকে। পুরো শরীরে ছোপ ছোপ কালো দাগ আছে।

১৫ মাস বয়স হলে এরা প্রজনন উপযোগী হয়। সাধারণত মার্চ মাস থেকে জুন মাস পর্যন্ত এদের প্রজননের সময়। একসঙ্গে একাধিক বাচ্চা প্রসব করে থাকে মেছোবাঘ। এদের গড় আয়ু ১০ বছর।

বিভিন্ন কারণে গত কয়েক দশকে মেছোবাঘের সংখ্যা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এর পেছনে একটি বড় কারণ হলো মেছোবাঘের প্রতি মানুষের হিংসাত্মক মনোভাব ও ভ্রান্ত ধারণা।

বিশিষ্ট প্রাণিবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোস্তফা ফিরোজ বলেন, ‘মেছোবাঘ একটি বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী। বাংলাদেশে কতগুলো মেছোবাঘ আছে এই সংক্রান্ত কোনো সার্ভে বা জরিপ আমাদের করা হয়নি। তবে দিন দিন বিভিন্ন সংকটের কারণে এই প্রাণীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে। মাছ এদের প্রধান খাদ্য হওয়ায় এরা মূলত বিভিন্ন জলাশয় যেমন, টাঙ্গুয়ার হাওর, রাজশাহীর চলনবিল, শ্রীমঙ্গলের হাইল হাওর, বাইক্কার বিল এলাকায় বসবাস করে। কিন্তু এই এলাকাগুলোতে মাছ ধরার জন্য পাতা ফাঁদ, কারেন্ট জালে আটকে মারা যায় মেছোবাঘ। আবার এদের আবাসস্থল, ঝোপ-ঝাড়, বন-জঙ্গল বা অভয়ারণ্য ধ্বংস করে ফেলায় এরা বংশ বৃদ্ধি করতে পারছে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনে প্রজাতিটি একটি সংরক্ষিত প্রাণী। বাইক্কার বিলে ৫১ থেকে ৫৪টি বিল আছে, সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরে এদের অভয়ারণ্য রয়েছে কিছু জায়গায়। তবে এদেরকে বসবাসের পরিবেশ না দিলে এরা টিকবে কীভাবে? তাই শুধুমাত্র জনসচেতনতা নয় বরং আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং অভয়ারণ্য রক্ষার ব্যবস্থা করা দরকার।’ 

এক গবেষণায় দেখা গেছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ৪৫ শতাংশ অভয়ারণ্য এবং বিশ্বের ৯৪ শতাংশ জলাশয় ধীরে ধীরে মানুষের দখলে চলে যাওয়ায় বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল মুছে গেছে। ভারতের বণ্যপ্রাণী ও প্রকৃতি নিয়ে কাজ করা সংস্থা ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ড ফান্ড ফর নেচার ইন্ডিয়ার (ডব্লিউডব্লিউএফ) তথ্য মতে, বর্তমানে সারা বিশ্বে প্রায় ১০ হাজারের মতো মেছোবাঘ টিকে আছে।

তবে বনাঞ্চল বা আবাসস্থল ধ্বংস করে জনবসতি স্থাপন ও কৃষিজমিতে রূপান্তর, হাওর ভরাট, মানুষের অসচেতনতা ও ভ্রান্ত ধারণা, খাদ্যসংকট ইত্যাদি কারণে এদের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। 

একদিকে হাওরাঞ্চলে মাছের সংখ্যা দিন দিন কমে যাওয়ায় খাদ্যাভাবে মেছোবাঘ কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে মানুষ বাঘ মনে করে অনেক মেছোবাঘ হত্যার কারণেও এর সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে জলাশয় ভরাট এবং বন উজাড়ের কারণে এদের আবাসস্থল বিরাট হুমকির মুখে পড়ে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে এই প্রাণী।

তাই ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) ২০০৮ সালে মেছোবাঘকে বিপন্ন প্রজাতির প্রাণীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।

বাংলাদেশের ১৯৭৪ ও ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনের তফসিল-১ অনুযায়ী এ প্রজাতিটি সংরক্ষিত। 

মেছোবাঘ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দরকার জনসচেতনতা। আমাদেরকে পরিবেশ দূষণ রোধে কাজ করতে হবে। কারেন্ট জালের ব্যবহার কমাতে হবে। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কঠোর হতে হবে।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে এটিকে সেই রাজ্যের ‘রাজ্য প্রাণী’ তকমা দেওয়া হয়েছে এবং এই রাজ্য বর্তমানে বাঘরোল সংরক্ষণে বিশেষ ভূমিকা পালন করছে। যা মেছোবাঘের সংখ্যা বৃদ্ধিতে বিরাট অবদান রাখছে।

কালো মাথা বেনেবউ

প্রকাশ: ১১ মে ২০২৪, ১০:১১ এএম
কালো মাথা বেনেবউ
চুপ করে বসে আছে বেনেবউ, ঢাকার জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান থেকে তোলা। ছবি: লেখক

‘দেখেছি হলুদ পাখি বহুক্ষণ থাকে চুপ করে,
নির্জন আমের ডালে দুলে যায়-দুলে যায়-বাতাসের সাথে বহুক্ষণ;’
-জীবনানন্দ দাশ

মেঘশিরীষগাছে নতুন পাতা এসেছে। শাখা-প্রশাখার রং ঢেকে গেছে পাতার রঙে। তখন গ্রামবাংলায় পাখিদের বাসা বানানোর সময়। পাকড়া শালিক, লাল ঘুঘু, বুলবুলি, ছাতারে, হাঁড়িচাঁচা নিয়মিত মেঘশিরীষের ডালে ডাকাডাকি করছে। বাসা তৈরির জন্য উপযুক্ত জায়গা খুঁজছে ঘুঘু।

এমন দিনে একজোড়া হলুদ পাখি উড়ে এল। ঠোঁটে তাদের হলুদ নরম খড়। মেঘশিরীষের পাতি ডালে ঘনপাতার ভেতরে ওরা চলে গেল। ওই ডালেই ওদের বাসা। দুপুরের রোদ শেষে বিকেলের সময় শুরু হলো। মেঘশিরীষ বা রেইনট্রি গাছের পাতাগুলো তখন লজ্জাবতী পাতার মতো গুটিয়ে নিল ধীরে ধীরে ঝিরিঝিরি বাতাসের ছোঁয়ায়। মগডালে বেনেবউদের কাপের মতো সুন্দর বাসাটি দেখা গেল। ইংরেজি ‘ভি’ এর মতো ছড়ানো দুটি ডালের বিভাজিত অংশে এই বাসাটি। নরম খড়, ঘাস, গাছের তন্তু ও মাকড়সার জাল দিয়ে বাসাটি বানানো হয়েছে।

এ পাখিরা সাধারণত উঁচু গাছের মগডালেই বাসা বানায়। বাসা বানানোর জন্য মেঘশিরীষ ও বড় আমগাছ তাদের বেশ পছন্দ। দেখতে দেখতে এক দিন তাদের বাসায় ছানা এল। কয়েক সপ্তাহ ছানাদের কিচিরমিচির শুনেছি। উভয় পাখি ছানাদের খাবার খাওয়াত পালা করে। এক দিন ছানারা বাসা ছাড়ল এবং উড়ে চলে গেল কোথাও।

কালো মাথা বেনেবউ গ্রামবাংলায় হলদে পাখি নামে বহুল পরিচিত। লোকে এদের কুটুমপাখিও বলে। এ পাখি ডাকলে বাড়িতে মেহমান আসবে, এমন ধারণা বরিশালের গ্রামে গ্রামে বহুল প্রচলিত। আমরাও ছেলেবেলায় এমটি মনে করতাম। কালো মাথা বেনেবউ পালকের উজ্জ্বল হলুদ রঙের জন্য খুব সহজেই মানুষের চোখে পড়ে। সাধারণত একাকী এবং জোড়ায় চলে। কণ্ঠ সুমধুর। প্রজনন মৌসুমে তাদের গান শোনা যায়। বেশ পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি পাখি।

তাদের চলাফেরায় এক রকম নীরবতা, লাজুকতা এবং সৌন্দর্য আছে। আছে দারুণ ব্যক্তিত্ববোধ। যে কারণে এ পাখিটি আমার মন জয় করে নিয়েছে। মানুষকে মোটেও বিরক্ত করে না। গাছপালাময় মানুষের বসতির কাছেই থাকতে ভালোবাসে। শহরের পার্কেও তাদের দেখা যায়। এদের প্রধান খাদ্য হলো পাকা ফল, কীটপতঙ্গ ও ফুলের মধু। আম, জাম, পেঁপে, তেলাকুচা ফল পাকলে বেনেবউরা নিয়মিত সেখানে আসে।

সৌরভ মাহমুদ: প্রকৃতিবিষয়ক লেখক ও পরিবেশবিদ, জার্মান অ্যারোস্পেস সেন্টার
[email protected]

পরমসুন্দর উদয়পদ্ম ফুল

প্রকাশ: ১০ মে ২০২৪, ০৯:৫৬ এএম
পরমসুন্দর উদয়পদ্ম ফুল
গ্রীষ্মে কার্জন হলের সামনে ফুটেছে উদয়পদ্ম ফুল। ছবি: লেখক

পদ্মের মতো যে ফুলের উদয়, নাম তো তার উদয়পদ্মই হবে। কিন্তু বেশির ভাগ ফুলপ্রেমীর কাছে সে এ নামের চেয়ে ম্যাগনোলিয়া নামেই বেশি পরিচিত। উদয়পদ্ম নামটি দিয়েছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। উদয়পদ্ম দেখতে পদ্মের মতো হলেও পদ্ম না। ডালের ঠিক আগায় সূর্যের মতো উদয় হয় বলে কবিগুরু এর নাম দিয়েছিলেন উদয়পদ্ম।

বৈশাখের এক সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের সামনের প্রাঙ্গণে একজোড়া ম্যাগনোলিয়া গাছের সব ডালে ফোটা ফুল দেখে মন ভরে গেল। কাছে যেতেই ফুলগুলোর সুমিষ্ট সুবাস বাতাসে ভেসে এল। আহ্‌, কি মধুর ঘ্রাণ! কিন্তু বিপত্তি বাধল যখন ফুলের ছবি তুলতে চাইলাম। প্রায় ২০ ফুট উঁচু গাছে ডালের আগায় ফুলের উদয়। এ গাছ আরও লম্বা হতে পারে, ৭০-৮০ ফুট লম্বা গাছও এ দেশের পাহাড়ি অরণ্যে আছে। একটি বয়স্ক গাছ কয়েক বছর আগে দেখেছিলাম রংপুরের পায়রাবন্দে, বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রে।

কার্জন হলের সামনের গাছ দুটির প্রায় সব ডালের আগায় ফুল ফুটে রয়েছে। একটি ডালকে যখন বাগে আনা গেল, তখন পূর্ণ প্রস্ফুটিত রূপ দেখে বিমোহিত হয়ে গেলাম। গত সপ্তাহে জাতীয় সংসদ ভবনের পাশে চন্দ্রিমা উদ্যানেও দেখেছিলাম কয়েকটি ম্যাগনোলিয়া গাছ। কিন্তু সেসব গাছে ফোটা ফুলগুলোর চেয়ে এ দুটি গাছের ফুল অনেক বড়। প্রাণবন্ত, সতেজ ও লাবণ্যময়ী। ফুলের ছবি তোলার পর শুরু করলাম সেই লাবণ্যময়ী উদয়পদ্মের অবয়ব পাঠ।

পাপড়ির বিস্তার পাওয়া গেল প্রায় ৭ ইঞ্চি। ১০টি পাপড়ি ২টি সারিতে সাজানো। প্রথম বা ওপরের সারির পাপড়িগুলো ছোট, পরের সারিরগুলো বড়। জ্বাল দেয়া দুধের মতো পাপড়ির রং। কোনো কোনোটার রং আবার বরফসাদা। এ জন্য এ ফুলের আরেক নাম হিমচাঁপা, হিন্দিতেও এর নাম হিমচাঁপা।

ম্যাগনোলিয়া ছোট বৃক্ষ প্রকৃতির। বহুবর্ষজীবী ও চিরসবুজ। পাতা দেখতে কিছুটা কাঁঠালপাতার মতো। তবে কাঁঠালপাতার চেয়ে ম্যাগনোলিয়া গাছের পাতা লম্বাটে ও ছোট। পাতার ওপরের পিঠ চকচকে কালচে সবুজ বা তামাটে, নিচের পিঠ মখমলের মতো ও বাদামি। পাতার আকৃতি লম্বাটে উপবৃত্তাকার ও পত্রফলকের আগা কিছুটা ভোঁতা, ফলকের কিনারা সামান্য নিচের দিকে বাঁকানো। পাতাগুলো ডালের ওপর ঊর্ধ্বমুখীভাবে সাজানো থাকে। ফুল ফোটা শুরু হয় বসন্তের শেষ থেকে, ফুটতে থাকে বর্ষাকাল পর্যন্ত। তবে গ্রীষ্মকালে বেশি ফুল ফোটে।

ম্যাগনোলিয়া ফুলের কেন্দ্রস্থলে থাকে একটি প্যাগোডা বা শম্বুকের মতো জননাঙ্গ, কি চমৎকার তার গড়ন! কদিন পর ওই অঙ্গটাই বড় হতে হতে ফল হয়। আকার বদলায়। কিন্তু তার আকৃতি বদলায় না। পাপড়িঝরা সেসব ফল থাকে আকাশের দিকে মুখ করে তাকিয়ে। একপলকে ফুলকে দেখলে ওকে শ্বেতপদ্মের মতোই মনে হবে। ফুলগুলোও আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। পাপড়িগুলো সম্পূর্ণ খোলে না।

উদয়পদ্মের উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম ম্যাগনোলিয়া গ্রান্ডিফ্লোরা, গোত্র ম্যাগনোলিয়েসী। ইংরেজি নাম লরেল ম্যাগনোলিয়া। উদয়পদ্মের আদি নিবাস যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা ও টেক্সাসে। এশিয়ার প্রায় সব দেশেই ম্যাগনোলিয়া গাছ আছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যের মতো পৃথিবীর আর কোনো দেশে একে এত বেশি সহজে চোখে পড়ে না। সেখানে প্রায় প্রতিটি বাড়ি ও রাস্তার ধারে ম্যাগনোলিয়া গাছ লাগানো আছে। আর থাকবেই বা না কেন? ম্যাগনোলিয়া যে সে অঙ্গরাজ্যের জাতীয় ফুল। বাংলাদেশের বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন-২০১২-এর তফসিল ৪ অনুসারে ম্যাগনোলিয়া এ দেশে সংরক্ষিত উদ্ভিদ, যেখানে যেটা আছে সে গাছ কাটা বারণ। কার্জন হলের সামনে ছাড়াও এ গাছ আছে মিরপুরে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে, বলধা গার্ডেনের সাইকি অংশে, ময়মনসিংহে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ উদ্যানে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯২৬ সালে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় হোটেল ইম্পিরিয়ালে বসে তার ‘বনবাণী’র ভূমিকা লিখেছিলেন। সেখানেই তাকে আন্দোলিত করেছিল গাছগাছালির পরমসুন্দরতা। তিনি লিখেছিলেন, ‘পরমসুন্দরের মুক্তরূপে প্রকাশের মধ্যেই পরিত্রাণ, আনন্দময় সুগভীর বৈরাগ্যই হচ্ছে সেই সুন্দরের চরম দান।’ উদয়পদ্ম ফুলগুলোর সান্নিধ্যে সকালটা কাটিয়ে মনে হলো, আমি সেই পরমসুন্দরের দেখা পেয়েছি, আহ্বানও শুনেছি এক বৈরাগ্যের। পরমসুন্দর- সে তো ম্যাগনোলিয়ার মাত্র এক বেলার জন্য সুন্দরী যুবতী থাকার অহংকার, বৈরাগ্য- সে হলো সেই পরমসুন্দরের খসে পড়া, শিথিল কটিবাসের মতো একটার পর একটা খসে পড়ে পাপড়িগুলো গাছের তলায়।

তা দেখেই হয়তো কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন: ‘ম্যাগনোলিয়ার শিথিল পাপড়ি থরে থরে/ পড়ে ঘাসে।’ উদ্যানে উদ্যানে ম্যাগনোলিয়া গাছ চোখে পড়লেও তা খুব সুলভ নয়, আরও বেশি এ গাছ লাগানো যায়। গ্রীষ্মকালে এ গাছের আধা কাষ্ঠল শাখা কেটে কলম করে চারা তৈরি করা যায়।