আমাদের অনুরোধ থাকবে, বিগত ১৫ বছরে যারা ফিরে এসেছে এ ধরনের ৫০টি কেইস বা তথ্যের যাচাই যদি তারা হাতে নেন, অনেক সমস্যার সমাধান তারা করতে পারবেন। অন্তত দেশের ভেতর থেকে যেভাবে প্রক্রিয়াটা শুরু হয়, সেখানে সিন্ডিকেট বা আঁতাতের মাধ্যমে নিয়মবহির্ভূত বেআইনি কর্মকাণ্ডগুলো বন্ধ করা সম্ভব হবে।...

১৯৩৯ সালে আইএলও বলেছিল যে, আন্তর্জাতিক অভিবাসীরা হচ্ছে বিশ্বের সবচাইতে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমশক্তি। এই শ্রমশক্তি ভীষণভাবে প্রয়োজন। এরা কাজ না করলে বিশ্ব অর্থনীতি চলতে পারে না। কিন্তু তাদের অধিকার, তাদের স্বাস্থ্যসেবা সবকিছু সবচেয়ে অবহেলিত। আমরা ২০২৬ সালে এসে প্রায় ৯০ বছরের ভেতরে যে খুব পরিবর্তন দেখেছি তা নয়। সে তুলনায় অভিবাসন বেড়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি। কিন্তু ১৯৩৯ সালের তুলনায় অভিবাসীদের অবস্থা কোনো দিক থেকেই ভালো হয়নি। বিশেষ করে যখন কোনো একটা যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয় তখন সবচেয়ে ক্ষতির সম্মুখীন হয় এই মানুষগুলো, যারা অভিবাসীকর্মী হিসেবে কাজ করছেন। তাদের কাজকর্ম, জীবিকা সবকিছু থেমে যায়। এর ফলে তাদের খাদ্য-বস্ত্রসহ সবকিছুতেই একটা চরম প্রভাব পড়ে। আমরা দেখেছি কোভিডের সময় কীভাবে আমাদের কর্মীদের দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। আমরা এটাও দেখেছি সবচেয়ে বেশি মাইগ্রেন্ট ওয়ার্কারদের কোভিডের হার বেশি।
এখন ইরানের সঙ্গে ইউএস আর ইসরায়েলের যে যুদ্ধ এটার ভেতরেও আমরা দেখছি যে, মারা যাচ্ছেন অভিবাসী কর্মীরা। তাদের ভেতরে বাংলাদেশি কর্মীরা রয়েছেন। বিশ্বজুড়ে অধিকারের জায়গাটা সংকুচিত হয়েছে আমাদের মাইগ্রেন্ট ওয়ার্কারদের। এখন যুদ্ধাবস্থায় আমাদের সরকারের মূল দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে জানমালের নিরাপত্তা। যদি সেখানে তারা একেবারেই অনিশ্চিত থাকে তাহলে দেশের প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা করা। এখনকার চিত্রে যেই অধিকারগুলো ১৯৯০-এর কনভেনশন দিয়েছিল, সে অধিকারগুলো কিন্তু এখন নেই। কারণ ’৯০-এর কনভেনশনে সব দেশ স্বাক্ষর করেনি। আর এখন সংক্ষিপ্ত বা কমপ্যাক্টটা হচ্ছে মূলত একটা নন বাইন্ডিং দলিল। সে বিবেচনায় অধিকারের জায়গা থেকে যুদ্ধ চলা অবস্থায় কর্মীদের সুরক্ষার জায়গা কিন্তু খুব কম। সুতরাং আমার রাষ্ট্রকেই এখন সচেতনভাবে তাদের সুরক্ষার চিন্তা করতে হবে। এটা একটা দিক। এখন যদি আমরা এটাকে বৃহত্তর ক্ষেত্রে আনতে চাই সেটা হচ্ছে ইন জেনারেল অভিবাসী হতে গিয়ে তারা যে চরম নিগ্রহের শিকার এবং মৃত্যু তার শেষ পরিণতি। এ জায়গায় আমরা একটু দৃষ্টি আনতে চাই। আমরা জানি, আমাদের সরকারের যে হিসাব তা থেকে আমরা দেখেছি, প্রতি বছরে সাড়ে ৩ থেকে ৪ হাজার বিদেশ থেকে লাশ আসে। এর অধিকাংশই হচ্ছে বাংলাদেশি কর্মীদের লাশ। আর এটাকে যদি আবার একটু বৃহত্তরভাবে পর্যালোচনা করি, আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, যারা মারা যাচ্ছে তাদের গড় বয়স ৩৭। শতকরা ২৭ ভাগের মতো বলা হচ্ছে যে অস্বাভাবিক মৃত্যু।
যে মেয়েটার ওপরে ধর্ষণ আর অত্যাচারের ক্ষতচিহ্ন পাওয়া গেল এবং আমার সরকারের হিউম্যান রাইটস কমিশন যখন তার বিরুদ্ধে একটা প্রতিবাদ করে বলল, কেস পাঠাও। ওই দেশে কেস হয়ে যাবজীবন হয়েছে। কোটি টাকার ওপরে তার পরিবার ক্ষতিপূরণ পেয়েছে। ওই দেশও চায় না যে, তার দেশে অন্যায় হতে থাক। দেশের সরকারও চায় যে, ঘরের ভেতরে এ ধরনের অত্যাচার না হোক। অন্যদিকে আরেকটা চিত্রও আছে। আরেকটা চিত্র হচ্ছে যে, যারা অনিয়মিত মাইগ্রেন্ট বা অভিবাসী হিসেবে শুরু থেকেই জেনেশুনে হয়তো ইউরোপে যেতে চান। হয়তো সেখান থেকে পাড়ি জমাতে চান নর্থ আমেরিকার দেশে। এই যে মানুষগুলো যারা যাচ্ছেন, তারা যে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন, সেটা আবার আরেকটা চিত্র। সেই চিত্রটা হচ্ছে এরা বিদেশে যেতে দুঃসাহসী। এখন আমরা যতই বলি এদের ভুলিয়ে ভালিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, আসলে ভুলিয়ে ভালিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে না। এরা জেনে-বুঝে যাচ্ছেন। এরা অবৈধ প্রক্রিয়ায় যাচ্ছেন। কিন্তু যাওয়ার পরের বাস্তবতাটা কী, যাওয়ার পরে সেটা বুঝতে পারছেন। সন্ত্রাসী বা মানব পাচারকারীরা তাদের জিম্মি করে বিভিন্ন রকমের টাকা-পয়সা দাবি করতে থাকে। তারা তখন পরিবার থেকে টাকা-পয়সা দেওয়ার ব্যবস্থা করেন অথবা তাদের মেরে ফেলা হয়। এই যে মৃত্যু, এই মৃত্যু কখনোই কাম্য নয়। এই মৃত্যু আমাদের কাম্য হতে পারে না।
এত প্রতিকূলতার মধ্যেও দেশের বাইরে গিয়ে তারা কাজ করে যাচ্ছেন। এবং যারা এত কিছু করে ওখানে চলে যেতে পারছেন তারা কিন্তু ওখানে গিয়ে কাজ পেয়ে যাচ্ছেন। কারণ ওই দেশের অ্যাগ্রিকালচারাল সেক্টরসহ বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রি সেক্টরে যে লেবার দরকার, সে লেবার তারা অর্ধেক মূল্যে নিয়ে নিচ্ছে। আমাদের যারা অনিয়মিত অভিবাসী তাদের দিয়ে কাজটা করানো হচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হলে সব দোষ আমাদের মতো দেশগুলোর ওপরে হচ্ছে এবং যারা যেতে ইচ্ছুক তাদের ওপর চাপানো হচ্ছে। কিন্তু এটার জন্য একইভাবে দায়ী হচ্ছে উন্নত দেশগুলোর মাইগ্রেশন বা অভিবাসী পলিসি। প্রতিটা জায়গায় হাত বদল হয়ে এটা এগিয়ে যায়। তা না করে তারা যেভাবে টেরোরিজম বা সন্ত্রাসবাদ দমন করার জন্য নেমেছিল, সেভাবে যদি তারা এই ট্র্যাফিকিং বা মানব পাচার দমনের জন্য নামত, ওই ক্ষেত্রগুলোতে যে মানব পাচার রয়েছে তাদের ধরত তাহলে কিন্তু সহজেই মানব পাচার কমত। কিন্তু তা কমছে না। কারণ উন্নত বিশ্বের পলিসি, উন্নত বিশ্বের মানব পাচারের ব্যাপারে, অনুন্নত দেশগুলোর ওপরে পলিসি এবং তার নিজের কনভিকশন বা দৃঢ় বিশ্বাসের অভাব। ভূমধ্যসাগর দিয়ে যারা পাড়ি দিচ্ছে তাদের বেশির ভাগ বাংলাদেশি। এরা বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে আটকে পড়েছে। ন্যাশনাল অ্যাসেসমেন্ট অ্যান্ড অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল (ন্যাক) ব্যাখ্যা করে যে, বাংলাদেশের অবস্থান ভালো নয় দেখে এ অবস্থা। এ কথা ঠিক নয়। কারণ অবস্থা যত ভালো হবে, মাইগ্রেশন বা অভিবাসন তত ভালো হবে। আমাদের অবস্থা যত ভালো হবে আমরা তত মাইগ্রেট করব। মাইগ্রেট, অর্থাৎ অভিবাসন বা স্থানান্তর তত্ত্ব এটাই বলে। গরিব বা দরিদ্র মানুষ মাইগ্রেট করে অভ্যন্তরীণভাবে। হয়তো তারা কাজের সন্ধানে ঢাকা আসবে অথবা চিটাগাং যাবে। কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে যারা মাইগ্রেট করে তারা অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল। যারা লাখ লাখ টাকা দিতে পারেন এমন লোকই মাইগ্রেট করে। তাদের অবশ্যই অর্থনৈতিক সামর্থ্য রয়েছে। বাইরে যাওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা যাদের আছে তাদের থামানো যাবে না অন্য কোনো প্রক্রিয়ায়। কাজেই, আমাদের অনুরোধ থাকবে সরকারের প্রতি ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসীদের জন্য সরকার যেন এখনই চিন্তাভাবনা শুরু করে। আমাদের নতুন সরকার। তাদের অবশ্যই ইচ্ছে থাকে ভালো কিছু কাজ করার জন্য। আমাদের অনুরোধ থাকবে, বিগত ১৫ বছরে যারা ফিরে এসেছে এ ধরনের ৫০টি কেইস বা তথ্যের যাচাই যদি তারা হাতে নেন, অনেক সমস্যার সমাধান তারা করতে পারবেন। অন্তত দেশের ভেতর থেকে যেভাবে প্রক্রিয়াটা শুরু হয়, সেখানে সিন্ডিকেট বা আঁতাতের মাধ্যমে নিয়মবহির্ভূত বেআইনি কর্মকাণ্ডগুলো বন্ধ করা সম্ভব হবে।
লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
