ঢাকা ১০ আষাঢ় ১৪৩১, সোমবার, ২৪ জুন ২০২৪

আলব্যাট্রসের রানওয়ে পরিষ্কার করে যে প্রাণী

প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৪, ০৯:৫৪ এএম
আপডেট: ২৮ এপ্রিল ২০২৪, ১০:০৭ এএম
আলব্যাট্রসের রানওয়ে পরিষ্কার করে যে প্রাণী
ডিয়েগো, দৈত্যাকার কচ্ছপ যে প্রায় এককভাবে তার নিজের প্রজাতিকে বাঁচিয়েছিল। ছবি: সংগৃহীত

প্রশান্ত মহাসাগরে বিষুব রেখার দুই পাশ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা দ্বীপপুঞ্জ গালাপাগোস। এই দ্বীপপুঞ্জটি মূলত আগ্নেয় দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত। এই দ্বীপগুলো ইকুয়েডর থেকে ৯৭২ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত। গালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জ ইকুয়েডরের গালাপাগোস প্রদেশের অন্তর্গত এবং দেশটির জাতীয় পার্ক সিস্টেমের অংশ। 

এই দ্বীপপুঞ্জে প্রচুর বিরল প্রজাতির প্রাণী আছে, যা পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যায় না। দ্বীপপুঞ্জটি এর অনন্য জীববৈচিত্র্যের কারণে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

বিবর্তন তত্ত্বের জনক চার্লস ডারউইন এই দ্বীপ ভ্রমণ করেছিলেন। ডারউইনের ভ্রমণই মূলত গালাপাগোসকে বিখ্যাত করেছে। কারণ এখানকার বৈচিত্র্যময় বিরল প্রজাতিগুলো নিবিড় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমেই ডারউইন প্রথমবারের মতো বিবর্তনের পক্ষে প্রমাণ পেতে শুরু করেন। এখানকার অনেকগুলো প্রজাতি ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্বের পক্ষে প্রমাণ হিসেবে কাজ করেছে।

এর মধ্যে অন্যতম কচ্ছপ। সরীসৃপ জাতীয় প্রাণী কচ্ছপকে প্রাকৃতিক প্রকৌশলীও বলা হয়। গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জে কচ্ছপের একটি বাহিনী পরিবেশগত ভারসাম্য করতে সাহায্য করছে। এই দ্বীপের বিশাল আকৃতির কচ্ছপগুলো সামুদ্রিক দিবাচর পাখি আলব্যাট্রসের চলার পথ পরিষ্কার করে।

স্প্যানিশ নদীর তীরে অবস্থিত এস্পানোলা (Española) দ্বীপে মানুষের আগমনের আগে প্রায় ৮ হাজার কচ্ছপ ছিল। ১৮ শতকে জলদস্যুরা এস্পানোলা ও প্রতিবেশী দ্বীপগুলো দখল করে। তারা খাবারের চাহিদা পূরণের জন্য কচ্ছপ ও তিমির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ফলে কমতে থাকে এই দ্বীপের কচ্ছপের সংখ্যা। এখান থেকে যাওয়ার সময় তারা এই দ্বীপগুলোতে কিছু ছাগল রেখে যায়। ছাগলের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেলে সেখানকার গাছপালা শেষ হয়ে যায়।

ফলে ১৯৭০ এর দশকের মধ্যে তৃণভোজী প্রাণী কচ্ছপের আদিম আবাসস্থল প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়। এ সময় এস্পানোলায় কচ্ছপের বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার করতে সহায়তা করে এই দ্বীপপুঞ্জের সবচেয়ে জনপ্রিয় কচ্ছপ ডিয়েগো। এস্পানোলায় ডিয়েগোর সর্বশেষ ১৪টি কচ্ছপের মধ্যে ১২টি নারী ও দুটি পুরুষ কচ্ছপ ছিল। 

১৯৬৪ থেকে ১৯৭৪ সালের মধ্যে এদেরকে বংশবিস্তার কর্মসূচির জন্য সান্তা ক্রুজে ডারউইন রিসার্চ স্টেশনে নিয়ে আসা হয়। পরে সান ডিয়েগো চিড়িয়াখানা থেকে উদ্ধার করা ডিয়েগোকেও এদের সাথে যুক্ত করা হয়। ডিয়েগো পরবর্তীতে শত শত কচ্ছপের বাবা হয়ে ওঠে এবং এই বিপন্ন প্রজাতিকে রক্ষায় মূল ভূমিকা পালন করে। ২০২০ সালে, তার জন্মস্থানে অবসরে জীবন কাটাতে ফিরে আসার আগ পর্যন্ত সে এই কাজে সাহায্য করে।

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জে কচ্ছপের বাস্তুশাস্ত্র অধ্যয়ন করা মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ ও ভার্জিনিয়া টেকের সংরক্ষণ জীববিজ্ঞানী এলিজাবেথ হান্টার বলেন, কচ্ছপের গুরুত্বপূর্ণ বাস্তুতন্ত্র গঠনের বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তৃণভোজী এই প্রাণী হারিয়ে গেলে সেখানে জন্মানো আগাছা, অন্যান্য প্রজাতি ও তাদের আবাসস্থলে বিরুপ প্রভাব ফেলবে।

তিনি বলেন, ১৮৩৫ সালে চার্লস ডারউইন যখন গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জ পরিদর্শন করেন তখন তিনি উচ্চভূমি থেকে নিচের দিকে একটি চলার পথ দেখতে পান। যা উচ্চভূমি থেকে নিম্নভূমিতে কচ্ছপের চলাচলের জন্য তৈরী হয়েছে।

এস্পানোলায় কচ্ছপগুলো ঐতিহাসিকভাবে আলব্যাট্রসের চলার পথ এবং বাসা বানানোর জায়গা পরিষ্কার করে থাকে। এর ফলে আলব্যাট্রস একচেটিয়াভাবে বংশবৃদ্ধি করতে পারে।

হান্টার বলেন, ‘আলব্যাট্রসের ২ মিটার লম্বা বিশাল ডানা রয়েছে। এরা ওড়ার জন্য প্রথমে দৌড় শুরু করে। এর জন্য তাদের প্রয়োজন হয় খোলা জায়গার। কচ্ছপগুলো আলব্যাট্রসের সেই খোলা জায়গা (ল্যান্ডিং স্ট্রিপ) তৈরি করে দেয়।’

হান্টার বলেন, কচ্ছপের দৈনন্দিন কার্যক্রম প্রাকৃতিক চক্রকে উৎসাহিত করে। একটি কচ্ছপ প্রতি বছর শত শত কিলোগ্রাম গাছপালা খেতে পারে। আর যেসব খেতে পারে না সেগুলো পদদলিত করে। গতিশীল একটি দৈত্যাকার কচ্ছপ মূলত একটি বুলডোজার। যা তার চলার পথের সমস্ত কিছুকে পথ থেকে সরিয়ে দেয়। এর মাধ্যমে কচ্ছপগুলো সেখানকার জীববৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করে।

এস্পানোলায় কচ্ছপের ৫০ বছরের প্রজনন কর্মসূচির আওয়ায় বর্তমানে কচ্ছপের সংখ্যা তিন হাজার। ২০২৩ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, এই দ্বীপে কাঠের গাছপালা ধীরে ধীরে হ্রাস পাচ্ছে এবং ঘাস-বৃক্ষ জাতীয় উদ্ভিদের মিশ্রণে তৈরি বাস্তুতন্ত্র সাভানা ফিরে আসছে। যা সম্ভব হচ্ছে কচ্ছপের কারণে।

কচ্ছপ স্থলজ প্রাণী হওয়া সত্ত্বেও গ্যালাপাগোসে কচ্ছপের জলের প্রতি রয়েছে অগভীর ভালবাসা। দুই ডজন বা তারও অধিক কচ্ছপ একসঙ্গে একটি কর্দমাক্ত পুকুরে ভিজতে পারে। পানিতে এরা দুই পা দিয়ে প্যাডেলিং করে।

যখন একটি কচ্ছপ ঠাণ্ডা হওয়ার জন্য পুকুরে নামে, তখন এটি শরীরে করে মাটি নিয়ে যায়। কচ্ছপ পানিতে মলত্যাগ করে, যার ফলে পানি সার সমৃদ্ধ হয় এবং পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা বৃদ্ধি করে। যা উদ্ভিদ ও পোকামাকড়ের জন্য একটি পুষ্টিসমৃদ্ধ জলজ পরিবেশ তৈরি হয়।
এক সমীক্ষা অনুসারে কচ্ছপ বীজ বিচ্ছুরণকারী একটি প্রাণী। এরা দুই সপ্তাহে ১০ কিমি পর্যন্ত হাঁটতে পারে। হাটার পথে তারা মলত্যাগের মাধ্যমে হাজার হাজার বীজ ছড়িয়ে দেয়।

বিশ্বের অনেক জায়গায় কচ্ছপ পাওয়া যায় এবং বিভিন্ন জায়গায় ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে এরা ইকোসিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করে। উত্তর আমেরিকায়, গোফার কচ্ছপ ১২ মিটার পর্যন্ত লম্বা গর্ত খুঁড়তে পারে। যা ৩৫০ টির মতো অন্যান্য প্রজাতির প্রাণী ব্যবহার করে থাকে। এরমধ্যে রয়েছে বরোজিং পেঁচা, ফ্লোরিডা মাউস ও ইস্টার্ন ইন্ডিগো সাপ।

মরিশাসের প্রধান দ্বীপের ইবোনি ফরেস্ট রিজার্ভে অ্যালডাব্রা অ্যাটল থেকে বিশালাকার দুটি বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির কচ্ছপ আনা হয়েছে। যাতে এরা ক্ষতিকর ঘাস খায় এবং দেশীয় গাছপালা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

রিজার্ভ পরিচালনাকারী সংরক্ষণ জীববিজ্ঞানী ক্রিস্টিন গ্রিফিথস বলেন, আমরা বনভূমিতে একটি চারণ কার্যক্রমের (ইকোসিস্টেম) অভাববোধ করছিলাম। স্বাভাবিকভাবেই কচ্ছপ খোলা জায়গা তৈরি করে, আমরা চাই এরা এ দ্বীপে আগাছা কম রাখুক যেন রোপণ করা গাছগুলো বড় হতে পারে।

মরিশাস উপকূলের দুটি দ্বীপে কচ্ছপ বন সম্প্রসারণে সহায়তা করছে। ভারত মহাসাগরের দ্বীপগুলোতেও কচ্ছপ বনায়নের অংশীদার হচ্ছে। এই দ্বীপগুলোতে দৈত্যাকার কচ্ছপগুলো পুনরুদ্ধার করার সঙ্গে সঙ্গে উদ্ভিদ ও প্রকৃতিতে বিরাট পরিবর্তন হতে শুরু করেছে। যদিও এই জাতীয় প্রকল্পের সাফল্য পরিমাপ করতে কয়েক দশক পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। একইভাবে এস্পানোলা দ্বীপেও কচ্ছপের মাধ্যমে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখতে গবেষকদের এক দশক পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে। সূত্র: বিবিসি

ভাষান্তর: ইসরাত জাহান চৈতী  

আষাঢ়ের প্রথম দিনে

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৪, ০৯:৫২ এএম
আপডেট: ১৫ জুন ২০২৪, ১০:১৫ এএম
আষাঢ়ের প্রথম দিনে
চট্টগ্রাম থেকে ছবিটি তুলেছেন মোহাম্মদ হানিফ

প্রচণ্ড দাবদাহ শেষে জ্যৈষ্ঠের শেষ দিন শুক্রবার (১৪ জুন) বিকেলে দেশজুড়ে ঝরেছে বৃষ্টি। প্রাণ যখন তৃষিত-তপ্ত-ক্লান্ত, ঠিক তখন ঋতুচক্রের পালাবদলে এসেছে বর্ষা। মেঘলা ভোর জানান দিচ্ছে আজ পহেলা আষাঢ়। রবীন্দ্রনাথের গানে আছে ‘আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে...’। 

গ্রীষ্মের দাবদাহে জ্বলে যাওয়া অবসাদে শ্রান্ত বৃক্ষরাজি এখন থেকে সিক্ত হবে নবধারাজলে। মৌসুমি বায়ুপ্রবাহ ইতোমধ্যেই সক্রিয় হতে শুরু করেছে। বর্ষা যেন বাঙালি জীবনে নতুনের আবাহন। সবুজের সমারোহে, মাটিতে নতুন পলির আস্তরণে বর্ষা বয়ে আনে জীবনের বারতা। সুজলা, সুফলা, শস্যশ্যামলা বাংলার নবজন্ম ঘটে বোধহয় এই বর্ষা ঋতুতেই। সারা বছরের খাদ্য-শস্য-বীজের উন্মেষ ঘটবে বর্ষার ফেলে যাওয়া অফুরন্ত সম্ভাবনার পলিমাটি থেকেই। 

বর্ষা তার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে বারবার প্রতিভাত হয়েছে কবিতা, গল্প, গানে, চারুশিল্পে। প্রেমময় এই ঋতুতেই তো ফোটে কদম, কামিনি, কেয়া। সুরভি ছড়াবে বেলী, হাসনাহেনা, গন্ধরাজ। ফুটবে কদম ফুল। বর্ষা প্রকারান্তরে যেন রকমারি ফুলেরই ঋতু। পত্র-পুষ্প-বৃক্ষে, পত্র-পল্লবে নতুন প্রাণের সঞ্চার করবে বর্ষা। প্রকৃতির রূপবদল সবাইকে জানান দেবে যে, হ্যাঁ বর্ষা এখন সমাগত। 

তবে গ্রামবাংলার বর্ষা আর শহুরে বর্ষায় যেন বহু তফাত। রূপে-গন্ধে, বর্ণে শহরে বর্ষাকে আবাহন করা হয় নাগরিক উৎসবের ডামাডালে। যে বৃক্ষরাজি বর্ষা নামায় এই শহরে, সেই শহরে বনানী উজাড় হয় প্রতিনিয়ত। বর্ষণমুখর দিন শেষে তাই নগরজীবনে ভোগান্তির নাম জলাবদ্ধতা। বর্ষা জনদুর্ভোগেরও কারণ হয়।  

এমন বাস্তবতায় প্রকৃতি রক্ষার ব্রত আর বর্ষার অপার সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী আজ শনিবার সকালে আয়োজন করবে বর্ষা উৎসব। বাংলা একাডেমির নজরুল মঞ্চে আজ সকাল ৭টায় শুরু হবে এ অনুষ্ঠান। উদীচী ঢাকা মহানগর সংসদের আয়োজনে অংশ নেবেন দেশবরেণ্য সংগীত, আবৃত্তি ও নৃত্যের গুণীজনরা। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় আজ সকাল সাড়ে ৭টায় বর্ষা উৎসব উদযাপন পরিষদের বর্ষা উৎসব শুরু হবে। প্রবীণ বংশীবাদক মো. হাসান আলীর বাঁশি বাদনের মধ্য দিয়ে উৎসবের সূচনা হবে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও চিত্রশিল্পী আবুল বারাক আলভী। গান, কবিতা, আবৃত্তি ও কথনে সাজানো হয়েছে এই উৎসব। অনুষ্ঠান শেষে শিশু-কিশোরদের মাঝে বনজ, ফলদ ও ঔষধি গাছের চারা বিতরণ করা হবে।

আমেরিকান ফুল সোনাপাতি

প্রকাশ: ৩১ মে ২০২৪, ০৯:৫৮ এএম
আপডেট: ৩১ মে ২০২৪, ০৯:৫৮ এএম
আমেরিকান ফুল সোনাপাতি
শাহবাগে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের উদ্যানে গ্রীষ্মে ফোটা সোনাপাতি ফুল। ছবি: লেখক

শাহবাগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সুপার স্পেশালাইজড একটি হাসপাতাল আছে। সে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে ছোট্ট একটি নান্দনিক উদ্যান গড়ে তোলা হয়েছে। গাছপালাও তরুণ, এখনো ছায়া দেওয়ার মতো যথেষ্ট বড় হয়নি। কিন্তু তাতে কী? জারুল আর লাল সোনালু গাছগুলোতে ফুল ফোটা শুরু না হলেও সোনাপাতি গাছগুলো সে অভাব পুষিয়ে দিচ্ছে। সোনারঙা হলদে ফুলগুলো ফুটছে থোকা ধরে। গাছের কাছে গেলে সেসব ফুলের মিষ্টি সুবাসে মন ভরে যাচ্ছে। জ্যৈষ্ঠের খরতাপে মাঝে মাঝে দমকা হাওয়ায় সে সুবাস চলে যাচ্ছে দুরান্তে। ভোরের আলোর ছটা ঠিকরে পড়ছে ফুলগুলোর গায়ে, চাপ চাপ ছায়া মেখে আছে ঝোপাল সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে। কালো, হালকা সবুজ, গাঢ় সবুজ, হলুদ, উজ্জ্বল হলুদ- আহা কত রঙের খেলা চলছে গাছগুলোর পরতে পরতে। খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে সে দৃশ্যের সঙ্গে দেখা যায় মৌমাছিদের নাচানাচি। ওদের মেয়েগুলো বড্ড বদমাশ, একটি মেয়ে মৌমাছি নাচিয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে অনেকগুলো পুরুষ মৌমাছিকে। পরিষ্কার নীল আকাশে সে উড়ছে আর সর্পিল আকারে নেচে বেড়াচ্ছে। পুরুষগুলোও মেয়েটির সঙ্গে মিলনের আশায় নেচে নেচে তার পিছু ছুটে বেড়াচ্ছে। আর বোকা শ্রমিক মৌমাছিগুলো মাথা খুঁড়ে মরছে এ ফুল থেকে ও ফুলে মধু সংগ্রহে। সোনাপাতি ফুলের তো অভাব নেই, তাই সোনাপাতি ফুলেরাও মধুর গুদাম খুলে রেখেছে। মধুগন্ধী সৌরভে টেনে আনছে মৌমাছিদের। বোঝা গেল ধারে কাছে হয়তো কোথাও কোনো গাছে ওরা চাক বেঁধেছে। মেয়ে আর পুরুষ মৌমাছিদের খাদ্য জোগাতে মাইলের পর মাইল দিনভর উড়ে বেড়াচ্ছে ওসব শ্রমিক মৌমাছি। এসব ভাবছি আর সোনাপাতি ফুলে বাতাস আর মৌমাছিদের খেলা দেখছি। ছবি তোলার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। হঠাৎ একটি গাড়ির হর্নে ঘোর ভাঙল।

এ রকম আরেকবার ঘোর লেগেছিল গত মাসে রমনা উদ্যানে মৎস্য ভবনের দিকে থাকা প্রবেশপথের কাছে আরেকটি সোনাপাতি ফুলের গাছ দেখে। একটি গাছের তলায় এত ফুল ঝরে সবুজ ঘাসের ওপর থাকতে পারে! পাশ দিয়ে হেঁটে গেলেই তার সৌরভে উতলা হতে হয়। এ ফুল এ দেশে নতুন না। বিভিন্ন বাগানে ও বাড়ির আঙিনায় অনেক দিন আগে থেকেই লাগানো চলছে। এ গাছ নগরে মোটেই বিরল না, চারদিকে একটু চোখ মেলে তাকালেই এদের চোখে পড়ে। এমনকি রোকেয়া সরণির সড়ক বিভাজকেও এ গাছ লাগানো হয়েছে। নার্সারিগুলোতেও এর চারা পাওয়া যায়। 

এ দেশে এখন সোনাপাতি গাছ যেভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে মনে হয় সে যেন আমাদের দেশি গাছ। কিন্তু আসলে তা না, গাছটি উত্তর আমেরিকা থেকে নানা দেশ ঘুরে এসেছে আমাদের দেশে। এ গাছের ইংরেজি নাম ইয়েলোবেল বা ইয়েলো এলডার, অন্য একটি বাংলা নাম পেলাম চন্দ্রপ্রভা। এ গাছের উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম টেকোমা স্ট্যানস (Tecoma stans) ও গোত্র বিগ্নোনিয়েসি। এ জন্য একে কেউ কেউ হলদে টেকোমা বলেও ডাকেন। টেকোমা এর মহাজাতি বা গণের নাম। এ গণের অন্তত তিনটি প্রজাতির গাছ এ দেশে আছে। এগুলোর মধ্যে টেকোমা ক্যাপেনসিস প্রজাতির ফুলকে টেকোমা ফুল নামে ডাকা হয়, অন্য নাম কেপ হানি সাকল, এর ফুল কমলা রঙের আর সরু নলের মতো চোঙাকৃতির পাঁপড়ি, বাংলা নাম মৌচুষি। অন্যটি টেকোমা আনডুলাটা, যার বাংলা নাম সোনাদলা। এর কোনোটিই আমাদের দেশের গাছ না।

সোনাপাতি প্রায় চিরসবুজ বহুবর্ষজীবী গুল্ম বা ছোট বৃক্ষ। ঢাকায় ফার্মগেটের কাছে মণিপুরীপাড়ায় একটি সোনাপাতি গাছ দেখেছি, যা পাশের দোতলা ভবনকে ছাড়িয়ে গেছে। এ গাছ ১০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। পাতা বর্শার ফলার মতো, অগ্রভাগ সুঁচালো, কিনারা সূক্ষ্মভাবে করাতের দাঁতের মতো খাঁজকাটা, পাতা খসখসে। ডালের আগায় থোকা ধরে অনেকগুলো হলদে সোনা রঙের ঘণ্টাকৃতির ফুল ফোটে বসন্ত থেকে হেমন্ত পর্যন্ত। ফুল ফুটলে ফুলের মধু খেতে আসে মৌমাছি, প্রজাপতি ও হামিং বার্ড পাখিরা। হা করে মুখ খোলা ফুলের পাঁপড়ির অগ্রপ্রান্ত পাঁচটি খণ্ডে বিভক্ত হলেও গোড়া যুক্ত হয়ে ফানেলের মতো আকৃতি তৈরি করে। বসন্ত থেকে শরৎ পর্যন্ত প্রচুর ফুল ফোটে। ফল হয়, ফলের ভেতর হলদে রঙের বীজ হয়। বীজে পর্দার মতো ডানা থাকে। ফল পেকে ফেটে গেলে বীজগুলো সে ডানায় ভর করে দূর-দূরান্তে বাতাসে ভেসে যায় ও নিজেদের বংশ বাড়ায়। এর শাখা কেটে কলম করেও সহজে চারা তৈরি করা যায়। চারা লাগানোর পর দ্রুত বাড়ে। পুষ্পিত গাছ থেকে করা শাখা কলমের গাছে পরের বছর থেকেই ফুল ফুটতে শুরু করে। দ্রুত এ গাছ বেড়ে সে স্থানে ঝোপ করে ফেলে। এ জন্য এ গাছকে কোনো কোনো দেশে আগাছার মতো আপদ মনে করা হয়। কিন্তু সোনাপাতি আমাদের দেশে আপদ না, সম্পদ। পুষ্প ও বাহারি গাছের সম্পদ। টবে, বাগানে, উদ্যানে সব জায়গাতেই একে লাগানো যায়। এমনকি পথতরু হিসেবেও দীর্ঘ প্রস্ফুটনের জন্য সমাদৃত।

পথে পথে লিচুর পসরা

প্রকাশ: ২৮ মে ২০২৪, ১২:৪৬ পিএম
আপডেট: ২৮ মে ২০২৪, ১২:৪৬ পিএম
পথে পথে লিচুর পসরা
মৌসুমি ফল লিচু এসেছে রাজধানীর বাজারগুলোতে। বায়তুল মোকাররম এলাকা থেকে তোলা। ছবি : খবরের কাগজ

গ্রীষ্মকাল মানেই হরেক রকম সুস্বাদু ও রসালো ফলের সমাহার। তীব্র তাপের কারণে এই ঋতু অনেকের পছন্দ না হলেও গ্রীষ্মকালীন ফল পছন্দ করেন না, এ রকম মানুষের সংখ্যা হাতে গুনে খুঁজে বের করা যাবে। জ্যৈষ্ঠ মাসের শুরুর দিকেই বাজারে উঠতে শুরু করেছে স্বাদে-গুণে ভরা রসালো ফল লিচু। ক্ষণকালীন এ ফল পছন্দের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে বাচ্চা থেকে বুড়ো সবার।

মানুষের চাহিদাকে পুঁজি করে মৌসুমি ব্যবসায়ীরাও লিচু সংগ্রহ ও বিক্রির ব্যাপারে তৎপর হয়ে ওঠেন।  ফলের দোকান তো বটেই, ভ্যানে ও ঝুড়িভর্তি লিচু জনবহুল জায়গায় বিক্রি করেন তারা। বাজারে লিচু ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই অনেকে হামলে পড়েন মৌসুমি এই ফলের ওপর। ঝুড়িভর্তি লাল টসটসে ফলটি নজরে পড়লেই কেনার জন্য ভিড় জমে যায়।    

বাজারে বিভিন্ন জাতের লিচুর দেখা পাওয়া যায়। এর মধ্যে বছর কদমী, মোজাফফরপুরী, চায়না-৩ বোম্বাই, এলাচি, পাতি ও মাদ্রাজি জাতের লিচুর চাহিদা রয়েছে শীর্ষে। গতকাল  সোমবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, রাজশাহী আর দিনাজপুরের কিছু লিচু উঠতে শুরু করেছে। পিস হিসেবে বিক্রি হয় এসব।  জাতভেদে বিভিন্ন লিচু ‘শ’ হিসেবে বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন দামে। স্থানভেদে রাজশাহীর লিচু প্রতি ১০০ পিস বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা দরে। ক্রেতারা যার যার চাহিদামতো কিনে নিচ্ছেন। 

শুধু স্বাদের দিক থেকেই নয়, স্বাস্থ্যগুণেও ভরপুর এই ফল। আমেরিকান জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশনের তথ্য, লিচু ভিটামিন-সির বড় একটি উৎস। ভিটামিন-সি স্ট্রোকের ঝুঁকি ৪২ শতাংশ কমিয়ে দেয়। লিচু অ্যান্টিঅক্সিডেন্টেরও একটি ভালো উৎস। এতে অন্যান্য ফলের তুলনায় পলিফেনলের মাত্রা বেশি থাকে। এ ছাড়া লিচু এপিকেটেচিনের একটি ভাণ্ডার, যা হার্টের স্বাস্থ্যের উন্নতি করতে পারে এবং ক্যানসার ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে পারে।  এই ফলে আছে রুটিন উপাদান। ফুড কেমিস্ট্রি জার্নালে প্রকাশিত এক সমীক্ষা অনুসারে, রুটিন মানবদেহকে ক্যানসার, ডায়াবেটিস এবং অন্যান্য কার্ডিওভাসকুলার সমস্যাগুলোর মতো দীর্ঘস্থায়ী রোগ থেকে বাঁচাতে সাহায্য করতে পারে।

সোমবার (২৭ মে) বাংলামোটরের ইস্কাটন রোডের ফুটপাতে ভ্যানে করে লিচু বিক্রি করছিলেন মো. ইদ্রিস আলী। তিনি খবরের কাগজকে জানান, বাজারে মৌসুমের নতুন লিচু ওঠা শুরু হয়েছে। তার জন্য মানুষের আগ্রহ অনেক বেশি। তিনি এক হাজার পিস  নিয়ে এসেছিলেন সকাল বেলা। দুপুরের মধ্যেই ৪০০ পিস  বিক্রি করেছেন। 

ফার্মগেটে দিনাজপুরের লিচু বিক্রি করছিলেন নাসির উদ্দীন। তিনি জানান, এসব লিচু আড়ত থেকে পাইকারি দরে সংগ্রহ করেন তারা। পাইকাররা বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে বাগান হিসাবে লিচু কিনে থাকেন। ঢাকায় পাইকারি আড়ত কারওয়ান বাজারে। সেখান থেকে সর্বনিম্ন ৫০০ লিচু কেনা যায়। পাইকারিতে প্রতি ১০০ পিস লিচু ৩৫০ টাকা পড়ে। তার সঙ্গে পরিবহন ভাড়া যুক্ত হয়। সব খরচ যোগ করে এসব লিচু খুচরা ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা দরে বিক্রি করেন ক্রেতাদের কাছে। 

নাসিরউদ্দীন জানান, এ বছর আবহাওয়া লিচু চাষের উপযোগী হওয়ায় ভালো ফলন হয়েছে। সাধারণত জ্যৈষ্ঠের শুরু থেকে আষাঢ়ের মাঝামাঝি সময়ে বাজারে লিচুর প্রাচুর্য থাকে। চাহিদার বড় জোগান আসে সাধারণত রাজশাহী, দিনাজপুর, পাবনা, রাজবাড়ী, ঈশ্বরদী, আটঘরিয়া ও গাজীপুরের কাপাসিয়া থেকে। 

হুমায়রা বেগম নামের এক ক্রেতা খবরের কাগজকে জানালেন, তাদের বাসার প্রত্যেকেই লিচু খুব পছন্দ করেন। বিশেষ করে বাচ্চারা এই মৌসুমের জন্য মুখিয়ে থাকে। লিচুর দিনে ঘরভর্তি করে কিনে রাখা হয়। লিচু বাজারে খুব কম সময় পাওয়া যায়। তাই মন ভরে খেতে না পারলে যেন তৃপ্তি মেটে না।

আরেকজন ক্রেতা রাজীব ভূঁইয়া জানান, মৌসুমি এই ফলের দাম আরও কম রাখা উচিত।  তিনি ঢাকা শহরে মেসে থাকেন। লিচু তার খুব পছন্দের একটা ফল হলেও দাম চড়া হওয়ায় বেশি করে কিনতে পারেন না। তবুও পছন্দের ফল বলে কথা, অল্প করে নিলেও মৌসুমের প্রথমে বাজারে উঠেছে, তাই কিনছেন। 

আরেক বিক্রেতা সবুর বলেন, প্রথম দিকে বাজারে উঠতে শুরু করেছে বলে লিচুর দাম এখন বাড়তি। কিছুদিন গেলে বাজারে যখন একটু বেশি পরিমাণে পাওয়া যাবে, তখন দাম আরেকটু হয়তো কমবে। 

বন খঞ্জন বিরল পরিযায়ী

প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৪, ০১:১৭ পিএম
আপডেট: ২৫ মে ২০২৪, ০১:১৭ পিএম
বন খঞ্জন বিরল পরিযায়ী
বন খঞ্জন। সোনাদিয়া দ্বীপ থেকে তোলা

বসন্ত এলে বাংলায় আবাসিক পাখ-পাখালির কলরব বাড়তে থাকে। গ্রীষ্মের তপ্ত দিনে পাখিদের গানের রেশ আরও বেড়ে যায়। গ্রীষ্মের সময় বাংলার বনেবাদাড়ে কয়েক প্রজাতির পরিযায়ী পাখির দেখা মেলে। তার মধ্যে বনতলে চুপচাপ একা একা লেজ দুলিয়ে ঘুরে বেড়ানো একটি পাখি হলো বন খঞ্জন।

বাংলাদেশে ধলাভ্রু খঞ্জন বাদে সব প্রজাতিই পরিযায়ী এবং তাদের আগমন ঘটে শীতে। কেবল বন খঞ্জনই গ্রীষ্মে শরতের সময় বাংলাদেশে দেখা যায়। তবে পাখিটি খুব সহজেই চোখে পড়ে না। ১০ বছর আগে বন খঞ্জন দেখার একমাত্র জায়গা ছিল ঢাকার মিরপুর জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের একটি ঘন গাছপালাময় ও ছায়া-শীতল অংশ। কেবল সেখানে গিয়ে লুকিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলে বনতলে একটি বা দুটি বন খঞ্জন দেখা যেত। তবে কোনোরকমভাবে মানুষের উপস্থিতি টের পেলেই উড়ে গিয়ে গাছের ডালে বসত। গ্রীষ্মে কয়েকবার জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে বন খঞ্জন দেখতে গিয়ে মাত্র একবারই তার দেখা পেয়েছিলাম। 

দেখলাম এরা প্রায়ই গাছের ডাল থেকে উড়ে গিয়ে অন্য গাছের ডাল বরাবর পোকামাকড় ধরে। বনের মধ্যে খাড়া শাখায় আরোহণ করে এবং অনুভূমিক শাখা বরাবর দ্রুত উড়তে পারে। বনের মধ্যেকার হাঁটার পথেও খাবার খুঁজে বেড়ায়।

বাংলায় এমন সতর্ক খঞ্জন একটিও নেই। অন্যসব খঞ্জন মানুষের প্রায় কাছাকাছি এসে লেজ দুলিয়ে হেঁটে চলে বেড়ায়। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বন খঞ্জনের দেখা পেয়েছি ২০১৮ সালে সোনাদিয়া দ্বীপের ঝাউবনে, শরতের সময়। সংখ্যায় ছিল গোটা বিশেক। সম্ভবত কয়েক দিন আগেই তারা ওই ঝাউবনে এসেছিল। সম্ভবত সোনাদিয়া দ্বীপের ঝাউবন তাদের গুরুত্বপূর্ণ যাত্রাবিরতির স্থান অথবা একত্র হওয়ার জায়গা ছিল। এখান থেকে তাদের অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ার কথা ছিল হয়তো। ঝাউবনের তলে কয়েক দিন বন খঞ্জনদের হেঁটে হেঁটে খাবার সংগ্রহ করতে দেখেছি। বনের ওই অংশে মানুষের উপস্থিতি কম ছিল। যে কারণে পাখিগুলো অনেকটাই নিরাপদ মনে করে বনতল চষে বেড়াত খাবারের জন্য। 

বন খঞ্জন বাংলাদেশে বিরল পরিযায়ী পাখি। দেশের প্রায় সব বিভাগের বনে দেখা যায়। বিশেষ করে পাতাঝরা বন, ঝাউবন, দেবদারু বন ও বাঁশবনের কাছে বিচরণ করে। প্রধানত একা, কদাচিৎ জোড়ায় এবং ছোট ঝাঁকে দেখা যায়। ছায়াময় বনতল তাদের পছন্দের আবাস। পিঙ্ক পিঙ্ক সুরে গান গায় কেবল ওড়ার সময়। মাকড়সা, পিঁপড়ে ও অন্যান্য পোকামাকড় এদের প্রধান খাদ্য। সারা পৃথিবীতে বন খঞ্জনের কেবল একটি প্রজাতি আছে। তাই পৃথিবীর একমাত্র বন খঞ্জন নিয়ে আমরা গর্ব করতে পারি বটে!  

নাগলিঙ্গম ফুলের শোভা

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৪, ১০:০৫ এএম
আপডেট: ২৪ মে ২০২৪, ১০:০৫ এএম
নাগলিঙ্গম ফুলের শোভা
ঢাকার জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে মে মাসে ফোটা নাগলিঙ্গম ফুল। ছবি: লেখক

ঢাকা শহরের অনেক উদ্যানে এখন নাগলিঙ্গম ফুলের প্রাচুর্য আর স্ফুরণ চলছে। অপরূপ ব্যতিক্রমী চেহারার এ ফুলের দিকে চোখ পড়লে যে-কেউ তার রূপে মজে যায়। কেননা, এ গাছের নাম ও ফুল দুটোই অন্যরকম। একসময় নাগলিঙ্গম গাছ ঢাকায় ছিল দুষ্প্রাপ্য, এখন বহু জায়গায় এ গাছ দেখা যায়। 

প্রায় ২০ বছর আগে ভাওয়াল রাজবাড়ীতে এক অদ্ভুত ও অচিন গাছ আছে শুনে তা দেখার জন্য ছুটে গিয়েছিলাম। সেখানেই প্রথম দেখা মিলে নাগলিঙ্গম গাছের। এরপর আরও কত জায়গায় যে তাকে দেখেছি! নাগলিঙ্গম গাছের জন্ম দক্ষিণ ক্যারিবীয় অঞ্চল ও দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরাংশ। সেখান থেকে কয়েক হাজার বছর আগে এই গাছ এসেছে আমাদের অঞ্চলে। ভারতবর্ষে এই গাছ প্রায় তিন হাজার বছর ধরে জন্মাচ্ছে। চেন্নাই জাতীয় জাদুঘর চত্বরেও দেখেছি একটি বিশাল গাছ। তার ফলগুলো যেন আমাদের দেশের গাছগুলোর ফলের চেয়ে বড়। 

নিসর্গী দ্বিজেন শর্মা ১৯৬৫ সালে ঢাকা শহরে হেয়ার রোড ও মিন্টো রোডের সংযোগস্থলে পাকুড় গাছের পাশে যে নাগলিঙ্গম গাছটি দেখেছিলেন, সেটি কাটা পড়েছে বহু আগেই। অবশ্য তেজগাঁওয়ের কৃষি কলেজের (বর্তমান শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়) গাছগুলো এখনো আছে। রমনা উদ্যানের মধ্যে কয়েকটি নাগলিঙ্গম গাছ রয়েছে। ফুল ফোটার সময় সে গাছগুলোর কাছে গেলে অদ্ভুত একটা ঘ্রাণ নাকে আসে। এরপর গাছের তলায় চোখ পড়লে আঁতকে উঠতে হয়! এত ফুল রোজ ঝরে পড়ে! তলাটায় কোনো ঘাস আর মাটি দেখা যায় না, পুরোটাই ঢাকা থাকে ঝরে পড়া নাগলিঙ্গম ফুলে।

একটি বড় নাগলিঙ্গম গাছে রোজ প্রায় ১০০০টি ফুল ফোটে। এ দেশে ঢাকায় রমনা পার্ক, জাতীয় ঈদগাহ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কার্জন হলের সামনের উদ্যান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ, নটর ডেম কলেজ, জাতীয় প্রেস ক্লাব, ক্যান্টনমেন্ট ইত্যাদি বহু জায়গায় এ গাছ রয়েছে। তবে ঠিক কী কারণ জানি না, বিভিন্ন স্থানে ও বিভিন্ন ঋতুতে ফুলের পাপড়ির রং দেখেছি ভিন্ন হতে। অন্তত তিন রঙের ফুল আমার চোখে পড়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর তরুণ গাছের ফুলের রং গাঢ় মেরুন, রমনা উদ্যানে ফোটা ফুলের রং লাল ও অন্যটার গোলাপি লাল বা ফিকে গোলাপি। জাতের তফাতও হতে পারে। আবার ফোটার পর সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে রঙের বদলও হয় কি না, তাও জানি না।

নাগলিঙ্গম ফল দেখতে কামানের গোলার মতো গোল ও বড়। পাকার পর শক্ত খোসার ফলগুলো গাছ থেকে ঝরে মাটিতে পড়লে বেশ শব্দ হয়। এ জন্য এ গাছের নাম রাখা হয়েছে ক্যাননবল ট্রি, উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Couroupita guianensis ও গোত্র লেচিথিডেসি। গাছ প্রায় চিরসবুজ ও অনেক বছর বাঁচে। কাণ্ড সরল, ঊর্ধ্বমুখী, বহু ডালপালায় ছায়াঘন। পাতা দীর্ঘ, চওড়া। পাতার গোড়া থেকে আগার দিক বেশি চওড়া, অগ্রভাগ ভোঁতা। কচিপাতা ম্লান সবুজ, বয়স্ক পাতা গাঢ় সবুজ। বছরে গাছে কয়েকবার পাতা ঝরে ও নতুন পাতা গজায়, তেমনি ফুলও ফোটে কয়েক দফায়। ফুল ফোটে কাণ্ডের গা থেকে। অজস্র ঝুলন্ত মঞ্জরিতে অনেক ফুল ফোটে। লালচে মেরুন রঙের ফুলগুলো দেখতে বেশ সুন্দর, সুগন্ধও আছে। ফুল দেখতে অনেকটা সাপের ফণার মতো, তাই এ গাছের বাংলা নাম রাখা হয়েছে নাগলিঙ্গম, ওটা ওর সংস্কৃত নাম। 

ফুল ফুটলে মৌমাছিরা সেসব ফুলে আসে ও পরাগায়ণ ঘটে। ফল পাকলে তা গাছ থেকে ঝরে মাটিতে পড়ে ফেটে গিয়ে তা থেকে দুর্গন্ধ ছোটে। বন্য প্রাণীরা সেই গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে ছুটে আসে ও ফল খেয়ে চলে যায়। খাওয়ার পর সেসব প্রাণীর পেটের ভেতরে থাকে নাগলিঙ্গম ফলের বীজ। বিষ্ঠা ত্যাগ করার পর সেসব বীজ তখন মাটিতে পড়ে ও অনুকূল পরিবেশ পায়, তখন সেখানে গাছ গজায়। এখন কেউ কেউ বিভিন্ন পার্ক বা উদ্যানে এই শোভাময়ী গাছটি লাগাচ্ছেন। তবে রাস্তার ধারে একে কোনোভাবেই লাগানো যাবে না। কেউ যদি ফল ধরা অবস্থায় এ গাছের তলায় গিয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সেই ফল মাথায় পড়ে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই উচিত হবে এ গাছের তলায় গেলে একটা চোখ অন্তত গাছের দিকে রাখা।