ঢাকা ২২ আষাঢ় ১৪৩৩, সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
ইয়ামাল জানালেন তার কঠিন প্রতিপক্ষের নাম খাগড়াছড়ির পানছড়িতে তিনজনকে গুলি করে হত্যা চিটাগাং চেম্বার সভাপতির সাথে বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিনিধিদলের মতবিনিময় শ্রীলঙ্কায় কারাগারে সংঘর্ষে নিহত ২৫, আহত শতাধিক ইনডোর প্লেগ্রাউন্ডগুলোর কাছে একজন মায়ের অনুরোধ বাঁশখালীতে সড়ক দুর্ঘটনায় ১ যুবকের মৃত্যু মৃত্যুর পর মরদেহ এফডিসিতে না নেওয়ার অনুরোধ রোজিনার পূর্বপ্রস্তুতি ও সতর্কতা জরুরি শিক্ষার উন্নয়নে সর্বোচ্চ কাজ করব: এমপি হাবীবা নওগাঁয় ছেলের হাতে বাবা খুন লংগদুতে সড়ক দুর্ঘটনায় শিশুর মৃত্যু, আহত ৭ স্বস্তি ফেরাতে পদক্ষেপ নিন মিরসরাইয়ে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আনসার কর্মকর্তা নিহত জীবননগরে বিএনপি নেতার ফোনালাপ ভাইরাল হলিউড স্টুডিওগুলোর এআই ব্যবহারের তথ্য জানতে চায় মিডজার্নি প্রশ্ন ফাঁসের গুজব ছড়ালে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে: ডিসি ফরিদা লক্ষ্মীপুরে মামলা প্রত্যাহার না করায় বাদীকে হত্যাচেষ্টা কক্সবাজারে পাহাড়ধসে ১ জনের মৃত্যু কমলো স্বর্ণের দাম, ভরি কত এখন? শহরে চাপ কমাতে ৪ উপশহর গড়ার প্রস্তাব সিডিএ চেয়ারম্যানের রাঙামাটিতে অবৈধ অটোরিকশা বন্ধে ৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম ১১ অঞ্চলে ঝড়ের সতর্কতা, নদীবন্দরে ২ নম্বর সতর্ক সংকেত সমন্বয় ও নিঃসরণ অধ্যায়ের ৮টি বহুনির্বাচনি প্রশ্ন ও উত্তর, ৩য় পর্ব, অষ্টম শ্রেণির বিজ্ঞান ডিসেম্বরে শিক্ষার্থীদের নতুন বই দিতে চায় সরকার: শিক্ষামন্ত্রী পল্লী উন্নয়ন বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান অ্যাজেন্ডা: স্থানীয় সরকার মন্ত্রী বেরোবি প্রেসক্লাবে আলোচনা সভা ও ফল উৎসব ব্রাজিলের পরাজয়ে অসুস্থ নারীভক্তকে হাসপাতালে নিলেন আর্জেন্টিনা সমর্থক ২৭তম বিসিএসে আরও ৭৭ জনকে নিয়োগ, প্রজ্ঞাপন জারি হিলিতে জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবস উপলক্ষে র‌্যালি তবে কি রোনালদোকে ভয় পাচ্ছেন স্পেন কোচ?

পথে পথে লিচুর পসরা

প্রকাশ: ২৮ মে ২০২৪, ১২:৪৬ পিএম
আপডেট: ১৪ জুলাই ২০২৪, ০৩:৩৯ পিএম
পথে পথে লিচুর পসরা
মৌসুমি ফল লিচু এসেছে রাজধানীর বাজারগুলোতে। বায়তুল মোকাররম এলাকা থেকে তোলা। ছবি : খবরের কাগজ

গ্রীষ্মকাল মানেই হরেক রকম সুস্বাদু ও রসালো ফলের সমাহার। তীব্র তাপের কারণে এই ঋতু অনেকের পছন্দ না হলেও গ্রীষ্মকালীন ফল পছন্দ করেন না, এ রকম মানুষের সংখ্যা হাতে গুনে খুঁজে বের করা যাবে। জ্যৈষ্ঠ মাসের শুরুর দিকেই বাজারে উঠতে শুরু করেছে স্বাদে-গুণে ভরা রসালো ফল লিচু। ক্ষণকালীন এ ফল পছন্দের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে বাচ্চা থেকে বুড়ো সবার।

মানুষের চাহিদাকে পুঁজি করে মৌসুমি ব্যবসায়ীরাও লিচু সংগ্রহ ও বিক্রির ব্যাপারে তৎপর হয়ে ওঠেন।  ফলের দোকান তো বটেই, ভ্যানে ও ঝুড়িভর্তি লিচু জনবহুল জায়গায় বিক্রি করেন তারা। বাজারে লিচু ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই অনেকে হামলে পড়েন মৌসুমি এই ফলের ওপর। ঝুড়িভর্তি লাল টসটসে ফলটি নজরে পড়লেই কেনার জন্য ভিড় জমে যায়।    

বাজারে বিভিন্ন জাতের লিচুর দেখা পাওয়া যায়। এর মধ্যে বছর কদমী, মোজাফফরপুরী, চায়না-৩ বোম্বাই, এলাচি, পাতি ও মাদ্রাজি জাতের লিচুর চাহিদা রয়েছে শীর্ষে। গতকাল  সোমবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, রাজশাহী আর দিনাজপুরের কিছু লিচু উঠতে শুরু করেছে। পিস হিসেবে বিক্রি হয় এসব।  জাতভেদে বিভিন্ন লিচু ‘শ’ হিসেবে বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন দামে। স্থানভেদে রাজশাহীর লিচু প্রতি ১০০ পিস বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা দরে। ক্রেতারা যার যার চাহিদামতো কিনে নিচ্ছেন। 

শুধু স্বাদের দিক থেকেই নয়, স্বাস্থ্যগুণেও ভরপুর এই ফল। আমেরিকান জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশনের তথ্য, লিচু ভিটামিন-সির বড় একটি উৎস। ভিটামিন-সি স্ট্রোকের ঝুঁকি ৪২ শতাংশ কমিয়ে দেয়। লিচু অ্যান্টিঅক্সিডেন্টেরও একটি ভালো উৎস। এতে অন্যান্য ফলের তুলনায় পলিফেনলের মাত্রা বেশি থাকে। এ ছাড়া লিচু এপিকেটেচিনের একটি ভাণ্ডার, যা হার্টের স্বাস্থ্যের উন্নতি করতে পারে এবং ক্যানসার ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে পারে।  এই ফলে আছে রুটিন উপাদান। ফুড কেমিস্ট্রি জার্নালে প্রকাশিত এক সমীক্ষা অনুসারে, রুটিন মানবদেহকে ক্যানসার, ডায়াবেটিস এবং অন্যান্য কার্ডিওভাসকুলার সমস্যাগুলোর মতো দীর্ঘস্থায়ী রোগ থেকে বাঁচাতে সাহায্য করতে পারে।

সোমবার (২৭ মে) বাংলামোটরের ইস্কাটন রোডের ফুটপাতে ভ্যানে করে লিচু বিক্রি করছিলেন মো. ইদ্রিস আলী। তিনি খবরের কাগজকে জানান, বাজারে মৌসুমের নতুন লিচু ওঠা শুরু হয়েছে। তার জন্য মানুষের আগ্রহ অনেক বেশি। তিনি এক হাজার পিস  নিয়ে এসেছিলেন সকাল বেলা। দুপুরের মধ্যেই ৪০০ পিস  বিক্রি করেছেন। 

ফার্মগেটে দিনাজপুরের লিচু বিক্রি করছিলেন নাসির উদ্দীন। তিনি জানান, এসব লিচু আড়ত থেকে পাইকারি দরে সংগ্রহ করেন তারা। পাইকাররা বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে বাগান হিসাবে লিচু কিনে থাকেন। ঢাকায় পাইকারি আড়ত কারওয়ান বাজারে। সেখান থেকে সর্বনিম্ন ৫০০ লিচু কেনা যায়। পাইকারিতে প্রতি ১০০ পিস লিচু ৩৫০ টাকা পড়ে। তার সঙ্গে পরিবহন ভাড়া যুক্ত হয়। সব খরচ যোগ করে এসব লিচু খুচরা ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা দরে বিক্রি করেন ক্রেতাদের কাছে। 

নাসিরউদ্দীন জানান, এ বছর আবহাওয়া লিচু চাষের উপযোগী হওয়ায় ভালো ফলন হয়েছে। সাধারণত জ্যৈষ্ঠের শুরু থেকে আষাঢ়ের মাঝামাঝি সময়ে বাজারে লিচুর প্রাচুর্য থাকে। চাহিদার বড় জোগান আসে সাধারণত রাজশাহী, দিনাজপুর, পাবনা, রাজবাড়ী, ঈশ্বরদী, আটঘরিয়া ও গাজীপুরের কাপাসিয়া থেকে। 

হুমায়রা বেগম নামের এক ক্রেতা খবরের কাগজকে জানালেন, তাদের বাসার প্রত্যেকেই লিচু খুব পছন্দ করেন। বিশেষ করে বাচ্চারা এই মৌসুমের জন্য মুখিয়ে থাকে। লিচুর দিনে ঘরভর্তি করে কিনে রাখা হয়। লিচু বাজারে খুব কম সময় পাওয়া যায়। তাই মন ভরে খেতে না পারলে যেন তৃপ্তি মেটে না।

আরেকজন ক্রেতা রাজীব ভূঁইয়া জানান, মৌসুমি এই ফলের দাম আরও কম রাখা উচিত।  তিনি ঢাকা শহরে মেসে থাকেন। লিচু তার খুব পছন্দের একটা ফল হলেও দাম চড়া হওয়ায় বেশি করে কিনতে পারেন না। তবুও পছন্দের ফল বলে কথা, অল্প করে নিলেও মৌসুমের প্রথমে বাজারে উঠেছে, তাই কিনছেন। 

আরেক বিক্রেতা সবুর বলেন, প্রথম দিকে বাজারে উঠতে শুরু করেছে বলে লিচুর দাম এখন বাড়তি। কিছুদিন গেলে বাজারে যখন একটু বেশি পরিমাণে পাওয়া যাবে, তখন দাম আরেকটু হয়তো কমবে। 

কালো লেডিবার্ড বিটল

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:২৪ এএম
আপডেট: ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩২ এএম
কালো লেডিবার্ড বিটল
চট্টগ্রামের চকবাজার এলাকায় সম্প্রতি দেখা কালো লেডি বিটল। ছবি: লেখক

২০১০ সালের বর্ষাকাল, মাঠে মাঠে আমন ধানের চারাগুলো কুশি ছেড়ে সোমত্ত হয়ে উঠছে। খুলনার দৌলতপুর হর্টিকালচার সেন্টারে আমার দিনের পর দিন কাটে সেসব ধানখেতের পোকা দেখতে দেখতে। রোজই এক-দুবার চক্কর দিই। হঠাৎ একটা ছোট্ট কালো রঙের চকচকে বিটল চোখে পড়ল।

হাওয়ায় দোলা সবুজ পাতার ওপর তাকে বেশ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কুচকুচে কালো ডানা, আলো পড়ে ঠিকরে উঠছে, প্রায় গোলাকার সেই পোকাটি ছিল লেডিবার্ড বিটল, কালো রং, তাই তাকে বলা হয় কালো লেডিবার্ড বিটল। লেডিবার্ড বিটলদের রং আসলে লাল, কমলা বা হলুদ হয়। কিন্তু কালো কেন? আগ্রহের বশে সেখানে বসে একটা ছোটখাটো পর্যবেক্ষণের কাজেও নেমে পড়লাম যা আসলে গবেষকদের কাজ। কিন্তু আমার কৌতূহল ছিল, কত রকমের লেডি বিটল আসলে এ দেশে আছে, তা খুঁজে দেখা। যখনই কোনো এক প্রজাতির লেডিবার্ড বিটল দেখতাম তখনই তার ছবি তুলতাম, রাতে রুমে বসে তার স্কেচ করতাম। যখন জানলাম যে, পৃথিবীতে প্রায় ৬ হাজার প্রজাতির লেডিবার্ড বিটল আছে তখন সে কাজের উৎসাহে ভাটা পড়ল। বাংলাদেশে কত প্রজাতির আছে, তা জানতে মনে হয় আমার জীবন পার হয়ে যাবে। সাকল্যে মাত্র ১২ প্রজাতির লেডিবার্ড বিটলের ছবি তুলে ও এঁকে সে যাত্রা ক্ষান্ত দিয়েছিলাম। এ নিয়ে আর কখনো কাজে নামিনি।

গত ২০ জুন চট্টগ্রামের ষোলশহর এলাকায় চকবাজার থেকে কেবি আমান আলী রোড ধরে নুর বেগম জামে মসজিদ পেরিয়ে হজরত ভোলা শাহ (র.)-এর মাজার প্রাঙ্গণের ভেতরে ঢুকে পড়লাম। বনজঙ্গল আর ঝোপঝাড়ের মধ্যে কয়েকটি তিতবেগুন ও ফোস্কাবেগুনের গাছ চোখে পড়ল। সেসব গাছের পাতাতেই আবার এত বছর পর দেখতে পেলাম সেই কালো লেডিবার্ড বিটলকে। অন্য লেডিবার্ড বিটলের তুলনায় এদের খুব কমই দেখা যায়। এসব পোকা উত্তর আমেরিকায় বলে লেডিবাগ, যুক্তরাজ্যে বলে লেডিবার্ড। কীটতত্ত্ববিদদের কাছে এরা লেডিবার্ড বিটল বা লেডি বিটল নামে পরিচিত। যুক্তরাজ্যে এ পোকাকে লেডি বিটল বলার কারণ হলো, সেখানকার সবচেয়ে সাধারণ একটি লেডি বিটলের চেহারার সঙ্গে সে দেশের একটি ছবিতে আঁকা একজন প্রাচীন রমণীর মিল ছিল। ছবিতে ছিল, সেই প্রাচীন রমণী একটা লাল আলখাল্লা পরে রয়েছেন যার ওপর রয়েছে কালো ফোঁটা। কক্সিনেলা সেপ্টেমপাংটাটা প্রজাতির লেডি বিটলও লাল, আর তার ডানায় রয়েছে সাতটি কালো ফোঁটা। অঙ্কিত সে ছবির প্রাচীন রমণীর পোশাকে ছিল ৭টি ফোঁটা, যা ছিল সাত রকমের আনন্দ ও দুঃখের প্রতীক। সে চিত্রকর্মের সঙ্গে এ প্রজাতির পোকাটির এরূপ সাযুজ্যই তাকে লেডি বিটল নামে পরিচিত করে তোলে। এ প্রজাতির লেডি বিটল এ দেশে সচরাচর দেখা যায়। 

কালো লেডি বিটলের সাধারণ ইংরেজি নাম মালয়েশিয়ান লেডিবার্ড বিটল, প্রজাতিগত নাম Chilocorus nigrita  ও গোত্র কক্সিনেলিডি। এ জন্য এ গোত্রের পোকাদের অনেকে কক্সিনেলিডি বিটলও বলে। জনৈক ড্যানিশ কীটতত্ত্ববিদ জোহান ক্রিস্টিয়ান ফেব্রিকাস ১৭৯৮ সালে প্রথম এ পোকার প্রজাতিগত নাম ও বিবরণ দেন। তখন এর প্রজাতিগত নাম ছিল Coccinella nigrita। 

কালো লেডি বিটল গম্বুজের মতো গোলাকার বা ডিম্বাকার দেহের একটি ক্ষুদ্র পোকা। লেডি বিটলদের আকার মাত্র দশমিক ৮ থেকে ১৮ মিলিমিটার। তবে এর আকার বেশ ছোট, দেহের দৈর্ঘ্য মাত্র ৩.২ থেকে ৪ মিলিমিটার। চকচকে কালো শক্ত সামনের ডানাজোড়া পুরো দেহকে ঢেকে রাখে, এর তলেই থাকে পাতলা ঝিল্লির মতো দুটি পিছনের ডানা, ওড়ার সময় তা বের হয়। এরা দিনের বেলায় বিচরণ করে ও ওড়ে। প্রয়োজনে এরা ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটার বেগে উড়তে পারে। খাদ্য বা প্রজননের জন্য কোনো কোনো লেডি বিটলের ১২০ কিলোমিটার পর্যন্ত যাওয়ার রেকর্ড আছে। এমনকি এরা উড়তে উড়তে ১ হাজার ১০০ মিটার উঁচু পর্যন্ত যেতে পারে। এর ডিম মাকু আকৃতির, উজ্জ্বল হলুদ। এককভাবে বা গ্রুপে ২০ থেকে ৫০টি ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়, বাচ্চা অবস্থায় থাকে ১২-১৮ দিন, এরপর পুত্তলি দশায় কাটায় ৫-৯ দিন। প্রাপ্তবয়স্ক পোকা বাঁচে ৪-৮ সপ্তাহ। এরা বছরে ৮-১০ বার বংশবৃদ্ধি করতে পারে।

কালো লেডি বিটল একটি পরভোজী উপকারী পোকা। এরা গাছের বিভিন্ন ক্ষতিকর পোকা যেমন লাল খোস পোকা বা স্কেল ইনসেক্ট, সাদা মাছি, সাইলিড, জাব পোকা ইত্যাদি শিকার করে খায়। বাচ্চা থেকে শুরু করে একটি কালো লেডি বিটল তার সম্পূর্ণ বৃদ্ধি পর্যায়ে গড়ে ৫০০টির মতো ক্ষতিকর পোকা খেতে পারে। তাই গবেষক ও বালাই ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা ফসলের এসব বালাই নিয়ন্ত্রণে জৈবিক নিয়ন্ত্রক এজেন্ট বা জীব হিসেবে এর ভালো সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন। ভারত, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানেই এ পোকার উৎপত্তি। তাই এ পোকাটির ব্যবহারিক গুরুত্ব ও বংশবৃদ্ধি নিয়ে আরও বিস্তারিত গবেষণার সুযোগ আছে। বিশেষ করে গ্রিনহাউসে জন্মানো ফসলের কীট দমনে ইতোমধ্যে প্রতি ৫০ বর্গমিটারে মাত্র ৩০টি এই পোকা ছেড়ে সুফল পাওয়া গেছে।

উদাস করা বাবলা ফুল

প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬, ০৮:৩৫ এএম
উদাস করা বাবলা ফুল
বাগেরহাটের মোংলার কাছে পথের ধারে ফোটা বাবলা ফুল। ছবি: লেখক

‘বাবলা ফুলে নাক-ছাবি তার,
গায় শাড়ি নীল অপরাজিতার,
চলেছি সেই অজানিতার
উদাস পরশ পেতে।’

কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘অ-কেজোর গান’-এর পঙ্‌ক্তিগুলো শুধু একটি ফুলের সৌন্দর্যের বর্ণনা নয়, বরং বাংলার গ্রামীণ প্রকৃতির প্রতি কবির গভীর মুগ্ধতার প্রকাশ। সেই একই মুগ্ধতা যেন আজও পথিকের মনে দোলা দেয়। খুলনা থেকে মোংলার পথে যেতে যেতে রাস্তার ধারে হলুদ বাবলা ফুলে সেজে থাকা গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে মনে হলো কবির সেই ‘উদাস পরশ’ আজও বাতাসে ভেসে বেড়ায়। নজরুলের কল্পনার সেই বাবলা ফুল যেন বাস্তবের প্রকৃতিতেই আমাকে থামতে বাধ্য করল। দৃশ্যটা যেন কোনো জলরঙে আঁকা ছবি। রাস্তার ধারে বাবলা গাছগুলোর ডালপালায় যেন হলুদ হীরা মানিক জ্বলছে। প্রবল বাতাসে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে সে রূপের আধার। তেঁতুল পাতার মতো চিরল চিরল পাতার ফাঁকে থোকায় থোকায় ফোটা ছোট্ট ছোট্ট কদমের মতো গোল গোল তুলির মতো ফুল, বাতাসে দুলে যেন আমন্ত্রণ জানাচ্ছে পথিক ও মৌমাছিদের। গাছের ব্যাকগ্রাউন্ডে মাছের ঘের, দূরে গ্রামীণ বনভূমির কালচে-সবুজ প্রান্তরেখা। সে রেখা থেকে উঠে গেলে মেঘমাখা পাখিওড়া নীলাভ আকাশ।

মাছের ঘের পাহারা দেওয়ার জন্য সেখানে থাকা একটা ছোট্ট মাচান ঘর, জলে তার ছায়া পড়েছে। এ দৃশ্য যেকোনো শিল্পীর কাছেই মনোমুগ্ধকর, ইজেল আর রঙতুলি নিয়ে বসে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা হতেই পারে। মন ভরে সে দৃশ্য ও বাবলা ফুলের ছবি তুললাম। কিছু ছবি বাতাসের ধাক্কায় ডি-ফোকাসড হয়ে গেল। কিছুই করার নেই। সে কারণেই তার মধ্যেও যেন আমি এক প্রকৃতির সুমধুর সুরধ্বনি শুনতে পেলাম–বাবলা পাতায় তানপুরার তানের মতো বাতাসের শন শন শোঁ শোঁ সেই উচ্চাঙ্গ সংগীতের সুর। প্রকৃতির রঙ্গমঞ্চে শিল্পী, আলোকচিত্রী, সংগীতজ্ঞ থাকবে আর কবি থাকবে না, তা কী করে হয়? কবি কাজী নজরুল ইসলামও যেন বাবলা ফুলের সে আহ্বান শুনতে পেয়েছিলেন, উদাস হয়েছিলেন সে আমন্ত্রণে। বাবলা ফুলের সে সৌন্দর্যে হয়তো কোনো গ্রাম্য তরুণীও সেদিন মুগ্ধ হয়ে আবদার করেছিলেন কবির কাছে–‘কুস্মী রঙ শাড়ি, চুড়ি বেলোয়ারি/ কিনে দে হাট থেকে, এনে দে মাঠ থেকে/ বাবলা ফুল, আমের মুকুল, নৈলে রাঁধব না, বাঁধব না চুল\’ বাবলা ফুলকে না পেলে তার কেমন অভিমান হতে পারে তা অনুমান করা যায় নজরুলের এ গানে।

গ্রামের বনজঙ্গলে, রাস্তার ধারে, বাঁধের উপরে গ্রীষ্মের শেষ থেকে শরৎ পর্যন্তই বাবলা ফুলের এ শোভা দেখা যায়। শহরে এ শোভা বিরল। বাবলা ফুলের শুধু কি শোভাই আছে? প্রাচীন শাস্ত্র অথর্ববেদে বাবলার নাম বর্ব্বুর। সে গাছটি সম্পর্কে একটি সুক্তে বলা হয়েছে–‘বর্ব্বুর পৃথিবীর রস শোষণ করেই জন্মগ্রহণ করছে। অর্থাৎ মরুস্থলেও সে জন্মগ্রহণ করে। একে জলসেচ দিতে হয় না। এর রস পৃথিবীর জঠরাগ্নিকেও শোষণ করে। অত্যগ্নি তাপ ও বহুঋতুর আবির্ভাবেও স্তব্ধতা প্রাপ্ত হয়ে রস পান করে।’ জলসেচ না, এর নিজের রসই তাকে বাঁচিয়ে রাখে। খরা, শৈত্য, উষ্ণতা, লবণাক্ততা, ঝড়-ঝঞ্ঝা, বন্যা–সব প্রতিকূলতাকে জয় করে সে টিকে থাকে। কি বরেন্দ্রভূমি, কি মরুভূমি, কি উপকূলে নদীর পাড়, সব জায়গাতেই বাবলা যেন এক সর্বংসহা বৃক্ষ। 

আবার আত্মরক্ষায়ও বাবলা ওস্তাদ। চারা গাছগুলো যাতে ছাগল-গরু মুড়ে খেতে না পারে, সেজন্য খুব বেশি কাঁটা গজায়। কাঁটাগুলো আলপিনের মতো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বাবলার কাঁটা আলপিনের মতো ব্যবহৃত হতো বলে শোনা যায়। এ গাছের অনেক ঔষধি গুণও আছে। বাবলার পঞ্চাঙ্গ (মূলের ছাল, গাছের ছাল, পাতা, ফুল ও ফল) একসঙ্গে নিয়ে তা আটগুণ পানিতে সিদ্ধ করে গলা পিচের মতো ঘনসার তৈরি করা হয় যা দাঁতের মাড়ি ফোলা, মচকা ব্যথা, প্রবল কাশি, প্রদর ইত্যাদি রোগের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়। কাঠ খুব শক্ত, তাই লাঙল আর গরুর গাড়ির চাকাও তৈরি করা হয় বাবলা কাঠ দিয়ে। এ গাছ যে বন্ধ্যা মাটিতে জন্মে, গাছের গুণে ধীরে ধীরে সে মাটিও উর্বর হয়ে ওঠে।

বাবলা একটি বহুবর্ষজীবী দ্রুত বর্ধনশীল চিরসবুজ প্রকৃতির বৃক্ষ। গাছ ৫ থেকে ২০ মিটার লম্বা হয়। প্রচুর ডালপালা হয় ও তরুণ গাছের ডালপালা তীক্ষ্ণ কাঁটায় ভরা, বয়স্ক গাছের কাণ্ডে কাঁটা থাকে না। বাকল ধূসর ও অমসৃণ, কাঠ শক্ত। চিরুনির দাঁতের মতো পত্রকগুলো পত্রদণ্ডের দুপাশে সাজানো থাকে, ঘনভাবে পাতাগুলো থাকে। বসন্তে নতুন পাতা গজায় ও গ্রীষ্ম থেকে হেমন্ত পর্যন্ত ফুল ফোটে। গোলাকার ছোট্ট বলের মতো পুষ্পমঞ্জরিতে অসংখ্য ফুল ফোটে, রং হলুদ। ফল শিমের মতো, খোসার রং ধূসর-সাদা, রোমশ। ফলের ভেতর বীজ থাকে। বীজ থেকে চারা হয়। বাবলার ইংরেজি নাম থর্ন মাইমোসা ও ইজিপশিয়ান একাশিয়া। ইংরেজিতে একে কেউ কেউ বাবুলও বলেন। উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Vachellia nilotica (পূর্ব নাম Acacia arabica, Acacia nilotica) ও গোত্র ফ্যাবেসি।

লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ 

সুচালো মাথা ব্যাঙের কথা

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৯:২১ এএম
আপডেট: ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৯:৪০ এএম
সুচালো মাথা ব্যাঙের কথা
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের কাঁঠালকান্দি এলাকায় দেখা সুচালো মাথা ব্যাঙ –ছবি লেখক

দিনটি ছিল ২০১৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বর। সকালের দিকে আমিসহ চারজনের একটি দল বিরল ও দুর্লভ পাখি ও প্রাণীর সন্ধানে ঢাকা থেকে বাসে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার উদ্দেশে রওনা দিই। দুপুরের দিকে আমরা শ্রীমঙ্গল বাসস্টেশনে পৌঁছায়। এরপর সিএনজিচালিত অটোরিকশায় আদমপুর বাজারে এসে নামলাম। সেখানে সবজি ও ডিমের তরকারি দিয়ে পেট ভরে ধোঁয়া ওঠা ভাত খেলাম। গ্রামীণ বাজারে এর চেয়ে ভালো খাবার পাওয়া দুষ্কর। খাওয়া শেষে আরেকটি অটোরিকশায় করে কমলগঞ্জের রাজকান্দি সংরক্ষিত বনের উদ্দেশে রওনা দিলাম। ওই বনের কাউয়ারগলা এলাকায় এসে নামলাম। কাউয়ারগলার টিলার ওপর বন বিভাগের ছোট্ট একটি রেস্ট হাউসে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। তবে এখানে রান্নার কোনো ব্যবস্থা নেই, বাবুর্চিও নেই। তাই খাবার-দাবারের ব্যবস্থা হয়েছে স্থানীয় গাইড কাইয়ুমের বাসায়। 

খানিকটা বিশ্রাম নিয়ে বিকেলটা রেস্ট হাউসের পাশের গ্রামে কাটালাম। স্থানীয়দের সঙ্গে কথাবার্তা বললাম। ওদের সঙ্গে চা-নাশতা খেলাম। কিছু পাখি ও ফড়িংয়ের ছবিও তুললাম। রাতে রেস্ট হাউস থেকে বের হয়ে কাইয়ুমের বাসায় ডিনারের উদ্দেশে যাচ্ছিলাম। এ সময় ধানখেত থেকে বিভিন্ন ধরনের ডাক বা শব্দ ভেসে আসছিল। শব্দের উৎসের দিকে টর্চের আলো ফেলতেই চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল! নানা প্রজাতির ব্যাঙের যেন মেলা বসেছে! অন্তত চার প্রজাতির ব্যাঙের ছবি তুললাম।

৮ সেপ্টেম্বরের পুরোটা দিন আদমপুর বনের বিভিন্ন অংশে ঘুরে ২৫ প্রজাতির পাখি-প্রাণী-প্রজাপতি-কীটপতঙ্গের ছবি তুললাম। তৃতীয় অর্থাৎ শেষ দিন খুব সকালে রাজকান্দির পাশের কাঁঠালকান্দির উদ্দেশে রওনা হলাম। সকাল পৌনে ৭টা থেকে বেলা সাড়ে ৩টা পর্যন্ত রাজকান্দি ও কাঁঠালকান্দির অন্তত ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে হেঁটে ৩০ প্রজাতির পাখি-প্রাণীর ছবি তুললাম। দুপুর ১টা ৩২ মিনিটে কাঁঠালকান্দির একটি ছড়ায় হঠাৎ সরু মাথার ছিপছিপে এক ব্যাঙের দেখা পেলাম। মিশ্র চিরসবুজ বনের এই ব্যাঙটিকে বহুদিন ধরে খুঁজছিলাম। লাউয়াছড়া, কাপ্তাই, সাতছড়ি বা রেমা-কালেঙ্গার বনে অনেক খুঁজেও তাকে পাচ্ছিলাম না। তবে কাঁঠালকান্দিতে তার দেখা পেলাম। ক্যামেরায় মাত্র সাতটি ক্লিক করতেই সে একটি গর্তের ভেতর ঢুকে গেল। আমরা তাই সামনের দিকে পা বাড়ালাম। 

কাঁঠালকান্দিতে দেখা এই ব্যাঙটি এ দেশের এক বিরল প্রাণী সুচালো মাথা ব্যাঙ। এটি সরু মাথা ব্যাঙ, আসামের পানা ব্যাঙ বা সোনালি পাহাড়ি ব্যাঙ নামেও পরিচিত। মিশ্র চিরসবুজ পাহাড়ি বনের ব্যাঙটির ইংরেজি নাম Pointed-headed Frog, Pointed-nose Frog, Assam Hills Frog, Boulenger’s Frog বা High Altitude Frog। র‌্যানিডি (Ranidae) গোত্রের ব্যাঙটির বৈজ্ঞানিক নাম Clinotarsus alticola (ক্লিনোটারসাস অ্যালটিকোলা)। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, মায়ানমার ও থাইল্যান্ডে এর দেখা মেলে। 

সরু মাথা ব্যাঙের আকার মাঝারি। দেহের দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ২ থেকে ৫ দশমিক ৬ সেন্টিমিটার। দেহ লম্বাটে ও ছিপছিপে। মাথা লম্বাটে ও নাক চোখা। চামড়া মোটামুটি মসৃণ। দেহের ওপরের রং হলদে বা সোনালি হলুদ, প্রায়ই তাতে কিছু গাঢ় দাগ থাকে। দেহতলের রং সাদাটে থেকে গাঢ় বাদামি। পা লম্বা ও ছিপছিপে। পায়ের আঙুল পুরোপুরি পাতার সঙ্গে যুক্ত। 

এরা মূলত দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল (সিলেট বিভাগ) ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের (চট্টগ্রাম বিভাগ) বাসিন্দা। পাহাড়ি জলাধারের পাশে বা পাহাড়ের ঢালে মাটিতে বাস করে। নিশাচর এ প্রাণীটি সচরাচর দিনের বেলা পাথরের নিচে বা গাছের গুঁড়ির ভেতর লুকিয়ে থাকে। সচরাচর একাকী দেখা যায়। কীটপতঙ্গ এদের প্রধান খাদ্য। তৃণলতা বা ঝোপের ওপর বসে থাকতে দেখা যায়।

সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর এদের প্রজননকাল। স্ত্রী ব্যাঙ আবদ্ধ পানিতে ডিম ছাড়ে। ডিম ফুটে লেজযুক্ত ব্যাঙাচি বের হতে এক থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগে। এ সময় এরা মাছের মতো ফুলকার সাহায্যে শ্বাসকার্য চালায়। প্রায় ১৪ সপ্তাহে রূপান্তরের মাধ্যমে সামনের ও পেছনের পা গজায় এবং ফুসফুস তৈরি হয়। একসময় ব্যাঙাচির লেজ খসে পড়ে এবং সে পূর্ণাঙ্গ ব্যাঙে পরিণত হয়। এরা তিন থেকে ছয় বছর পর্যন্ত বাঁচে। 

লেখক: পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

নকশাদার উল্কি গান্ধিপোকা

প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২৬, ০৯:১১ এএম
আপডেট: ০২ জুলাই ২০২৬, ০৯:১৫ এএম
নকশাদার উল্কি গান্ধিপোকা
চট্টগ্রামের চকবাজার এলাকায় সম্প্রতি দেখা উল্কি গান্ধিপোকা। ছবি: লেখক

চট্টগ্রাম শহরে এসে খানিকটা খোলা জায়গায় এক ঝোপঝাড়ের ভেতর একটি নকশাদার বা নকশা করা পোকার দেখা পাব, তা ভাবিনি। এ বছরের ৩ আষাঢ় সকালবেলা হাঁটতে গিয়ে চকবাজার এলাকায় হজরত ভোলা শাহ (র.) মাজার প্রাঙ্গণের ছোট পুকুরটার পাড়ে বুনোবেগুন কাকমাছি গাছের পাতায় পোকাটি দেখলাম।

পোকাটির ডানার রং ফ্যাকাশে লাল, এর মধ্যে কালো নকশাদার দাগ আছে। দাগগুলো দেখতে জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজি স্টার ওয়ার্সের ভিলেন ডার্থ মৌলের মুখের উল্কির মতো। সে কারণেই এ পোকার ইংরেজি নাম রাখা হয়েছে ডার্থ মৌল বাগ। দুই বঙ্গে এর কোনো বাংলা নাম খুঁজে পেলাম না। তাই ইংরেজি নামের সঙ্গে মিল বা তাৎপর্য বজায় রেখে এর বাংলা নামকরণ করা যেতে পারে ‘উল্কি গান্ধি’। 

পোকাটি প্রকৃত গান্ধি বা বাগজাতীয় পোকা, যারা বীজ থেকে রস চুষে খায়। এ জন্য কোনো কোনো দেশে এটি বীজের গান্ধিপোকা নামেও পরিচিত। হেমিপ্টেরা বর্গের এ পোকাটির প্রজাতিগত নাম Spilostethus hospes ও গোত্র লাইগেইডি। এ পোকা মূলত এশিয়া, ওশেনিয়া ও অস্ট্রেলিয়া অঞ্চলে দেখা যায়। অস্ট্রেলিয়ায় কখনো কখনো এ পোকাকে মিল্কউইড বাগ বলা হয়। কেননা সে দেশে এরা মিল্কউইড গাছের বীজ থেকে দুধ চুষে খায়। তবে আমেরিকায় প্রায় একই রকম দেখতে আরেক প্রজাতির মিল্কউইড বাগ দেখা যায়, যাকে বলে বড় মিল্কউইড বাগ। সেটি ভিন্ন প্রজাতির, কিন্তু এ দুটি পোকাই এক গোত্রের ও খাওয়ার ধরন একই।

পোকাটি বেশ ছোট বা মাঝারি আকারের, তবে উজ্জ্বল রঙের কারণে সহজে চোখে পড়ে। এরা ১০ থেকে ১৩ মিলিমিটার লম্বা হয়। সামনের ডানা ও মাথার রং ফ্যাকাশে কমলা বা লাল। এদের পা ছয়টি, শুঁড় দুটি এবং চোখ দুটি কালো। চোখ দুটির ঠিক পেছনেই থাকে প্রায় ত্রিকোণাকৃতির দুটি কালো দাগ। সেই দাগ দুটির প্রান্তদ্বয় গ্রীবায় ত্রিকোণাকৃতি স্কুটেলামের ওপর যুক্ত করেছে আরেকটি ত্রিকোণ দাগ। ত্রিকোণাকৃতি স্কুটেলামের মতো চাকতিই অন্য সব পোকার মধ্য থেকে সব গান্ধিপোকাকে আলাদাভাবে চেনার প্রধান বৈশিষ্ট্য। তার নিচে দুপাশের দুটি ডানায় তেরছা করে আছে দুটি ফ্যাকাশে চওড়া ব্যান্ডের মতো কালো দাগ ও দুটি গাঢ় কালো ফোটা। ডানার পেছন অংশ কালো। পেটের তলে সব খণ্ডেই রয়েছে আড়াআড়ি কালো দাগ বা ডোরা চিহ্ন। চোখ বড় ও গোলাকার। এদের পিঠের লাল-কালো নকশা সম্ভবত শিকারিদের সতর্কবার্তা দেয় যে তারা বিষাক্ত। আর তাদের কাছে এলে শিকারিরা ধরাশায়ী হবে। তবে লিঙ্গ, পরিবেশ ও খাদ্য ইত্যাদি কারণে এদের নকশা ও রঙের কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে।

এর শুঁড় চারটি খণ্ডাংশবিশিষ্ট। এদের মুখগহ্বরে একটি ছিদ্রকারী চঞ্চু থাকে, যা দিয়ে তারা উদ্ভিদের রস চুষে খায়। এরা সাধারণত বর্ধনশীল অপরিপক্ব বীজের দুধরস খেতে বেশি পছন্দ করে। এর ফলে বীজ পুষ্ট হতে পারে না, নষ্ট হয়ে যায়। এদের বিভিন্ন ঘাস, নটেশাক ও ডাঁটার বীজ থেকে এদের রস চুষে খেতে দেখা গেছে। অস্ট্রেলিয়ায় কস্টিক ভাইন, রেড-হেডেড কটন বুশ, সোয়ান প্ল্যান্ট ইত্যাদি গাছ থেকে এদের রস চুষে খাওয়ার কথা জানা গেছে। এরা শুধু বীজ না–পাতা, কাণ্ড, ফল ইত্যাদি থেকেও রস চুষে খায়। এর ফলে সেসব গাছের জীবনীশক্তি ও উৎপাদনশীলতা কমে যায়। 

মজার ব্যাপার হলো, এরা পাতায় বসে মিলনের জন্য সঙ্গীকে ডাকতে এক অদ্ভুত আচরণ করে, যা আমরা দেখতে পাই না। এরা পাতার মাধ্যমে কম্পন তৈরি করে নিজের প্রজাতির অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। মিলনের পর স্ত্রী পোকা পাতার ওপর গুচ্ছাকারে ডিম পাড়ে। তিন থেকে ছয় দিনের মধ্যেই ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়।

বাচ্চাদের দেখতেও বড়দের মতো দেখায়, তবে ওদের ডানা ও জনন অঙ্গ থাকে না। বাচ্চা অবস্থায় ওরা তিন থেকে চার সপ্তাহ কাটায় এবং বড়দের মতোই গাছ, পাতা, ফলের রস খেয়ে বাঁচে। কয়েক দফায় খোলস বদলের পর ছানারা সাবালক হয়। প্রাপ্তবয়স্ক হলে ওদের খোলস শক্ত হয়, পাখা হয়, উড়তে পারে এবং প্রজননের জন্য সঙ্গীকে আহ্বান জানায়। প্রাপ্তবয়স্ক উল্কি গান্ধি ৩০ থেকে ৬০ দিন বাঁচে। তবে এদের জীবনে এক ট্র্যাজেডি আছে। প্রকৃতিতে পুরুষের চেয়ে মেয়ে পোকাই বেশি দেখা যায়। এর কারণ খুঁজতে গিয়ে গবেষকরা বেশ মজার এক তথ্য পেয়েছেন। 

গবেষণায় তারা দেখেছেন, পোকাদের জগতে এই একটিমাত্র জনগোষ্ঠীর পোকার পুরুষদের হত্যা করে একটি এন্ডোসিমবায়োটিক বা অন্তঃমিথোজীবী ব্যাকটেরিয়া। এ কারণেই মেয়ে পোকার সংখ্যা বেড়ে যায়। সাধারণত গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে এদের বেশি দেখা যায়।

বুনো উদ্ভিদ বেগুনি হুড়হুড়ে

প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬, ০৮:২৮ এএম
আপডেট: ০১ জুলাই ২০২৬, ০৮:৩৮ এএম
বুনো উদ্ভিদ বেগুনি হুড়হুড়ে
ছবি: ময়মনসিংহ আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ের পেছনে দেখা বেগুনি হুড়হুড়ে

বেগুনি হুড়হুড়ে আমাদের চারপাশের চেনা প্রকৃতির এক সুপরিচিত কিন্তু অবহেলিত আগাছাজাতীয় উদ্ভিদ। রাস্তার পাশে, পরিত্যক্ত জমিতে কিংবা ফসলের খেতের আইলে ছোট ছোট বেগুনি ফুলের এ গাছটি প্রায়ই আমাদের চোখে পড়ে। অবহেলায় বেড়ে উঠলেও এই গাছের রয়েছে অনেক ঔষধি গুণাগুণ।

বেগুনি হুড়হুড়ের বৈজ্ঞানিক নাম Cleome rutidosperma, এটি Cleomaceae পরিবারের উদ্ভিদ। এটি ইংরেজিতে Blue Capparid, Fringed Spiderflower, Purple Cleome নামে পরিচিত। বেগুনি হুড়হুড়ে ক্রান্তীয় আফ্রিকা অঞ্চলের আদি উদ্ভিদ হলেও এটি বর্তমানে বাংলাদেশ, ভারতসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। বেগুনি হুড়হুড়ের ছবিটি গত ১৩ জুন ময়মনসিংহ আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ের পেছন থেকে তুলেছি। 

বেগুনি হুড়হুড়ে একটি একবর্ষজীবী, খাড়া বা কিছুটা শায়িত ভেষজ উদ্ভিদ। উদ্ভিদটি সাধারণত ১৫ থেকে ৭০ সেন্টিমিটার (প্রায় ১ থেকে ২.৫ ফুট) পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। এর কাণ্ড নরম, সবুজ এবং বহু শাখাবিশিষ্ট। কাণ্ডের গায়ে সূক্ষ্ম লোম এবং ছোট ছোট নরম কাঁটা বা খাঁজ দেখা যায়, যা একে খসখসে ভাব দেয়। এর পাতাগুলো যৌগিক এবং ত্রিপত্রক (Trifoliate)। অর্থাৎ একটি বোঁটায় তিনটি করে ছোট পাতা বা ফলক থাকে। পাতাগুলোর আকৃতি ডিম্বাকার বা ল্যান্সের মতো (Lanceolate)। পাতার কিনারা মসৃণ বা সামান্য খাঁজকাটা হতে পারে এবং পাতার উপরিভাগ ও নিচের পিঠে হালকা লোম থাকে।

এই উদ্ভিদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো এর ফুল। ফুলগুলো আকারে বেশ ছোট এবং এর রং হালকা বেগুনি থেকে নীলচে-বেগুনি হয়ে থাকে। প্রতিটি ফুলে ৪টি পাপড়ি থাকে, যা ওপরের দিকে ডানা মেলার মতো করে সাজানো থাকে।

ফুল থেকে ৪টি দীর্ঘ পুংকেশর বাইরের দিকে বের হয়ে থাকে, যা দেখতে কিছুটা মাকড়সার পায়ের মতো দেখায়। এই কারণেই একে ‘স্পাইডার ফ্লাওয়ার’ বলা হয়। সাধারণত সারা বছরই, বিশেষ করে বর্ষাকালের ভ্যাপসা গরমে এই গাছে ফুল ফুটতে দেখা যায়। ফুল ফোটার পর গাছে সরু, লম্বাটে এবং ক্যাপসুল আকৃতির ফল (Pod) হয়। ফলগুলো দেখতে অনেকটা ছোট সর্ষের ছড়ার মতো। ফল পরিপক্ব হলে ফেটে যায় এবং ভেতর থেকে অসংখ্য ছোট, কালচে-বাদামি বা কালো রঙের বীজ ছিটকে বের হয়। এই বীজের গায়ে সূক্ষ্ম দাগ বা খাঁজ (Ridges) থাকে।

আগাছা হিসেবে গণ্য হলেও লোকজ চিকিৎসায় বেগুনি হুড়হুড়ের ব্যবহার রয়েছে। এর পাতার রস কান পাকা রোগ, কানের ব্যথা এবং শরীরের বিভিন্ন অংশের বাতের ব্যথা উপশমে ব্যবহার করা হয়। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, এই উদ্ভিদে প্রচুর পরিমাণে ফ্ল্যাভোনয়েড ও ফেনোলিকের উপাদান রয়েছে, যা শক্তিশালী অ্যান্টি অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে। এর পাতার নির্যাসে ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধী (Antibacterial) গুণাগুণও পাওয়া গেছে। এ ছাড়া এর পাতার রস জৈব বালাইনাশক হিসেবে কিছু ক্ষতিকারক পোকা দমনে ব্যবহার করা যায়।

প্রকৃতির বুকে কোনো সৃষ্টিই বৃথা নয়–বেগুনি হুড়হুড়ে তার অন্যতম বড় প্রমাণ। পথের পাশে এই অতি সাধারণ গাছটি যেমন তার হালকা বেগুনি ফুলের হাসিতে আমাদের চারপাশকে সুন্দর করে তোলে, তেমনি এর ভেতরের ঔষধি গুণ মানব কল্যাণে ভূমিকা রাখে। একে স্রেফ আগাছা না ভেবে এর গুণাগুণ সম্পর্কে সচেতন হওয়া প্রয়োজন।